মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার এক যুবকের ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন এখন পরিণত হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা ও মানবিক বেদনায়। মানব পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে লিবিয়ায় নিখোঁজ হয়েছেন রাজৈরের কুঠিবাড়ী গ্রামের নয়ন মোল্লা (২২)। দীর্ঘদিন ধরে তার কোনো খোঁজ না পেয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন বাবা-মা। তাদের একটাই প্রশ্ন—ছেলে এখনো বেঁচে আছে, নাকি হারিয়ে গেছে মৃত্যুর অন্ধকারে।
নিখোঁজ নয়ন মোল্লা দিনমজুর সোহরাব মোল্লার ছেলে। পরিবারের আশা ছিল, বিদেশে গিয়ে ভালো আয়-রোজগার করে সংসারের অভাব দূর করবেন নয়ন। সেই স্বপ্ন নিয়েই ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট ইতালির উদ্দেশে বাড়ি ছাড়েন তিনি।
পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় একটি দালাল চক্র প্রথমে ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে নয়নকে ইতালি পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। পরে নানা অজুহাতে আরও টাকা দাবি করা হয়। একপর্যায়ে দালালেরা জানায়, লিবিয়ায় ‘কালা বাহিনী’র হাতে আটক হয়েছেন নয়ন। তাকে জীবিত ফেরাতে হলে আরও টাকা দিতে হবে।
ছেলেকে বাঁচানোর আশায় বসতভিটার ২ শতাংশ জমি বিক্রি করে এবং ধারদেনা করে ধাপে ধাপে প্রায় ৪০ লাখ টাকা জোগাড় করে দালালদের হাতে তুলে দেন অসহায় বাবা-মা।
নয়নের মা হোসনে আরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ছেলে বিদেশে গিয়ে সুখে থাকবে—এই আশায় পাঠাইছিলাম। দালালেরা কইছিল ইতালি পৌঁছাইয়া দিবে। পরে কয় লিবিয়ায় সমস্যা হইছে, টাকা লাগব। ধারদেনা করছি, জমি বিক্রি করছি, তারপরও আমার পোলার কোনো খবর নাই। শেষ কথা হইছিল ৩ এপ্রিল ২০২৬। এরপর আর কোনো যোগাযোগ নাই।’
বাবা সোহরাব মোল্লা বলেন, ‘আমি দিনমজুর মানুষ। ছেলের ভবিষ্যতের আশায় যা ছিল সব দিছি। এখন ছেলে নাই, টাকাও নাই। শুধু জানতে চাই, আমার ছেলে বেঁচে আছে নাকি নাই।
পরিবারের দাবি, ইতালিতে নেওয়ার কথা বলে সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারী চক্র নয়নকে লিবিয়ায় নিয়ে যায়। সেখানে একটি মাফিয়া চক্রের হাতে তুলে দিয়ে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। পরে বিভিন্ন সূত্রে পরিবার জানতে পারে, নির্যাতনের শিকার হয়ে নয়নের মৃত্যু হয়েছে এবং লাশ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো নিশ্চিত তথ্য বা লাশ পাওয়া যায়নি।
নয়নের পরিবার সরকারের কাছে দ্রুত তার প্রকৃত অবস্থান শনাক্ত এবং মানব পাচারের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
এ ঘটনায় নয়ন মোল্লার বড় ভাই শামীম মোল্লা বাদী হয়ে মাদারীপুরের মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন। মামলাটির জি আর নম্বর ১৪৫/২৬ (আর)। মামলায় সাতজনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ নম্বর আসামি সিন্টু মাতুব্বর বর্তমানে জেলহাজতে রয়েছেন।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

