ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জের পাঁচ আসনের তিনটিতেই নির্বাচনি সমীকরণ জটিল করে তুলেছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। কোথাও মনোনীত প্রার্থীর বিপরীতে সাবেক এমপি, কোথাও একাধিক বহিষ্কৃত নেতা মাঠে থাকায় ভোটের হিসাব বদলে যাচ্ছে মুহূর্তের মধ্যে। নারায়ণগঞ্জ-২, ৩ ও ৪—এই তিন আসনে মূল লড়াই ঘুরপাক খাচ্ছে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও বিদ্রোহীদের মধ্যেই। ফলে শেষ পর্যন্ত ফলাফল কোনদিকে যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
নারায়ণগঞ্জ-২ : ত্রিমুখী লড়াইয়ে উত্তাপ
এই আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দলের ঢাকা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদ। স্থানীয়ভাবে তার গ্রহণযোগ্যতা থাকলেও এবারের নির্বাচনি লড়াইটা তার জন্য মোটেও সহজ হচ্ছে না। বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে আজাদের পক্ষে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।
তবে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন বিএনপির বিদ্রোহী ও বহিষ্কৃত প্রার্থী, টানা চারবারের সাবেক সংসদ সদস্য আতাউর রহমান খান আঙ্গুর। ‘কলস’ প্রতীক নিয়ে তিনি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। দলীয়ভাবে কোণঠাসা থাকলেও আড়াইহাজারে তার জনপ্রিয়তা এখনো দৃশ্যমান। মনোনয়নবঞ্চিত বিএনপির কয়েকজন নেতা নীরবে তাকে সমর্থন দিতে পারেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।
এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ইলিয়াছ মোল্লাও মাঠে সক্রিয়। দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় গণসংযোগ চালিয়ে তিনি নিজস্ব ভোটভিত্তি গড়ে তুলেছেন। ভোটারদের মতে, এ আসনে বিএনপি, স্বতন্ত্র ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মাঝে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। তবে মূল লড়াই হবে বিএনপির আজাদ ও স্বতন্ত্র আঙ্গুরের মাঝে। নির্বাচনের সময় দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে ভোটারদের মাঝে।
নারায়ণগঞ্জ-৩ : বিএনপির ভেতরেই মূল যুদ্ধ
এই আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী দলের সোনারগাঁ থানা সভাপতি আজহারুল ইসলাম মান্নান। দলীয় সাংগঠনিক শক্তি ও স্থানীয় পরিচিতির কারণে তিনি শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। তবে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে রয়েছেন বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন। ফুটবল প্রতীক নিয়ে এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়া গিয়াসউদ্দিন ২০০১ সালে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে শামীম ওসমানকে হারিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে আসন পুনর্বিন্যাসের ফলে তার এলাকা সিদ্ধিরগঞ্জ নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে চলে গেলে তিনি এখান থেকে প্রার্থী হন। ২০২২-পরবর্তী সময়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে শামীম ওসমানের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে রাজপথে দলকে নেতৃত্ব দেন গিয়াসউদ্দিন। এ কারণে তার একটি দৃঢ় সমর্থক গোষ্ঠী এখনো সক্রিয় রয়েছে। এ আসনে আরেক বহিষ্কৃত নেতা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী রেজাউল করিম স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও বয়স ও মাঠে সক্রিয় না থাকায় তিনি তুলনামূলকভাবে দুর্বল অবস্থানে রয়েছেন।
অন্যদিকে এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে মাঠে ছিলেন ড. ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া। তবে আসন সমঝোতার অংশ হিসেবে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। এই আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের শিবলী। স্থানীয়ভাবে তার তেমন পরিচিতি না থাকায় আসনটি ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারে স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভ রয়েছে। ফলে তারা শিবলীর পক্ষে নামবেন কি না—এ নিয়ে সংশয় রয়েছে। এ অবস্থায় সাধারণ ভোটাররা বলছেন, এই আসনে মূল লড়াই হবে বিএনপির মান্নান ও বিদ্রোহী গিয়াসউদ্দিনের মাঝে। জামায়াতের প্রার্থী না থাকায় এই আসনে ভোটাররা এ দুজনের মাঝে একজনকে বেছে নেবেন।
নারায়ণগঞ্জ-৪ : ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা
আসনটি জোট শরিককে ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। এ আসনে জোটের শরিক হিসেবে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী খেজুর গাছ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ধানের শীষ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় এলাকায় তার পরিচিতি রয়েছে। বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বড় একটি অংশ তার পক্ষে কাজ করছে। এই আসনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক সংসদ সদস্য ও রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ আলী। ‘হাতি’ প্রতীক নিয়ে তিনি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। অতীতে সংসদ সদস্য থাকায় এলাকায় তার আলাদা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
এ ছাড়া বিএনপির বহিষ্কৃত প্রার্থী শাহ আলমও হেভিওয়েট প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে আছেন। ২০০৮ সালে অল্প ব্যবধানে পরাজিত হওয়া এই নেতা ফতুল্লাজুড়ে ‘ক্লিন ইমেজ’-এর রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত। তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ভোটের হিসাবকে আরো জটিল করে তুলছে।
এই আসনে শুরুতে বেশ শক্তিশালী অবস্থানে ছিল জামায়াতে ইসলামী। ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুল জব্বার এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ছিলেন। শেষ মুহূর্তে এনসিপির আবদুল্লাহ আল আমিনকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। ফতুল্লায় আল আমিনের পরিচিতি তুলনামূলক কম। নতুন দল হওয়ায় এই আসনে দলটির নিজস্ব কোনো ভোটব্যাংকও নেই। এ আসনে সাবেক এমপি বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিনও প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন। তবে সিদ্ধিরগঞ্জের বাসিন্দা হওয়ায় ফতুল্লায় তাকে নিয়ে আলোচনা কম।
ভোটারদের মতে, এ আসনে কাসেমী, মোহাম্মদ আলী ও শাহ আলম—তিনজনেরই জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে এবং ফলাফল নির্ধারিত হতে পারে অল্প ব্যবধানে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


বিএনপির গফুর ভূঁইয়াও নির্বাচন করতে পারবেন না