আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি নিয়ে এনবিআরের তৎপরতা

কাওসার আলম

দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি নিয়ে এনবিআরের তৎপরতা

দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) চলছে নানামুখী তৎপরতা। এরই অংশ হিসেবে কয়েকটি দেশের সঙ্গে নতুন করে চুক্তির পাশাপাশি পুরোনো চুক্তি পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি থাকলে চুক্তিবদ্ধ দেশগুলোর বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান আয়কর দেওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধা ভোগ করে থাকে। এতে চুক্তিবদ্ধ দেশগুলোর মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে ৪৩টি দেশের মধ্যে দ্বৈত কর পরিহার (ডিটিএ) চুক্তি রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দ্বৈত কর পরিহারে নতুন করে ইউরোপের তিনটি দেশের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে বাংলাদেশ। দেশ তিনটি হলো—অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি ও আজারবাইজান। এর মধ্যে অস্ট্রিয়া ও হাঙ্গেরির মধ্যে দুই রাউন্ডের আলোচনা শেষ হয়েছে। এ দুটি দেশের সঙ্গে চুক্তিতে উপনীত হওয়ার পথে রয়েছে বাংলাদেশ। কিছু বিষয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও সেগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথে রয়েছে। অন্যদিকে, আজারবাইজানের সঙ্গে প্রথম রাউন্ডের আলোচনা শেষ হয়েছে। এছাড়া উজবেকিস্তান ও নাইজেরিয়ার সঙ্গে আলোচনা শুরুর বিষয়টিও বিবেচনাধীন রয়েছে।

এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, সাধারণত এ ধরনের একটি চুক্তিতে উপনীত হতে তিন থেকে চার রাউন্ডের আলোচনা হয়ে থাকে। একটি দেশের সঙ্গে চুক্তিতে উপনীত হতে কয়েক বছর পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। সুতরাং এসব দেশের সঙ্গে কবে নাগাদ চুক্তি চূড়ান্ত হবে, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন।

এদিকে, কয়েক দশক আগে যেসব দেশের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে, সেগুলো পর্যালোচনা উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর।

কর্মকর্তারা বলেন, বর্তমানে ব্যবসার ধরন ও প্রকৃতি অনেক পাল্টে গেছে। ব্যবসায় ডিজিটালাইজেশন, ই-কমার্স ধারণা যুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া বিনিয়োগ বাড়াতে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, ইকোনমিক জোন ইত্যাদি যুক্ত হয়েছে। এসব কারণে সময়োপযোগী করতে কয়েকটি দেশের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে পাকিস্তান ও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে চুক্তির পর্যালোচনা শুরু হয়েছে। গত ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সিঙ্গাপুরের সঙ্গে এবং তৃতীয় সপ্তাহে পাকিস্তানের সঙ্গে হওয়া চুক্তির পর্যালোচনার প্রথম রাউন্ডের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। অন্যদিকে, আগামী জুন মাসের দিকে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে প্রথম রাউন্ডের আলোচনা শুরু হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮২ সালে সিঙ্গাপুরের সঙ্গে এবং ১৯৮৮ সালে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে দ্বৈত কর চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। আমেরিকা, ইংল্যান্ড, চীন, আরব আমিরাত, কানাডা, জার্মানি, ভারতসহ ৪৩টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি রয়েছে।

অন্যদিকে, পূর্ব আফ্রিকায় অবস্থিত কেনিয়া প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি (ডিটিএ) চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। দুই দেশ চুক্তির বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। গত অক্টোবর-নভেম্বর মাসে এ চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরে দুই দেশের প্রতিনিধিদের সফরসূচির বিষয়টি চূড়ান্ত না হওয়ার কারণে চুক্তি স্বাক্ষর পিছিয়ে গেছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আর এ চুক্তিটি হচ্ছে না। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর সুবিধাজনক সময়ে চুক্তিটি স্বাক্ষর হবে বলে এনবিআর কর্মকর্তারা জানান।

চুক্তির বিষয়ে এনবিআর সদস্য (আন্তর্জাতিক কর) মো. লুৎফুল আজীম আমার দেশকে বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য-বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সে লক্ষ্যে আমরা নতুন কয়েকটি দেশের সঙ্গে চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছি পাশাপাশি পুরোনো যেসব চুক্তি রয়েছে সেগুলো পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছি। চুক্তিবদ্ধ দেশগুলোর মধ্যে ব্যবসায় সম্পর্ক বৃদ্ধি পাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

তিনি আরো বলেন, যেকোনো ব্যবসা বা বিনিয়োগের জন্য ট্যাক্স বা কর একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। সাধারণত যেসব দেশে করহার কম, বিনিয়োগকারীরা সেসব দেশে তাদের বিনিয়োগের ব্যাপারে আগ্রহী থাকেন বেশি। কিন্তু যেসব দেশে করহার বেশি, সেসব দেশে বিনিয়োগ করতে চান না। দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি না থাকলে একই আয়ের ওপর বিনিয়োগকারীকে তার নিজ দেশে এবং যে দেশে বিনিয়োগ করেছেন—সেই দেশেও আয়কর দিতে হবে। ফলে একই আয়ের ওপর দুবার কর দিতে হয়। ফলে বিনিয়োগকারীর জন্য এটি বাড়তি বোঝা তৈরি হয়। কিন্তু দুই দেশের দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি থাকলে আয়কর হারের মধ্যে একটা বণ্টন ব্যবস্থা থাকে। একটি অংশ বিনিয়োগকারীকে তার নিজ দেশে এবং অপর অংশ যে দেশে বিনিয়োগ করেছেন, সে দেশে পরিশোধের সুযোগ পান। এর ফলে দ্বৈত কর থেকে সুরক্ষা পান বিনিয়োগকারীরা। এজন্য বিদেশি বিনিয়োগের জন্য দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

প্রসঙ্গত, দ্বৈত কর হচ্ছে একই আয়ের ওপর দুই দেশের কর দাবি করা। উদাহরণ হিসেবে ধরুন আপনি বাংলাদেশি নাগরিক; কিন্তু আপনি যুক্তরাজ্য বা অন্য দেশ থেকেও কিছু আয় করেন। তাহলে বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যসহ অপর যেসব দেশ থেকে আয় করছেন, সেসব দেশের সরকারও সেই আয়ের ওপর কর দাবি করতে পারে। দ্বৈত কর পরিহার চুক্তির মাধ্যমে একই আয়ের ওপর এ ধরনের করারোপ পরিহার করা যায়। চুক্তির আওতায় করদাতা কর ছাড় কিংবা কর রেয়াত পদ্ধতিতে উপকৃত হতে পারেন। কর ছাড় পদ্ধতিতে একটি দেশ সম্পূর্ণভাবে কর ছাড় দেয় এবং অন্য দেশ শুধু করারোপ করে। কর রেয়াত পদ্ধতিতে একটি দেশে কর পরিশোধ করা হলে অন্য দেশ কর নির্ধারণের সময় তা বিবেচনায় নেয় (রেয়াত দেয়)।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন