মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কঠিন পরীক্ষা

এম মাসরুর রিয়াজ

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কঠিন পরীক্ষা
এম মাসরুর রিয়াজ

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের অন্যতম ইতিবাচক দিক হলো সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের বিষয়গুলোকে সমন্বিতভাবে মোকাবিলার প্রচেষ্টা। আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি সাত দশমিক পাঁচ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছয় দশমিক পাঁচ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি পাঁচ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাজেট বক্তৃতায় অবশ্য স্বীকার করা হয়েছে, টাকার অবমূল্যায়ন, উচ্চ বিনিময় হার, আমদানিনির্ভরতা এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে জ্বালানি, এলএনজি ও সারের মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করেছে। এসব বাস্তবতা স্বীকার করা নিঃসন্দেহে বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। এসব লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে সরকার বাজেটকে কেবল ব্যয়ের পরিকল্পনা হিসেবে নয়, বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি নীতিগত রূপরেখা হিসেবে উপস্থাপন করেছে।

বিজ্ঞাপন

বিনিয়োগ ও শিল্পায়নকে উৎসাহিত করতে বাজেটে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ব্যবসা পরিচালনা সহজ করতে সরকার ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে। বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের লক্ষ্যে সম্ভাবনাময় ১৯টি খাতকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি এফডিআই হিট ম্যাপ প্রণয়ন করা হয়েছে।

এছাড়া, পটুয়াখালী ও যশোরে নতুন রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) স্থাপন করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে প্রায় আড়াই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, চাঁদপুর ও কুষ্টিয়ায় নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা আঞ্চলিক শিল্পায়নকে ত্বরান্বিত করতে সহায়তা করবে।

এছাড়া কৃষিপণ্য, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, ওষুধ, ইলেকট্রনিকস, স্বর্ণ ও হীরাসহ সম্পূর্ণ রপ্তানিমুখী খাতগুলোর জন্য বন্ডেড গুদাম সুবিধা অথবা ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে শুল্কমুক্ত আমদানির প্রস্তাব করা হয়েছে। এই উদ্যোগ বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ জোরদারের লক্ষ্যে ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার ‘স্টিমুলাস প্যাকেজ-২০২৬’। এ প্যাকেজের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা থেকে এবং ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে সরবরাহ করা হবে।

প্যাকেজের আওতায় বৃহৎ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করা এবং সেবা খাতকে সহায়তা দেওয়ার জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা, কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা, রপ্তানি বহুমুখীকরণের জন্য তিন হাজার কোটি টাকা এবং উত্তরাঞ্চলকে কৃষিভিত্তিক উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে আরো তিন হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

ঋণ নেওয়াকে সাশ্রয়ী রাখতে সরকার ছয় শতাংশ সুদে ভর্তুকি প্রদান করবে। এ প্যাকেজের মাধ্যমে ২৫ লাখেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এছাড়া, আইডকোল, বিআইএফএফএল এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের জন্য দুই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বাজেটে উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ স্থাপন, বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন ২০২৬, নারী শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ আবাসন ও পরিবহন সুবিধা, পিংক বাস সেবা, শিশুশ্রম নিরসনে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা এবং প্রবাসী কার্ড চালুর মতো উদ্যোগগুলো শ্রমবাজারকে আরো শক্তিশালী করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

২০২৬ সালের মার্চ মাসে প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) প্রবাহ রেকর্ড তিন দশমিক ৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। বৈধ চ্যানেলে পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর দুই দশমিক পাঁচ শতাংশ নগদ প্রণোদনা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

শিল্প প্রতিযোগিতা ও উদ্ভাবনের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির (এসআইসিআইপি) আওতায় দুই লাখ ২০ হাজার মানুষকে বাজারমুখী প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, যার মধ্যে অন্তত ৬৫ শতাংশের কর্মসংস্থান হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করে এক লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা করা হয়েছে, যা জিডিপির দুই শতাংশের সমপরিমাণ। আগের অর্থবছরে এ বরাদ্দ ছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা। দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা খাতে ব্যয় জিডিপির পাঁচ শতাংশে উন্নীত করার ইচ্ছাও সরকার প্রকাশ করেছে।

ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা, তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা, স্কুল মিল কর্মসূচি, ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ উদ্যোগ, মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ, বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই সুবিধা, শিল্প খাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে শক্তিশালী সংযোগ এবং শিক্ষানবিস কর্মসূচির মতো উদ্যোগগুলো দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পরিধিও আরো সম্প্রসারণ করা হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা খাতে মোট ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্ব ও শিশুসহায়তা কর্মসূচি এবং জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য এককালীন সহায়তা বৃদ্ধি—এসব উদ্যোগ সমাজের ঝুঁকিপূর্ণ ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর উপকারে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় ৪১ লাখ নারীকে মাসিক আড়াই হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তবে এসব ইতিবাচক উদ্যোগের পাশাপাশি বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু মুদ্রানীতি কঠোর করা কিংবা কর সমন্বয় যথেষ্ট হবে না; এর পাশাপাশি বাজার তদারকি জোরদার করা, সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন, মজুতদারি প্রতিরোধ এবং জ্বালানির মূল্য স্থিতিশীল রাখাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

একইভাবে, প্রণোদনা প্যাকেজের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে, যাতে বরাদ্দকৃত অর্থ উৎপাদনশীল খাত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই), নারী উদ্যোক্তা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী ব্যবসাগুলোর কাছে যথাযথভাবে পৌঁছায়।

ব্যাংকিং খাতের সংস্কারও এখন জরুরি অগ্রাধিকার হিসেবে রয়ে গেছে। বাজেটে যথার্থভাবেই আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতাকে সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে খেলাপি ঋণ কমানো, ঋণ অনুমোদন ও পুনঃতফসিলে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, দুর্বল ব্যাংকের সংস্কার এবং করপোরেট সুশাসন জোরদারের মতো পদক্ষেপের প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে খেলাপি ঋণের হার ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে পৌঁছানো এবং ব্যাংকিং খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত নেতিবাচক হয়ে যাওয়ায় এ খাত এখনো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে। সরকার ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণ, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এবং করপোরেট বন্ড, গ্রিন বন্ড ও সুকুকের মতো বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থার প্রস্তাব দিলেও এসব উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নই হবে মূল চাবিকাঠি।

সব মিলিয়ে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে এর সাফল্য কেবল নীতিগত ঘোষণা বা পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করবে না; বরং কার্যকর বাস্তবায়ন, জবাবদিহিতা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং তথ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করার ওপরই নির্ভর করবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন