আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

লক্ষ্যচ্যুত বাণিজ্যমেলা এখন বিনোদন কেন্দ্র

সোহেল রহমান

লক্ষ্যচ্যুত বাণিজ্যমেলা এখন বিনোদন কেন্দ্র
ছবি: সংগৃহীত

দেশি পণ্যকে বিশ্ববাজারে পরিচিত করা, বিদেশি ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে দেশি উদ্যোক্তাদের সংযোগ তৈরি এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্য নিয়ে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার যাত্রা শুরু হয়েছিল। তবে তিন দশক পর এসে সেই মেলা এখন পরিণত হয়েছে মূলত এক বিনোদন কেন্দ্রে। রপ্তানি-সংশ্লিষ্টদের মতে, চলতি বছরের ৩০তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা নামেই কেবল আন্তর্জাতিক, বাস্তবে লক্ষ্য থেকে বহু দূরে এই আয়োজন।

বিজ্ঞাপন

তিন দশক ধরে বড় পরিসরে আয়োজন হলেও মেলাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিতে পারেনি রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। প্রতিবছর বিভিন্ন দেশে ৩০ থেকে ৩৫টি আন্তর্জাতিক মেলায় অংশ নিলেও নিজেদের আয়োজন বিশ্বমানের করতে পিছিয়েই থাকছে সংস্থাটি। দীর্ঘ যাত্রায় লক্ষ্যচ্যুত এ মেলা এখন শুধুই বিনোদন কেন্দ্র।

ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায় প্রবেশ করতেই যে চিত্র চোখে পড়ে, তা অনেকের কাছেই হতাশাজনক। চারপাশ থেকে ভেসে আসে বাহারি হাঁকডাক, যা শুনলে আন্তর্জাতিক কোনো প্রদর্শনীর চেয়ে বরং ফুটপাতের বাজারের কথাই বেশি মনে পড়ে। মেলার ভেতরে একাধিক স্টলে খাদ্যপণ্য ও নানা সামগ্রী বিক্রি করতে দেখা যাচ্ছে, যার মান নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন দর্শনার্থীরা। ঢাকার গুলিস্তান, চকবাজার, ফার্মগেট, নিউমার্কেটসহ বিভিন্ন স্থানে ফুটপাতে যেসব পণ্য বিক্রি হয়, সেসব পণ্যে ভরে গেছে মেলা। দর্শনার্থীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায় এমন নিম্নমানের পণ্য ও হকারি পরিবেশ প্রত্যাশিত নয়। এতে মেলার মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। অন্যদিকে মেলায় অংশ নেওয়া দেশি ব্যবসায়ীরা দাবি করেন, মেলা একটি উৎসবমুখর আয়োজন হওয়ায় ক্রেতা আকর্ষণে ডেকে ডেকে পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত মেলায় প্রতারণার অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে তাদের টিম কাজ করছে। ইতোমধ্যে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরি ও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি রাখায় গত কদিনে কয়েকটি খাবারের দোকানকে জরিমানা করা হয়েছে।

যাত্রার শুরু ও উদ্দেশ্য

বাংলাদেশে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৫ সালে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) যৌথভাবে ঢাকার শেরেবাংলা নগরে প্রথম এই মেলার আয়োজন করে। মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশি শিল্পপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচার বৃদ্ধি করে বিদেশি ক্রেতাদের মাধ্যমে রপ্তানি আদেশ সংগ্রহ। এছাড়াও আমদানি–রপ্তানিকারকদের এক প্ল্যাটফর্মে এনে পোশাকনির্ভর রপ্তানির বাইরে নতুন খাতের সৃষ্টি করা। প্রথম কয়েক বছর মেলায় বিদেশি স্টল ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে চোখে পড়লেও ধীরে ধীরে সাধারণ ক্রেতাকেন্দ্রিক চরিত্রই প্রাধান্য পেতে থাকে। ২০২২ সাল থেকে পূর্বাচলে মেলা স্থানান্তর করা হয়। স্থায়ী অবকাঠামো, আধুনিক লে-আউট ও বড় পরিসরের সবকিছু থাকলেও ৩০তম মেলাতেও লক্ষ্য পূরণে কোনো পরিবর্তনের ছাপ নেই। চলতি বছর মেলায় ৩২৪টি স্টল রয়েছে, তবে বিদেশি প্যাভিলিয়ন মাত্র ১১টি। কয়েকটি দেশ থেকে হাতেগোনা প্রতিষ্ঠান অংশ নিলেও বিদেশি ক্রেতা বা বড় ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদলের উপস্থিতি প্রায় চোখেই পড়েনি।

রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষ্য কেন অধরাই রইল

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হওয়া উচিত রপ্তানি আদেশ। অথচ প্রতিবছর মেলা শেষে যে রপ্তানি আদেশের হিসাব দেওয়া হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকে। রপ্তানি-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেলায় অংশ নেওয়া অধিকাংশ দেশি স্টলে রপ্তানিযোগ্য পণ্য নেই বরং ভালো মানের পণ্য প্রদর্শনের বদলে স্থানীয় বাজারের জন্য উৎপাদিত বা রপ্তানি-বাতিল পণ্যই বেশি। তাই এতে তৈরি পোশাকসহ প্রধান রপ্তানি খাতের বড় ব্র্যান্ডগুলোর মেলার প্রতি আগ্রহ কম।

বিদেশি ক্রেতার উপস্থিতি নেই

বিজিএমইএ নেতারা প্রকাশ্যেই বলছেন, এই মেলাকে আর আন্তর্জাতিক মেলা হিসেবে দেখা হয় না। বরং বিশেষায়িত বস্ত্র বা ডেনিম মেলা থেকেই প্রকৃত রপ্তানি আদেশ আসে। এ মেলায় বিদেশি ক্রেতার তেমন কোনো উপস্থিতিও নেই, দেশি-বিদেশি পণ্যের মান যাচাই বা ব্যবসায়িক আলোচনা এখানে গৌণ। তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার মূল উদ্দেশ্য থাকে বিদেশি ক্রেতারা পছন্দ হলে নিজ দেশে ফেরার আগে কিছু পণ্যের ক্রয়াদেশ দেবেন। অন্যদিকে, দেশি আমদানিকারকরা বিদেশে না গিয়ে মেলার মাধ্যমে পণ্য খুঁজে নেবেন। তবে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায় এ দুটি উদ্দেশ্যের কোনোটির যথাযথ প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

বিনোদন বনাম বাণিজ্য

মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে যে বাস্তবতা দেখা হলো—এই মেলা এখন ঢাকা ও তার আশপাশে বসবাসকারীদের জন্য বড় একটি বিনোদনকেন্দ্র। পরিবার নিয়ে ঘোরাঘুরি, কেনাকাটা, খাবার—সবকিছু এক জায়গায় পাওয়ায় জনসমাগম কমছে না। এছাড়াও এবার গ্যাস সংকটের কারণে ইলেকট্রিক ইন্ডাকশন ও ইনফ্রারেড চুলার ব্যাপক চাহিদা দেখা গেছে। মেলায় অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীরাও স্বীকার করেন, রপ্তানি না হলেও দেশীয় বিক্রিতে লাভ হচ্ছে।

ইপিবির কর্মকর্তারা বলছেন, মাসব্যাপী মেলাকে আন্তর্জাতিক মানে নেওয়া কঠিন। ভিসা, কাস্টমস, পরিবহন, আবাসন—সবকিছু মিলিয়ে বিদেশি অংশগ্রহণ বাড়ানো চ্যালেঞ্জিং। তবে তারা দাবি করেন, মেলাটি ব্র্যান্ডিং ও নেটওয়ার্কিংয়ের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে।

ইপিবি সচিব তরফদার সোহেল রহমান আমার দেশকে বলেন, ৩০ বছর ধরে ধারাবাহিক মেলার আয়োজন সাফল্যেরই অংশ। এছাড়াও মেলা বিষয়ে সার্বিক তথ্য নিতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করারও পরামর্শ দেন।

এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আমার দেশকে বলেন, ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা কখনই রপ্তানিকারকদের জন্য সহায়ক ছিল না। রপ্তানি আদেশ গ্রহণ করার চেয়ে ভারত, পাকিস্তান ও নেপালসহ অন্য দেশের পণ্য বেশি ক্রয় হয়েছে মেলার মাধ্যমে । আমাদের রপ্তানি পণ্য বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পৌঁছাতে পারেনি।

তিনি বলেন, এরচেয়ে সম্প্রতি ইপিবি যে গ্লোবাল সোর্সিং এক্সপোর আয়োজন করেছে, সেটি রপ্তানি পণ্য তুলে ধরতে সহায়ক। সোর্সিং এক্সপো আয়োজন করা হলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। ইপিবির উচিত এ ধরনের আয়োজন নিয়মিত করা।

ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, মেলার সময় ৩০ দিন থেকে কমিয়ে এক সপ্তাহ করা প্রয়োজন। মেলা প্রাঙ্গণে নির্দিষ্ট খাতভিত্তিক আলাদা আলাদা প্যাভিলিয়নের ব্যবস্থা রাখতে হবে, বিদেশি ক্রেতাদের জন্য আলাদা বি-টু-বি জোন, সে সঙ্গে মানহীন ও খুচরা বিক্রিভিত্তিক স্টল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ ধরনের সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা ছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায় রূপ দেওয়া কঠিন।

রপ্তানি-সংশ্লিষ্টদের মতে, ৩০ বছর পেরিয়ে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা তার মূল লক্ষ্য রপ্তানি বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক সংযোগ অর্জনে ব্যর্থ। অবকাঠামো ও আয়োজন বড় হলেও দর্শন বদলায়নি। ফলে এই মেলা এখন অর্থনৈতিক কূটনীতির প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং এক মাসের বড় বিনোদন ও কেনাকাটার উৎসব।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন