আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

আওয়ামী আমলের লুকানো খতিয়ান

খেলাপি ঋণ ছাড়াল ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা

রোহান রাজিব

খেলাপি ঋণ ছাড়াল ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা

দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ মহামারি আকার ধারণ করছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে এ ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায়, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। বর্তমান খেলাপি ঋণের এ হার দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ১৯৯৯ সালে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪১ দশমিক ১ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এস আলম ও বেক্সিমকোসহ কয়েকটি গ্রুপ নামে–বেনামে ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিয়েছে। এসব ঋণ পরিশোধ না করা হলেও ব্যাংকগুলো যথাসময়ে তা খেলাপি দেখায়নি। আবার নীতিসহায়তার আড়ালে খেলাপি ঋণের তথ্য গোপন করারও সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সরকার পতনের পর এ ধরনের সুযোগ বন্ধ হয়েছে। ব্যাংকগুলোও লুকানো খেলাপি ঋণ দেখাতে শুরু করেছে। ফলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন সরকার গঠন করে, তখন মোট খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। এরপর থেকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। অর্থনীতিবিদরা অনেক দিন ধরেই অভিযোগ করে আসছিলেন, সরকারঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালীরা নানা অনিয়মের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বের করে নিয়ে যাচ্ছেন, যার একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার হয়ে গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে মোট বিতরণ করা ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ তিন হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল দুই লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা বা ১৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। সে হিসেবে এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে তিন লাখ ৫৯ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, গত সরকারের সময়ে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ করা হতো না। তখন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ঋণের শ্রেণিবিন্যাস করা হয়নি। তবে বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করছে। এতে জমে থাকা পুরোনো খেলাপি ঋণও দৃশ্যমান হচ্ছে। বর্তমানে ঘোষিত ৩৬ শতাংশের হার আরো বেড়ে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ নিয়ে দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকলে দেশের আর্থিক খাতে বড় ধরনের ক্ষতির সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে ব্যাংকগুলোতে ক্যাপিটাল শর্টফল ও প্রভিশনিং ঘাটতি তৈরি হতে পারে, বিদেশি ব্যাংক ও সরবরাহকারীরা এলসি গ্রহণে অনাগ্রহ দেখাতে পারে এবং ব্যাংকগুলোর আয়ের ওপরও চাপ পড়তে পারে। সুতরাং খেলাপি ঋণ কমানো এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সমালোচনা করে তিনি বলেন, একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজন। দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে, এতে ঋণখেলাপিরা আরো উৎসাহিত হবে। খেলাপি ঋণ কমাতে হলে ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত খেলাপিদের চিহ্নিত করতে হবে। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের কাছ থেকে স্বাভাবিকভাবে ঋণ আদায় করা কঠিন। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন প্রশাসনিক পদক্ষেপ, সরকারিভাবে দৃঢ় উদ্যোগ ও আইনগত ব্যবস্থা। আর যেসব ঋণগ্রহীতা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির কারণে খেলাপি হয়েছেন, তাদের সঙ্গে আলোচনা করে বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।

আইএমএফের ঋণ চুক্তির আওতায় ২০২৬ সালের মধ্যে বেসরকারি খাতে খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশ এবং সরকারি ব্যাংকে ১০ শতাংশের নিচে নামাতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৪৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ, বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর ৩৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ, বিদেশি ব্যাংকের ৪ দশমিক ৯২ শতাংশ এবং বিশেষায়িত ব্যাংকের ৪১ দশমিক ৯৫ শতাংশ।

সম্প্রতি খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিক বৃদ্ধি নিয়ে আইএমএফ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণ কী এবং তা কমাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তা জানতে চেয়েছে। একই সঙ্গে ৩০ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে এমন ব্যাংকগুলোর অবসায়ন বা একীভূত করার পরামর্শ দিয়েছে।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ কমানোর কিছু উদ্যোগের কথা জানালেও অবসায়নের পরামর্শে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেয়নি। আইএমএফের উদ্বেগ প্রকাশের পরপরই খেলাপি ঋণ কমাতে ৪৭টি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে খেলাপি ঋণ কমানোর তাগিদ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন