আজ ২৬ জুন, দহগ্রামবাসীর জন্য আনন্দের দিন আজ। বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন। লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলা সদরের ১০ কিলোমিটার দূরে এই তিন বিঘা করিডোরের অবস্থান। এই করিডোর ব্যবহারের সুযোগ পেতে বহু বিধিনিষেধ মানতে হতো বাংলাদেশের মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন ছিটমহল দহগ্রাম-আঙ্গরপোতাবাসীকে।
’৯০-এর দশক পর্যন্ত তাদের পোহাতে হতো নানা ভোগান্তি। ভারতের অভ্যন্তরে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ছিটমহল ছিল দহগ্রাম ও আঙ্গরপোতা।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী স্বতন্ত্র ভূমি যা ভারতের মালিকানাধীন। মাত্র তিনবিঘা জায়গার মধ্যে অবস্থিত। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলে যাতায়াতের সুবিধার্থে এটি বাংলাদেশকে ইজারার মাধ্যমে দেয় ভারত। এই সরু রাস্তা দিয়ে দুই দেশের নাগরিকেরা চলাচল করে। এছাড়াও রাস্তার মাঝখানে দায়িত্ব পালন করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বিজিবি সদস্যরা।
১৯৭৪-এর মুজিব- ইন্দিরা চুক্তি অনুযায়ী হস্তান্তরকৃত এ তিন বিঘা করিডোরের আয়তন হওয়ার কথা ছিল দৈঘ্যে ১৭৮ মিটার এবং প্রস্থে ৮৫ মিটার। অথচ সাবেক ছিটমহলবাসী ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছে মাত্র ৯ ফিট একটি সরু রাস্তা। ফলে সীমাহীন দুর্ভোগসহ নানা সমস্যার মধ্যদিয়ে পারাপার হতে হচ্ছে প্রায় ২২ হাজার দহগ্রামবাসীকে।
এ ছাড়াও বিএসএফ চেকপোস্ট, সিসি ক্যামেরা, ট্রাফিক পোস্ট, অবজারভেশন টাউয়ার ইত্যাদির সমন্বয়ে নিছিদ্র নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতাবাসীকে যাতায়াত করতে হয় তিন বিঘা করিডোরের ওপর দিয়ে। বর্তমান ৯ ফুটের রাস্তায় চার ও ছয় চাকার গাড়ি প্রবেশ করলে সব ধরনের যান বাহনকে অপেক্ষা করতে হয় পানবাড়ী বা দহগ্রাম পোস্টে।
গাড়ি ক্রস করার পর অপেক্ষমান যান বাহন যাওয়া-আসা শুরু করে। করিডরের দুই ধারে লাইটপোস্ট ও ফুলের টব লাগানোর ফলে করিডোরটি ৯-১০ ফুটে পরিণত হয়েছে । এতে অনেক সময় গাড়ির বাম্পার কিংবা পরিবহনকৃত মালামালের ধাক্কায় ভারতীয় স্থাপনার কোনো ক্ষতি হলে বাংলাদেশিদের নানা রকম হয়রানিসহ গুনতে হয় জরিমানা।
১৯৭৪ সালের আন্তর্জাতিক চুক্তির সব শর্তকে ভারত বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে এখনো তাদের দখলে রেখেছে তিন বিঘা করিডোর। এর ফলে উভয় দেশেই তাদের ছিটমহলে যথাক্রমে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ও দক্ষিণ বেরুবাড়ীর যাতায়াত সুবিধা তৈরি হয়।
১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ চুক্তি অনুসারে সঙ্গে সঙ্গেই দক্ষিণ বেরুবাড়ী ভারতের কাছে হস্তান্তর করে। তবে ভারত তিন বিঘা করিডোর বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করতে ভারতের সাংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন ছিল, যা রাজনৈতিক কারণে আজও সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সরকারের অনেক বিরোধিতার পর ২০১১ সালে ভারত পূর্ণভাবে এটি বাংলাদেশকে দেওয়ার বদলে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে ইজারা হিসাবে দিয়েছিল এই শর্তে যে একই সময়ে দক্ষিণ বেরুবাড়ী ভারতের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। পূর্বে করিডোরটি দিনের ১২ ঘণ্টা সময়ের জন্য উন্মুক্ত ছিল।
পরবতীতে বিগত ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মধ্যকার বাংলাদেশ-ভারত সরকারের একটি চুক্তি অনুযায়ী বর্তমানে করিডোরটি ২৪ ঘণ্টাই উন্মুক্ত করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ২০১১ সালের ১৯ শে অক্টোবর করিডোরটি উন্মুক্ত ঘোষণা করা হলেও এখনো ভারতীয়দের দখলে রয়েছে তিন বিঘা করিডোরের গেটটি।
দহগ্রাম আঙ্গরপোতা সংগ্রাম কমিটির সম্পাদক রেজানুর রহমান রেজা বলেন, ১৯৭৪ সালে যে চুক্তি হয়েছিল সে চুক্তি অনুসারে বেড়ুবাড়ি এলাকা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে কিন্তু বিনিময়ে আমরা তিন বিঘা করিডোর পাইনি। এ জন্য দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম করেও তেমন কোনো ফল পাওয়া যায়নি। আমরা সুবিধামতো এখান দিয়ে যাতায়াত করতে পারছি না। নির্দিষ্ট পরিমাণ গৃহপালিত পশু নিয়ে যাওয়া-আসা করা যায় না অথচ এখানে কয়েক লাখ মানুষ কৃষি ও পশুপালনের ওপর নির্ভরশীল। আমরা স্বাধীনতার পূর্ণতা এখনো পাইনি।
দহগ্রামের বাসিন্দা আব্বাস আলী বলেন, আগে তিন বিঘা করিডোর দিয়ে সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত যাতায়াত করা যেত। এরপর করিডোর বন্ধ করে দেওয়া হতো। ‘করিডোর বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে আমরা অনেক সময় মুমূর্ষু রোগীদের নিয়ে সন্ধ্যার পর শহরে আসতে পারতাম না। অনেকেই বিনা চিকিৎসায় মারা যেতেন। এখন তিন বিঘা করিডোর ২৪ ঘন্টা খুলে দেওয়া হয়েছে। তবে খুলে দেওয়া হলেও করিডারটি এখনো ভারতের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে । আমরা চুক্তি অনুসারে করিডরের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা চাই।
দহগ্রামের অধিবাসী মরিয়ম আখতার বলেন, ভারতীয় বিএসএফের কোনো ভিআইপি আসলে আমাদের তিন বিঘা করিডরের গেট তারা বন্ধ করে দেয়, তখন দীর্ঘ সময় গেটের সামনে আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হয়, এইভাবে প্রায় আমাদের দহগ্রামবাসীকে শাসন করে আসছে তারা।
প্রতি বছর ২৬ জুন দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা মুক্ত দিবস কর্মসূচি পালন করা হয়। এবারও দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা সংগ্রাম কমিটির উদ্যোগে নানা আয়োজনের মধ্যে দিয়ে পালন করা হয়।
এদিকে ১৯৭৪ সালে (মুজিব–ইন্দিরা গান্ধী চুক্তি) সঙ্গে ছিটমহল বিনিময় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় । এই চুক্তির অন্যতম শত ছিল, দক্ষিণ বেরুবাড়ী ভারতের কাছে হস্তান্তরের বিনিময়ে বাংলাদেশের দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলের দৈর্ঘ্যে ১৭৮ মিটার এবং প্রস্থে ৮৫ মিটার ভূমি স্থায়ী ইজারাসহ বাংলাদেশের ভূখণ্ডের সঙ্গে একীভূত হবে এবং ওই ভূখণ্ডটুকু বাংলাদেশের অধীনে থাকবে।
তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রতি যথাযথ সম্মান দেখিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সংসদে বিল পাশ করে দুই বগমাইলের বেরুবাড়ী ভারতের কাছে হস্তান্তর করে। কিন্তু বিনিময়ের শতানুযায়ী তিন বিঘা করিডর আজও পায়নি বাংলাদেশ। ফলে এখনো ভারতের দখলে রয়েছে দেশের এই বহুল আলোচিত তিন বিঘা করিডোরটি।
উল্লেখ্য, ১৯৯২ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন তৎকালীন সরকার ভারতকে বাৎসরিক এক টাকা খাজনা কর দেওয়ার সম্মতিতে ৯৯ বছরের জন্য তিন বিঘা করিডোর লিজ নেয়। ওই বছরের ২৬ জুন খুলে দেওয়া হয় তিন বিঘা করিডোর। সম্প্রতি এ কর আড়াই টাকা করা হয়েছে। কিন্তু শুরু থেকে এখনও প্রস্থে মাত্র ৯ ফুট পাকা রাস্তা ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে বাংলাদেশিরা।
শর্ত অনুযায়ী করিডোরের ভেতর দুপক্ষ কোনো স্থাপনা নির্মাণ করতে পারবে না। কিন্তু বিএসএফ করিডোরের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে দুটি চেকপোস্ট নির্মাণ করেছে। করিডোরের নিয়ন্ত্রণ বিজিবির হাতে থাকার কথা থাকলেও কোনোভাবেই মানছে না ভারত সরকার ।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

