আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ঢাকা ১৮-এর একটি কেন্দ্র

ভোট প্রদানের অভিজ্ঞতা উঠে এলো সাংবাদিকের চোখে

জাহেদ চৌধুরী

ভোট প্রদানের অভিজ্ঞতা উঠে এলো সাংবাদিকের চোখে
ছবি: আমার দেশ

রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাসংলগ্ন আজিজ সড়কে ঢাকা-১৮ সংসদীয় আসনের ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৩৭ নম্বর কেন্দ্রটি অবস্থিত। সকাল সোয়া ৭টায় কেন্দ্রে পৌঁছাই। গোটা ত্রিশেক পুরুষ এবং গোটা বিশেক নারী সুন্দর করে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

ধানের শীষের প্রার্থী জাহাঙ্গীর হোসেন ও ১১দলীয় জোটের শাপলা কলির প্রার্থী আরিফ হোসেন আদিবের পক্ষে কেন্দ্রের বাইরে ভোটার স্লিপ দেওয়ার টেবিল ছিল। আরও দুটি টেবিল থাকলেও কেউ স্লিপ দেওয়ার জন্য তখনো আসেননি। ওখানে দুটি পুরুষ ও একটি মহিলা কেন্দ্র একই স্কুল কম্পাউন্ডে। মূল ফটক খোলা হয়েছে নির্দিষ্ট সময়ের মিনিট তিনেক পর— ৭টা ৩৩ মিনিটে।

বিজ্ঞাপন

প্রাঙ্গণে ঢুকেই আমি প্রথম হোঁচট খেলাম একজন পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে। প্রাঙ্গণে ভোটারদের লাইনের ছবি তুলতে গেলে তিনি বাধা দিলেন। বললেন, জানেন না ছবি তোলা নিষেধ। বললাম, এই আদেশ জারির কয়েক ঘণ্টা পরেই সেটা চেঞ্জ হয়েছে। তা-ও তিনি আপত্তি করলেন। বললেন, আইন দেখান। আমি বললাম, ঊর্ধ্বতনের সঙ্গে আপনি কথা বলেন। পরে অন্য পুলিশ কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে বলা হলো, প্রিসাইডিং অফিসার পারমিশন দিলে প্রাঙ্গণের ভোটের লাইনের ছবি তোলা যাবে।

আমি বললাম, প্রাঙ্গণের লাইভ করলেও আপনারা বাধা দিতে পারেন না। নির্বাচন কমিশনের এটাই সর্বশেষ সিদ্ধান্ত। কেবল ভোটকক্ষের ভেতর থেকে ছবি তোলা গেলেও লাইভ করা যাবে না। ভেতরে গেলে পরিচয় নিশ্চিত হয়ে ৩৭ নম্বর কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মিজানুর রহমান কক্ষের ভেতরে তার উপস্থিতিতে ছবি তোলার অনুমতি দিলেন। তবে লক্ষ করলাম—প্রতিটি কক্ষে মাত্র একজনকে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। উনি পুরো প্রক্রিয়া শেষ করে বের হলে আরেকজন ঢোকার অনুমতি পাচ্ছেন। বাইরে লাইন বাড়ছে।

একজন ভোটারের ৩-৪ মিনিট লেগে যাচ্ছে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে। প্রিসাইডিং অফিসারকে বললাম, একটি কক্ষে একসঙ্গে তিনজন ঢুকলে একজনের পরিচয় যাচাই, আরেকজনকে ব্যালট পেপার দেওয়া এবং তৃতীয় জন বুথের ভেতর থাকলে গড়ে এক-তৃতীয়াংশ সময় লাগবে। আরেকটি কক্ষে পৌনে ৮টা বেজে গেলেও ভোট গ্রহণ শুরুই হয়নি। ওই কক্ষের দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার বললেন, এজেন্টরা বাক্সের লক চেক করছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয়ে যাবে। নিয়ম অনুযায়ী সাড়ে ৭টার আগেই এগুলো সেরে ফেলার কথা।

৩৭ নম্বর কেন্দ্রের ১ নম্বর বুথে আমি নিজেও ভোটার। ১৩৮২ আমার সিরিয়াল। ভেতরে গিয়ে দেখলাম বুথ ১ নয়, ২-এ আমার সিরিয়াল পড়েছে। সাংবাদিকতা সেরে নাগরিক দায়িত্ব পালন করতে ২ নম্বর বুথের সামনে গেলাম। ভোটার হিসেবে কক্ষের সামনে যেতেই আনসার সদস্য আটকালেন। বললেন, ভেতরে মাত্র একজন আছে। বের হলে ঢুকবেন। সিরিয়াল নম্বর বলেছি, সাদা কাগজে লিখে দিয়েছি। নির্বাচন কমিশনের ‘অ্যাপ’ স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বিডি থেকে খুব সহজেই এনআইডি নম্বর দিয়ে আমার ভোটের আইডি নম্বর ও সিরিয়াল নম্বর আগেই জেনে নিয়েছিলাম খুব সহজে। সাদা কাগজে কেবল এই জিনিস ও বুথ নম্বর লিখে নিয়ে গিয়েছিলাম। স্মার্ট কার্ড নম্বর কিংবা এনআইডি নাম্বার দিয়ে সব তথ্য সহজে পাওয়া যায়।

এনআইডি নাম্বারই ভোটার নম্বর । তবে সিরিয়াল নম্বর ওই অ্যাপ ছাড়া আমার জানার উপায় ছিল না। তবে কেন্দ্রের বাইরে ভোটার স্লিপ দিচ্ছিলেন প্রার্থীদের লোকেরা। সেখান থেকেও জানা যেত। এনআইডি কার্ড কেউ আমার কাছে চায়নি। তবে সিরিয়াল নম্বর দেখে পোলিং অফিসার আমার নাম ও ছবি মিলিয়েছেন। হঠাৎ করে একজন পোলিং এজেন্ট জিজ্ঞাস করে বসলেন, আমার মায়ের নাম কী। বললাম। ওই এজেন্টের যাচাই প্রক্রিয়া দখে ভালো লাগল।

আমার ফোন সঙ্গেই ছিল। পোলিং অফিসার বললেন, ফোনটা আমার টেবিলে রেখে বুথে যান। দুটো ব্যালট পেপারের জন্য দুটি মুড়িতে স্বাক্ষর করতে হলো। চারকোনা ঘর করা সিলে কালি লাগিয়ে ব্যালট পেপার নিয়ে গোপন কক্ষে ঢুকে সিল মেরে ভাঁজ করে একই ব্যালট বাক্সে দুটো ব্যালট পেপার ফেলে বেরিয়ে এলাম।

দীর্ঘদিন পর মুক্ত পরিবেশে স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরে ৬০ বছরেও নিজেকে তুরুণ মনে হচ্ছিল। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে সহস্র তরুণের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এই গণতান্ত্রিক পরিবেশে সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ শেষে একটি গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হলে চব্বিশের গণঅভ্যূত্থানের স্বার্থকতার পথে দেশ আরেকধাপ এগিয়ে যাবে।

বাইরে এসে ভোটকেন্দ্রের প্রাঙ্গণের দীর্ঘ লাইনের ছবি তুলতে এবার আর পুলিশ অফিসার বাধা দিলেন না।

অন্য একজন এএসআইয়ের কাছে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে বললেন, সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলা আমাদের বারণ আছে।

রিকশায় করে বাসা থেকে এক কিলোমটিার দূরে কেন্দ্রে গিয়েছিলাম। রিকশায় করেই কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে মূল সড়কে অপেক্ষমাণ অফিসের গাড়িতে করে কারওয়ান বাজার অফিসে পৌঁছাতে পৌঁছতে প্রায় সোয়া ৮টা বাজে। ততক্ষণে অফিসে অনলাইন ও মাল্টিমিডিয়ার সহকর্মীদের সকালের ব্যাচের সবাই যোগ দিয়েছেন।

অনেকগুলো নিউজ রাত ও ভোরের শিফটের সহকর্মীরা আপ করেছেন। রাত ২টায় বাসায় ফিরে ভোর ৬টায় উঠে যখন দেখলাম সারা দেশ মোটামুটি শান্ত আছে। আশায় মন ভরে ওঠল এবার হয়তো শান্তিপূর্ণভাবে গণতন্ত্রে উত্তরণের পথে আরও এক সোপান আমরা পেরোনোর পথে রয়েছি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন