দেশের সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় বাহিনীর। কিন্তু জামালপুর সীমান্তে এখন দেখা যাচ্ছে এক ব্যতিক্রমী দৃশ্য। সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির পাশাপাশি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছেন সাধারণ মানুষ। রাতভর পাহারা, টহল, তথ্য সরবরাহ ও প্রতিরোধে অংশ নিয়ে তারা যেন সীমান্তের অঘোষিত অতন্দ্রপ্রহরীতে পরিণত হয়েছেন। ভারতের মেঘালয় ও আসাম সীমান্তঘেঁষা জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় গত কয়েকদিন ধরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দাদের এই দেশপ্রেমমূলক ভূমিকা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিএসএফ বিভিন্ন সময়ে ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করছে। এমন পরিস্থিতিতে সীমান্তের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিজিবির পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। জনতা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন পয়েন্টে পাহারা দিচ্ছেন। কেউ রাস্তার মোড়ে, কেউ সীমান্তঘেঁষা খোলা মাঠে, আবার কেউ সরাসরি বিজিবির টহল দলের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা রনি ইসলাম বলেন, আমরা দেশের জন্য পাহারা দিচ্ছি। সীমান্ত দিয়ে কাউকে অবৈধভাবে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। বিজিবির সঙ্গে আমরা সব সময় আছি।
পুশইনের কৌশল সম্পর্কে জানতে চাইলে স্থানীয় বাসিন্দা জীবন মিয়া বলেন, আমাদের সীমান্তের এপাশে কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই। বিএসএফ অনেক সময় তাদের অংশের আলো বন্ধ করে দেয়। অন্ধকারের সুযোগে মানুষকে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
দেওয়ানগঞ্জের পাররামরামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সেলিম মিয়া বলেন, আমাদের নিজস্ব কাঁটাতারের বেড়া নেই, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থাও নেই। বিএসএফ যখন তাদের পাশের আলো বন্ধ করে দেয়, তখন পুরো এলাকা অন্ধকার হয়ে যায়। এই সুযোগে পুশইনের চেষ্টা করা হয়। আমরা চাই সীমান্ত সুরক্ষায় আরো বাজেট বরাদ্দ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন।
সূর্য ডোবার পর থেকেই সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর তরুণরা দলবদ্ধভাবে সীমান্ত এলাকায় অবস্থান নিচ্ছেন। কেউ লাঠিসোঁটা হাতে পাহারা দিচ্ছেন, কেউ তথ্য সংগ্রহ করছেন, আবার কেউ সরাসরি বিজিবির টহল কার্যক্রমে সহযোগিতা করছেন। গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত চলে তাদের এই স্বেচ্ছাসেবকের মতো দায়িত্ব পালন। স্থানীয়দের ভাষ্য, দেশের সীমান্ত রক্ষার প্রশ্নে তারা কোনো আপস করতে রাজি নন। প্রয়োজন হলে জীবনের ঝুঁকি নিয়েও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তারা মাঠে থাকবেন।
বকশীগঞ্জের সীমান্ত এলাকা রামরামপুর গ্রামের বাসিন্দা শাহিনুর ইসলাম, মুহাম্মদ আলী, শামিম মিয়া ও সোলাইমান হক জানান, একাধিকবার বিএসএফ সদস্যদের সঙ্গে তাদের সরাসরি বাকবিতণ্ডা হয়েছে। কোথাও কোথাও সীমান্তের শূন্যরেখার কাছে জড়ো হওয়া ভারতীয় নাগরিকদের ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। ভারতীয় অংশ থেকে পাথর নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটেছে, যার জবাবে স্থানীয়রা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
জামালপুর ৩৫ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান সীমান্তবাসীর ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, সীমান্ত এলাকার লোকজন যেভাবে বিজিবির সদস্যদের সহযোগিতা করছে, তাতে আমি অভিভূত। তারা আমাদের তথ্য দিচ্ছে, আমাদের সঙ্গে থেকে দিন-রাত সীমান্ত পাহারা দিচ্ছে। এতে আমাদের আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে গেছে।
তিনি আরো বলেন, সীমান্ত এলাকার মানুষ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে না দিলে এত বড় সীমান্ত এলাকায় পুশইনের চেষ্টা প্রতিহত করা শুধু বিজিবির পক্ষে কঠিন হয়ে যেত। এখন বিজিবির সদস্য ও সীমান্তবাসী সবাই সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আমাদের প্রত্যাশা, একটি ভারতীয় লোকও অবৈধভাবে বাংলাদেশের সীমান্তে প্রবেশ করতে পারবে না।
সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে দেশপ্রেমিক উদ্দীপনা কাজ করছে। রাত জেগে পাহারা দেওয়ার পাশাপাশি তারা মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান করছেন। সীমান্তে কোনো ধরনের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দেখা দিলেই তাৎক্ষণিকভাবে বিজিবিকে অবহিত করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, স্বাধীনতার পর সীমান্তে নানা সংকট ও উত্তেজনা সৃষ্টি হলেও সাধারণ মানুষের এমন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ খুব কমই দেখা গেছে। তারা বলছেন, দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রশ্নে সীমান্তবাসী আজ ঐক্যবদ্ধ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হলেও জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করে। জামালপুর সীমান্তে বর্তমানে যে দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, তা কেবল একটি সীমান্ত এলাকার ঘটনা নয়; এটি দেশের প্রতি সাধারণ মানুষের দায়বদ্ধতা, দেশপ্রেম ও জাতীয় চেতনারও শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ। কাঁটাতারের ওপারে যখন উত্তেজনা, তখন এপারে দেখা যাচ্ছে এক অনন্য ঐক্য।
বিজিবি ও সীমান্তবাসীর সম্মিলিত অবস্থান যেন স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে, বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষায় জনগণও প্রস্তুত। সীমান্তের নীরব প্রহরী হয়ে ওঠা এসব সাহসী মানুষ নতুন করে প্রমাণ করছেন, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে বাংলাদেশের জনগণই সবচেয়ে বড় শক্তি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


নেতানিয়াহুকে যুদ্ধ শেষ করতে বললেন ট্রাম্প