পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের আধিপত্য বিস্তারের লড়াই খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন উপজেলা আবারও উপ্তপ্ত হয়ে উঠছে। গত তিন দিনে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা, রামগড়, মাটিরাঙ্গা ও গুইমারায় আঞ্চলিক দলের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলিতে দুজন নিহত হয়। পৃথক অভিযানে তিনটি একে-৪৭ রাইফেল, একটি পিস্তল এবং বিপুল পরিমাণ গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। এসব অভিযানে ইউপিডিএফের পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে।
জানা গেছে, শুক্রবার সকালে খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলার দুর্গম হাফছড়ি ইউনিয়নের পাইনংপাড়া এলাকায় জেএসএসের (এমএনলারমা) সঙ্গে ইউপিডিএফ সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। দুপক্ষের গুলাগুলির খবর পেয়ে সেনাবাহিনীর সিন্ধুকছড়ি জোনের টহলদল তল্লাশি চালিয়ে ঘটনাস্থল থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ইউপিডিএফের গুইমারা উপজেলার সংগঠক সুজেন্দ্র চাকমা ওরফে ঝিমিত চাকমাকে আটক করে ।
আটকের পর আহত ঝিমিত চাকমাকে দ্রুত মাটিরাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গুইমারা থানা পুলিশের ওসি সোহরাওয়ার্দী।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গুইমারা উপজেলার হাফছড়ি ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের দুর্গম পাইনংপাড়া এলাকায় দীর্ঘদিন থেকে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা অবস্থান করে চাঁদাবাজি, অপহরণসহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিল ইউপিডিএফ প্রসিত গ্রুপ। ওই এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রতিপক্ষ জেএসএস শনিবার সকালে দুপক্ষের গোলাগুলির এ ঘটনা ঘটে।
গুইমারা থানা পুলিশের ওসি সোহরাওয়ার্দী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, চিকিৎসা শেষে ঝিমিত চাকমাকে থানায় আনা হয়েছে। লক্ষ্মীছড়ির গুইছড়ি গ্রামের আনন্দ কুমার চাকমার ছেলে সুজেন্দ্র চাকমা ওরফে ঝিমিত চাকমার বিরুদ্ধে লক্ষ্মীছড়ি ও গুইমারাসহ বিভিন্ন থানায় হত্যা, চাঁদাবাজিসহ সাতটি মামলা রয়েছে এবং দুটি মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।
গুইমারা থানার ওসি জানান, ঝিমিত চাকমার নেতৃত্বে গুইমারা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো।
অন্যদিকে ইউপিডিএফের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে ঝিমিত চাকমাকে সংগঠনটির গুইমারা উপজেলা সংগঠক হিসেবে দাবি করা হয়েছে। সংগঠনটির খাগড়াছড়ি জেলা সংগঠক অংগ মারমা তার মুক্তির দাবি জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে ঠেংরে বাহিনীসহ রাষ্ট্রীয়ভাবে দলটির নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন।
নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, গত তিন দিনে খাগড়াছড়ি জেলার রামগড়, পানছড়ি ও মাটিরাঙ্গা ও গুইমারায় উপজেলায় পরিচালিত পৃথক অভিযানে তিনটি একে-৪৭ রাইফেল, একটি পিস্তল এবং বিপুল পরিমাণ গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। এসব অভিযানে ইউপিডিএফের পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে । এছাড়া একই সময়ে পৃথক ঘটনায় রামগড় ও দীঘিনালায় সংগঠনটির দুই সদস্য গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন ।
বিভিন্ন গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলো আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ আর নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এ সময়ে তারা শুধু সংঘাতের মাত্রাই বাড়ায়নি, অস্ত্রের আধুনিকায়ন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি সংঘাতের ঘটনাও ঘটাচ্ছে। এতে পাহাড়ের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে সংকটের মুখে ফেলেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত এক বছরে খাগড়াছড়ি সদর, দীঘিনালা, পানছড়ি, মহালছড়ি ও মাটিরাঙ্গা উপজেলায় আঞ্চলিক দলের মধ্যে ছোট-বড় অন্তত ২৮টি সশস্ত্র সংঘর্ষ ও বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে। এসব সংঘাতে পাহাড়ি দলগুলোর সশস্ত্র ক্যাডার, কর্মী এবং সাধারণ নাগরিকসহ অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ২৫ জনেরও বেশি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

