হৃদয়ে রক্তক্ষরণ : নৈতিক বিপর্যয় ও আত্মজিজ্ঞাসা

Abdul-Latif-masum
আবদুল লতিফ মাসুম

হৃদয়ে রক্তক্ষরণ : নৈতিক বিপর্যয় ও আত্মজিজ্ঞাসা

রামিসার বয়স ছিল মাত্র সাত। দ্বিতীয় শ্রেণির এক ছোট্ট শিক্ষার্থী। প্রতিদিনের মতো সেদিনও সে স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু ১৯ মের সেই সকালটি আর ১০টি সাধারণ সকালের মতো ছিল না। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি ছোট্ট মেয়ের জীবন থেমে গেল নির্মমতার এক ভয়াবহ অন্ধকারে। পাশের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে পড়ে থাকা একটি ছোট্ট জুতো, উদ্বিগ্ন মায়ের বারবার দরজায় কড়া নাড়া, তারপর দরজা ভেঙে উদ্ধার হওয়া খণ্ডিত মরদেহ—এসব শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়; এটি পুরো সমাজের মানবিক মুখচ্ছবিকে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।

রামিসা আজ আর নেই। কিন্তু তার মৃত্যু আমাদের সামনে এমন কিছু প্রশ্ন রেখে গেছে, যেগুলোর উত্তর না খুঁজলে এই সমাজের ভবিষ্যৎ আরো অন্ধকার হয়ে উঠবে। কারণ এ ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়। বরং এটি এমন এক ভয়ংকর সামাজিক বাস্তবতার অংশ, যেখানে শিশু, নারী ও দুর্বল মানুষ প্রতিনিয়ত সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

সাম্প্রতিক কয়েক মাসের ঘটনাগুলো দেখলেই সেই ভয়াবহ চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাজশাহীতে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ, গাইবান্ধায় কিশোরীকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ, পিরোজপুরে ফুল কুড়াতে যাওয়া শিশুর ওপর পাশবিক নির্যাতন, চুয়াডাঙ্গায় পুত্রবধূ ধর্ষণের অভিযোগ, নাটোরে পাঁচ বছরের শিশুকে ধর্ষণ, চট্টগ্রামে শিশু ধর্ষণচেষ্টা, হবিগঞ্জে এসএসসি পরীক্ষার্থীর রহস্যজনক মৃত্যু—যেন প্রতিদিনের সংবাদে পরিণত হয়েছে মানবিক বিপর্যয়ের নতুন নতুন অধ্যায়।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো—সমাজ ধীরে ধীরে এই সহিংসতার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরো স্পষ্ট করে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাড়ে ৪ মাসেই অন্তত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ জনকে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, মে মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২৬-এ। ধর্ষণের ঘটনা এক মাসে প্রায় ৪৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব সংখ্যা নিছক পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি পরিবার, একটি ভাঙা শৈশব, এক মায়ের কান্না, এক বাবার অসহায়তা।

প্রশ্ন হলো—কেন এমন হচ্ছে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে এখন সহিংসতা অনেকটা ‘প্যান্ডেমিক’ বা মহামারি পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এটি শুধু কিছু অপরাধীর ব্যক্তিগত বিকৃতি নয়; বরং দীর্ঘদিনের সামাজিক, নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ের ফল।

প্রথম এবং সবচেয়ে বড় কারণ হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। বহু বছর ধরে সমাজে একটি ভয়ংকর বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে—ক্ষমতা, অর্থ ও রাজনৈতিক প্রভাব থাকলে অপরাধ করেও পার পাওয়া যায়। যখন মানুষ দেখে বড় অপরাধেরও দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার হয় না, তখন অপরাধীর মনে ভয় কমে যায়। ধীরে ধীরে সমাজে অপরাধ যেন ঝুঁকিহীন এক ক্ষমতার খেলায় পরিণত হয়।

বাংলাদেশের বহু আলোচিত মামলার ইতিহাস সেই বাস্তবতাই তুলে ধরে। ১৯৯৫ সালের ইয়াসমিন হত্যা মামলার বিচার শেষ হতে লেগেছিল প্রায় ৯ বছর। শাজনীন তাসনিম রহমান হত্যাকাণ্ডের বিচার ও সাজা কার্যকর হতে সময় লেগেছে১৮ বছরের বেশি। তনু হত্যাকাণ্ডের এক দশক পেরিয়ে গেলেও বিচার এখনো ঝুলে আছে। শিশু আছিয়া হত্যার মামলায় মৃত্যুদণ্ড হলেও আপিল প্রক্রিয়ায় তা আটকে আছে। অনেক ক্ষেত্রেই চার্জশিট দাখিল করতেই মাসের পর মাস কেটে যায়।

এই দীর্ঘসূত্রতা সমাজে ভয়ংকর প্রভাব ফেলে। কারণ অপরাধীরা বুঝতে শেখে—বিচার যত দেরি হবে, ততই বাঁচার সুযোগ বাড়বে।

রামিসা হত্যাকাণ্ডে দ্রুত বিচার হওয়ায় দেশজুড়ে এক ধরনের স্বস্তি তৈরি হয়েছে। মাত্র ২০ দিনের মধ্যে তদন্ত, বিচার ও রায়—এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—প্রতিটি মামলাতেই কি একই গতি থাকবে? নাকি শুধু আলোচিত ঘটনাগুলোই দ্রুত বিচার পাবে আর বাকিগুলো আবার বছরের পর বছর ফাইলের নিচে চাপা পড়ে থাকবে?

শুধু বিচারহীনতা নয়, সামাজিক ও মানসিক অস্থিরতাও এই সহিংসতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব, সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং দীর্ঘদিনের হতাশা মানুষের ভেতরে জমা করছে ক্ষোভ ও অস্থিরতা। যখন সমাজে সহনশীলতা কমে যায়, তখন মানুষ ছোট ছোট বিষয়েও হিংস্র হয়ে ওঠে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, আমরা এখন এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে সহিংসতা ধীরে ধীরে ‘স্বাভাবিক’ হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন সংবাদে খুন, ধর্ষণ, নির্যাতন ও গণপিটুনি—এত বেশি দেখা যাচ্ছে যে মানুষের অনুভূতিশক্তি কমে যাচ্ছে। এই অবস্থাকে বলা হয় ‘ডিসেনসিটাইজেশন’। অর্থাৎ, বারবার সহিংসতা দেখতে দেখতে মানুষ মানসিকভাবে অসাড় হয়ে পড়ে।

আরেকটি বড় কারণ হলো নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার সংকট।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা জ্ঞান দিচ্ছে, কিন্তু মূল্যবোধ তৈরি করতে পারছে না। পরিবারে সন্তানদের ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ছে। প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবের ভেতর বড় হওয়া নতুন প্রজন্মের একটি অংশ সহিংসতা, বিদ্বেষ ও বিকৃত যৌনতার নানা কনটেন্টের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে। অথচ পরিবারে যৌনতা, শরীর সচেতনতা বা নিরাপদ স্পর্শ নিয়ে কোনো স্বাস্থ্যকর আলোচনা নেই।

শিশুদের শেখানো হয় বড়দের সম্মান করতে, কিন্তু শেখানো হয় না—নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন হতে, অস্বস্তিকর স্পর্শের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে, কিংবা ভয় পেলেও কথা বলতে।

ফলে অপরাধীরা শিশুদের সহজ শিকার হিসেবে বেছে নেয়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধী অপরিচিত কেউ নয়; বরং পরিচিত মানুষ। প্রতিবেশী, আত্মীয়, শিক্ষক, পরিবারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি—এমন মানুষের বিরুদ্ধেই বারবার অভিযোগ উঠছে। মনোবিজ্ঞানে এটিকে বলা হয় ‘গ্রুমিং বিহেভিয়ার’। অর্থাৎ, অপরাধী প্রথমে বিশ্বাস অর্জন করে, নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করে, তারপর সেই বিশ্বাসকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।

এই বাস্তবতা আমাদের প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। শিশু শুধু রাস্তায় নয়, অনেক সময় নিজের পরিচিত পরিবেশেও নিরাপদ নয়।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে—শুধুই কঠোর শাস্তি কি সমাধান?

অনেকে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড, ক্রসফায়ার বা কঠোর শাস্তির দাবি তুলছেন। জনরোষের মুহূর্তে এসব দাবি আবেগের জায়গা থেকে আসে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শাস্তি অপরিহার্য হলেও একে একমাত্র সমাধান ভাবলে ভুল হবে। কারণ অপরাধ জন্ম নেয় সমাজের গভীর অসুস্থতা থেকে। সেই অসুস্থতার চিকিৎসা না করলে শুধু শাস্তি দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

প্রয়োজন একটি সমন্বিত সামাজিক প্রতিরোধব্যবস্থা।

প্রথমত, বিচারব্যবস্থাকে দ্রুত, কার্যকর ও নিরপেক্ষ করতে হবে। তদন্ত থেকে আপিল পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকতে হবে। শিশু ও নারী নির্যাতনের মামলায় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল এবং প্রশিক্ষিত তদন্ত টিম প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, পরিবারকে আবার সন্তানদের প্রথম নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত করতে হবে। বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের খোলামেলা সম্পর্ক জরুরি। সন্তান যেন ভয় ছাড়া নিজের অভিজ্ঞতা বলতে পারে, সেই পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।

তৃতীয়ত, স্কুলে বয়সভিত্তিক নিরাপত্তা শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা ও কাউন্সেলিং বাধ্যতামূলক করা দরকার। শিশুদের শেখাতে হবে—তাদের শরীর তাদের নিজের এবং ‘না’ বলার অধিকার তাদের আছে।

চতুর্থত, সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বাস্তব মানবিক মূল্যবোধ গঠনে ভূমিকা রাখতে হবে। ধর্ম যদি মানুষকে মানবিক না করে, তবে সেই ধর্মচর্চা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে না।

পঞ্চমত, অনলাইনে সহিংসতা, পর্নোগ্রাফি ও বিকৃত কনটেন্টের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। কারণ ডিজিটাল সহিংসতা বাস্তব সহিংসতাকেও প্রভাবিত করছে।

সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের আবার মানুষ হতে হবে।

কারণ প্রতি ঘরে ঘরে পুলিশ দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু প্রতি ঘরে ঘরে মূল্যবোধ গড়ে তোলা সম্ভব। প্রতিটি পরিবারে মানবিকতা শেখানো সম্ভব। প্রতিটি শিশুকে নিরাপত্তার অনুভূতি দেওয়া সম্ভব। প্রতিটি ছেলেকে শেখানো সম্ভব—নারী বা শিশু কোনো বস্তু নয়; তারা পূর্ণ মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ।

রামিসার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। আইন তার কাজ করেছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন এখনো আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে—এরপর কী?

পরবর্তী রামিসাকে কি আমরা রক্ষা করতে পারব?

এই প্রশ্নের উত্তর আদালত একা দিতে পারবে না। রাষ্ট্র একা দিতে পারবে না। এই উত্তর দিতে হবে পরিবারকে, সমাজকে, শিক্ষাব্যবস্থাকে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে, গণমাধ্যমকে—আমাদের সবাইকে।

কারণ একটি দেশের উন্নয়ন শুধু সেতু, উড়ালসড়ক বা অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে মাপা যায় না। প্রকৃত উন্নয়ন মাপা হয় সেই দেশের সবচেয়ে দুর্বল মানুষটি কতটা নিরাপদ—তা দিয়ে।

একটি সাত বছরের শিশু যদি নিরাপদে স্কুলে যেতে না পারে, যদি নিজের বাড়ির পাশেও নিরাপদ না থাকে, তবে সেই সমাজের উন্নয়ন আসলে কতটা বাস্তব?

রামিসা আর ফিরবে না। আছিয়া ফিরবে না। তনু ফিরবে না। কিন্তু তাদের মৃত্যু যদি আমাদের বিবেক না জাগায়, তবে এই সমাজ আরো অন্ধকারের দিকে যাবে।

এখন সময় এসেছে শুধু ক্ষোভ দেখানোর নয়; বদলে যাওয়ার।

কারণ রামিসা শুধু একটি পরিবারের সন্তান ছিল না। রামিসা আমাদের সবার মেয়ে।

লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক, সাবেক অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন