কোরবানি : ত্যাগের আনন্দ, হারানোর প্রাপ্তি

ড. আবুল হাসান মুহাম্মদ সাদেক

কোরবানি : ত্যাগের আনন্দ, হারানোর প্রাপ্তি

কোরবানির ঈদ আবার এসেছে। বছর ঘুরেফিরে আসা এই দিনটি শুধু একটি উৎসব নয়, এটি এক গভীর অনুভূতির নাম, এক অনির্বাচনীয় আনন্দের নাম, যা লুকিয়ে আছে ত্যাগের মধ্যে। এ যেন এক বৈপরীত্যের সৌন্দর্য, ত্যাগের মধ্যেই আনন্দ, হারানোর মধ্যেই প্রাপ্তি।

এই ঈদ আমাদের মনে করিয়ে দেয় এক মহান ইতিহাসের কথা। এক ত্যাগী পিতার নীরব এবং অসাধারণ আত্মসমর্পণের গল্প।

বিজ্ঞাপন

ইবরাহীম (আ.) তখন জীবনের একান্ত প্রান্তসীমায় পৌঁছেছেন, বয়সের ভারে ন্যুব্জ, অথচ হৃদয়ে এক অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা। সারা জীবন তিনি একটি সন্তানের জন্য প্রার্থনা করেছেন। প্রতিটি দোয়া, প্রতিটি নিশ্বাসে ছিল সেই আবেদন। কিন্তু সময় কেটে গেছে, বছর পেরিয়েছে, সন্তান আসেনি। অবশেষে, আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করলেন। তাঁকে দান করলেন এক পুত্র, ইসমাঈল (আ.)। কিন্তু এই আনন্দের পরেই এলো আরেক পরীক্ষা, যা আরো কঠিন, আরো গভীর। আল্লাহ তাঁকে নির্দেশ দিলেন, এই শিশুপুত্র এবং তাঁর মাকে জনমানবশূন্য এক দূরবর্তী স্থানে রেখে আসতে।

এ কেমন নির্দেশ! এ কেমন পরীক্ষা! ইবরাহীম (আ.) মেনে নিলেন। শুধু মেনে নেওয়াই নয়, তিনি সেই আদেশ বাস্তবায়ন করতে বেরিয়ে পড়লেন। ফিলিস্তিনের সবুজ ভূখণ্ড ছেড়ে, তিনি যাত্রা শুরু করলেন এক অজানা গন্তব্যের দিকে। সাথে তাঁর প্রিয় সন্তান এবং সন্তানের মা।

দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, রুক্ষ পথ, পাথুরে পাহাড়, নির্জন প্রান্তর পেরিয়ে চলেছে সেই যাত্রা। এ কেবল শারীরিক যাত্রা ছিল না, এ ছিল আত্মার এক পরীক্ষা, আনুগত্যের এক নিঃশব্দ ঘোষণা। অবশেষে তিনি পৌঁছালেন এক নির্জন উপত্যকায়, আজ যার নাম মক্কা। সেখানে ছিল না কোনো মানুষের বসতি, ছিল না পানির উৎস, ছিল না খাদ্যের ব্যবস্থা। চারদিকে শুধু পাহাড় আর নীরবতা। এক গভীর, ভীতিকর নীরবতা। তিনি রেখে গেলেন তাঁর শিশুপুত্র এবং সন্তানের মাকে সেই নির্জন উপত্যকায়, কোনো অভিযোগ ছাড়াই, কোনো দ্বিধা ছাড়াই।

নির্জন উপত্যকায় পানি নেই, খাদ্য নেই। যা ছিল, তাও ধীরে ধীরে ফুরিয়ে গেল। শিশু ইসমাঈল, তার ছোট্ট দেহে তখন তৃষ্ণার জ্বালা। তার কান্না ভেসে উঠতে লাগল সেই নির্জন উপত্যকার বুকজুড়ে। একজন মা, হাজেরা (আ.), এই দৃশ্য কীভাবে সহ্য করবেন? তিনি দৌড়াতে শুরু করলেন। একবার সাফা পাহাড়ে উঠলেন, দূরে তাকালেন, কেউ আছে কি না, কেউ আসছে কি না । না, কেউ নেই। তারপর ছুটে গেলেন মারওয়ার দিকে। আবার তাকালেন, দেখলেন কোথাও কোনো মানুষের ছায়া নেই।

এভাবে তিনি সাতবার দৌড়ালেন, সাফা থেকে মারওয়া, মারওয়া থেকে সাফা। আজও লাখ লাখ হাজি সেই একই পথ ধরে দৌড়ান, হজের অংশ হিসেবে, কিন্তু আসলে তারা দৌড়ান সেই মায়ের ত্যাগকে স্মরণ করে।

যখন মানবীয় সব চেষ্টা শেষ, যখন আর কোনো পথ খোলা নেই, তখনই ঘটে এক অলৌকিক ঘটনা। শিশু ইসমাঈলের পায়ের কাছে হঠাৎ করে মাটি ফেটে বেরিয়ে এলো পানির ধারা। একটি ছোট্ট ঝরনা, কিন্তু তার গভীরতা ছিল অসীম। এটি ছিল জমজম কূপ, আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান প্রতিদান। যে তৃষ্ণা ছিল মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে, সেই তৃষ্ণা রূপ নিল এক চিরন্তন উৎসে। আজও সেই জমজমের পানি প্রবাহিত হচ্ছে, লাখ লাখ মানুষ পান করছে, হাজার বছর পরেও তার ধারা থামেনি।

ছোট্ট শিশু ইসমাঈল ক্রমে বড় হতে শুরু করল। আর দূরে, বহু দূরে, ফিলিস্তিনের মাটিতে বসে একজন পিতা, ইবরাহীম (আ.), নিজের হৃদয়ের গভীরে বহন করে চলেছেন এক অদ্ভুত অনুভূতি। সময় সময় তিনি যাত্রা করতেন, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে, পাহাড়-পর্বত অতিক্রম করে, শুধু একবার তাঁর প্রিয় পুত্রকে দেখার জন্য।

মরুভূমির সেই শিশুটি, ইসমাঈল, এখন কিশোর। ঠিক সে সময়েই এলো এক স্বপ্ন। এক অদ্ভুত স্বপ্ন । তিনি দেখলেন, তিনি তাঁর প্রিয় পুত্রকে কোরবানি করছেন। প্রথমে তিনি ভাবলেন, হয়তো এটি একটি প্রতীকী নির্দেশ, হয়তো তাঁকে কোনো পশু কোরবানি করতে বলা হয়েছে। তিনি তা-ই করলেন। একটি পশু কোরবানি করলেন; আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। কিন্তু পরের রাতেও সেই একই স্বপ্ন। আবার সেই দৃশ্য, আবার সেই আহ্বান। তিনি আবার একটি পশু কোরবানি করলেন। তবু স্বপ্নে একই দৃশ্যের মধ্য দিয়ে বারবার বাধা পেতে লাগলেন। তখন তাঁর হৃদয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠল, এটি কোনো প্রতীক নয়, এটি কোনো সাধারণ ইঙ্গিত নয়। এটি এক সুস্পষ্ট নির্দেশ।

ইবরাহীম (আ.) ঘরে প্রবেশ করে কোমল স্বরে তাঁর স্ত্রীকে বললেন ছেলেকে প্রস্তুত করে দিতে, যেন সে তাঁর সঙ্গে বাইরে যেতে পারে। হাজেরা (আ.) বিস্মিত হলেন না। তিনি জানতেন, এই আগমন, এই ডাকা, সবকিছুর মধ্যেই কোনো না কোনো রহস্য আছে। তবু তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘কোথায় নিয়ে যাবেন তাকে?’ ইবরাহীম (আ.) বললেন, ‘এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাবো।’ এই সরল উত্তরেই লুকিয়ে ছিল এক গভীর সত্য। ‘বন্ধু’ তিনি তো আল্লাহ নিজেই। হাজেরা (আ.) আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। তিনি তাঁর ছেলেকে প্রস্তুত করে দিলেন, যেন এক সাধারণ যাত্রা, অথচ এর ভেতরে লুকিয়ে আছে ইতিহাসের সবচেয়ে অসাধারণ অধ্যায়।

পিতা ও পুত্র বেরিয়ে পড়লেন, মিনার পথে। নীরব পদক্ষেপ, ভারী হৃদয়, কিন্তু বিশ্বাসে অটল। এ সময়েই শুরু হলো আরেক পরীক্ষা। শয়তান এসে হাজেরা (আ.)-এর সামনে দাঁড়াল, এক বিভ্রান্তির বার্তা নিয়ে। সে বলল, ‘তুমি কী জানো, তোমার স্বামী তোমার সন্তানকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? সে তো তাকে কোরবানি করতে যাচ্ছে!’ একজন মায়ের হৃদয়ে এ কথা যেন বজ্রপাতের মতো। কিন্তু হাজেরা (আ.) কেঁপে উঠলেন না। তিনি শান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘এটা কি সম্ভব, একজন পিতা তার সন্তানকে কোরবানি করবে?’ শয়তান তখন বলল, ‘হ্যাঁ, কারণ এটিই আল্লাহর নির্দেশ।’ এই উত্তর শোনার পর, হাজেরা (আ.)-এর মুখে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত প্রশান্তি। তিনি বললেন, ‘যদি এটিই আল্লাহর নির্দেশ হয়, তবে এক ইসমাঈল কেন, শত ইসমাঈল হলেও কোরবানি দিতে কোনো দ্বিধা নেই।’ শয়তান ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেল, কারণ যেখানে ঈমান দৃঢ়, সেখানে বিভ্রান্তির কোনো স্থান নেই। ত্যাগ শুধু এক ব্যক্তির নয়, এটি একটি পরিবারের সম্মিলিত ঈমানের প্রকাশ।

দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে অবশেষে ইবরাহীম (আ.) এবং তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাঈল (আ.) পৌঁছালেন মিনা, ত্যাগের সেই নির্ধারিত প্রান্তরে। চারদিকে নীরবতা। পাহাড়গুলো যেন নিশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছে, এক অনন্য ঘটনার সাক্ষী হতে। তিনি ধীরে ধীরে কোমল কণ্ঠে বললেন, ‘হে আমার প্রিয় পুত্র, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে কোরবানি করছি। তোমার কী মত?’

এক মুহূর্তের জন্য যেন সময় থেমে গেল। সাধারণত এই বয়সের একটি ছেলে, ভয় পেয়ে পালিয়ে যেত, বাঁচার জন্য আকুল হতো। কিন্তু ইসমাঈল (আ.) শান্তভাবে, অবিচল কণ্ঠে বললেন, ‘হে আমার পিতা, আপনি যা আদেশ পেয়েছেন, তাই করুন। ইনশা আল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।’

এই সংলাপ, মানব ইতিহাসের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী সংলাপগুলোর একটি। এই মুহূর্তে পৃথিবীর সব শব্দ যেন হারিয়ে গেছে। শুধু দুটি হৃদয়ের স্পন্দন, একটি পিতার, একটি পুত্রের। ইবরাহীম (আ.) তাঁর ছেলেকে শুইয়ে দিলেন। ছুরি হাতে নিলেন। ধীরে ধীরে সেটি সন্তানের গলায় রাখলেন। তিনি ছুরি চালালেন। কিন্তু অদ্ভুতভাবে ছুরি কাজ করল না। আবার চেষ্টা করলেন, তবু কিছু হলো না। এ যেন আল্লাহর পক্ষ থেকে এক নীরব হস্তক্ষেপ, যেন বলা হচ্ছে, ‘তুমি তোমার পরীক্ষা সম্পন্ন করেছো।’

কিন্তু সেই মুহূর্তে, ইসমাঈল (আ.) নিজেই কথা বলে উঠলেন, শান্ত, স্থির, অবিচল কণ্ঠে, ‘হে আমার পিতা, হয়তো আপনি ঠিকভাবে ছুরি ব্যবহার করতে পারছেন না, আপনার ভালোবাসা আপনাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। আপনি আপনার চোখ বেঁধে নিন, যেন আপনি আমাকে না দেখেন, আর আপনার দায়িত্বটি পূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে পারেন।’

কী অবিশ্বাস্য কথা! কী অনুপম আত্মসমর্পণ! চোখ বাঁধা অবস্থায় ইবরাহীম (আ.) যখন তাঁর দায়িত্ব সম্পন্ন করলেন, তাঁর অন্তর ভরে উঠল এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে। ধীরে ধীরে তিনি চোখের বাঁধন খুললেন। আর তখন, যে দৃশ্য তাঁর সামনে উদ্ভাসিত হলো, তা মানব ইতিহাসে এক অনন্য বিস্ময়।

তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাঈল (আ.) অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছেন, আর তাঁর স্থানে শুয়ে আছে একটি দুম্বা, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত। এ যেন আসমান থেকে নেমে আসা এক রহমত, এক ঘোষণা, ‘হে ইবরাহীম! তুমি তোমার স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছো। তুমি পরীক্ষায় সফল হয়েছো।’ এই মুহূর্তে ত্যাগের অর্থ নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হলো। আল্লাহ তাঁর বান্দার কাছ থেকে রক্ত চাননি, তিনি চেয়েছিলেন তাঁর অন্তরের নিষ্ঠা, তাঁর নিঃশর্ত আনুগত্য।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন