সুদহার বাড়ায় বিনিয়োগে খরা ব্যাংকে অলস টাকার পাহাড়

রোহান রাজিব

সুদহার বাড়ায় বিনিয়োগে খরা ব্যাংকে অলস টাকার পাহাড়

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদহার বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর প্রভাব পড়েছে বিনিয়োগে। উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগে যাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে সুদহার সীমা তুলে দেওয়ার পর ভালো অবস্থায় থাকা ব্যাংকগুলোয় অস্বাভাবিক হারে আমানত বাড়ছে। তবে এর বিপরীতে ব্যাংকগুলো পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতে পারছে না। এতে ব্যাংকগুলোয় অতিরিক্ত তারল্য বা অলস টাকার পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে।

ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, চাহিদামতো সরকারের ট্রেজারি বিল-বন্ড, কল মানি ও অন্য ব্যাংকে আমানত হিসেবেও রাখতে পারছে না। এতে জমা টাকা নিয়ে সমস্যায় পড়ে গেছে কিছু ব্যাংক।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য বেড়ে হয়েছে তিন লাখ ৭৮ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে তুলনায় অতিরিক্ত তারল্য বেড়েছে ৫৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। গত বছরের মার্চ অতিরিক্ত তারল্য ছিল দুই লাখ ৩৮ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা।

ব্যাংক খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ব্যাংক খাতের আর্থিক চিত্র সামনে চলে এসেছে। এতে কিছু ব্যাংকের অবস্থা নাজুক দেখা গেছে। আবার কিছু ব্যাংকের অবস্থা ভালো দিকে রয়েছে। সাধারণ মানুষ ভালো ব্যাংকগুলোয় তাদের সঞ্চয় জমা করছে। এতে ভালো ব্যাংকগুলোয় আমানত বাড়লে বিনিয়োগ করতে পারছে না। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও উচ্চ সুদের কারণে কমে গেছে

বেসরকারি খাতের ঋণ। আবার বর্তমান পরিস্থিতিতে ঋণ দিতেও সতর্ক হয়ে গেছে কিছু ব্যাংক। ফলে ব্যাংকগুলোয় অতিরিক্ত তারল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।

গত মার্চে ব্যাংকগুলোর তারল্য রাখার প্রয়োজন ছিল তিন লাখ ১৬ হাজার ৬৫ কোটি টাকা। তবে কিছু ব্যাংক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি রাখায় ব্যাংক খাতে মোট তারল্য দাঁড়িয়েছে সাত লাখ দুই হাজার ৫৮ কোটি টাকা।

প্রয়োজনের তুলনায় যা রাখা হয়েছে, তা হলো—অতিরিক্ত তারল্য। প্রয়োজনীয়তা স্ট্যাচুটরি লিকুইডিটি রেশিও (এসএলআর) ও ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও (সিআরআর) বজায় রাখার পরে অতিরিক্ত তারল্য হিসাব করা হয়। ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকে মোট আমানতের চার শতাংশ সিআরআর নগদ আকারে এবং ১৩ শতাংশ এসএলআর নগদ আকারে জমা রাখতে হয়।

জানা গেছে, গত মার্চে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় আমানতে প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং ঋণে প্রবৃদ্ধি চার দশমিক ৭৩ শতাংশ। ওই সময় বেসরকারি খাতে ঋণে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ।

সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শওকত আলী আমার দেশকে বলেন, বর্তমানে অনেক ব্যাংকের অবস্থা খারাপ। গ্রাহক সেসব ব্যাংকের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। গ্রাহক তার জমানো টাকার নিরাপত্তা চায়। যে ব্যাংকে গ্রাহকের আস্থা রাখতে পারছে, সেখানেই টাকা রাখছে। এ ক্ষেত্রে অনেক দুর্বল ব্যাংক থেকে টাকা তুলে আমার ব্যাংকে রাখছে। এজন্য তারল্য খুব দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। তারল্য যত দ্রুত বাড়ছে, তত দ্রুত ঋণ দেওয়া কিন্তু সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, ঋণ বাড়াতে একটু সময় লাগে। ভালো গ্রাহক নির্বাচন করতে হয়। ফলে তারল্য তুলনামূলকভাবে বেড়ে যাচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, ঋণ বাড়াতে না পারলেও এসব অর্থ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হচ্ছে। কারণ এসব টাকার ওপর আমাকে কিন্তু গ্রাহককে সুদ দিতে হচ্ছে। তাই আমি অগ্রাধিকার খাতের ঋণ দিচ্ছি। পাশাপাশি সরকারি সিকিউরিটিজ ট্রেজারি বিল বন্ডে বিনিয়োগ করছি।

তবে তারল্য নিয়ে সব ব্যাংকের পরিস্থিতি এক না। অনেক ব্যাংক প্রয়োজনীয় তারল্য রাখতে পারছে না। এর মধ্যে রয়েছেÑ ন্যাশনাল ব্যাংক, এবি ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক তারল্য ঘাটতিতে রয়েছে।

এদিকে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য কাজে লাগাতে ৬১ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হবে ব্যাংকগুলোর নিজস্ব তহবিল থেকে। এক্ষেত্রে ভালো অবস্থায় থাকায় ব্যাংকগুলোর অলস টাকা এনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব ব্যাংকের মাঝে টাকা বরাদ্দ করার পরিকল্পনা করছে। এছাড়া ১৯ হাজার কোটি টাকা হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ৪১ হাজার কোটি টাকার মধ্যে বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। এতে দুই লাখ কর্মসংস্থান তৈরির আশা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কটেজ, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের (সিএমএসএমই) জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। এই খাতে পাঁচ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে।

কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি খাতের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এই খাতে ৯ লাখ কর্মসংস্থান হবে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ খাতের জন্য তিন হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, এই খাতে ৫০ হাজার কর্মসংস্থান তৈরি হবে।

এবার প্রথমবারের মতো উত্তরবঙ্গে কৃষির কেন্দ্র (হাব) গড়ে তোলার লক্ষ্যে তিন হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে; এক লাখ কর্মসংস্থান করা হবে। এজন্য গ্রাহকদের সুদ দিতে হবে ৭ শতাংশ। বর্তমানে ব্যাংকগুলোয় সুদের হার ১৪ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। ফলে বিদ্যমান সুদের চেয়ে প্রায় অর্ধেক সুদে ঋণ নিতে পারবেন শিল্পোদ্যোক্তারা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...