বিচারে ধীরগতি, শহীদ পরিবারে হতাশা

ANWARUL AZIM
আনোয়ারুল আজিম তুহিন

বিচারে ধীরগতি, শহীদ পরিবারে হতাশা

গতি নেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারে। ঢিমেতালে এগোচ্ছে জুলাই গণহত্যার মামলার বিচারিক কার্যক্রম। ট্রাইব্যুনালের তালিকায় ৭০টির বেশি মামলা বা অভিযোগ থাকলেও নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র চারটির। মামলা ও অভিযোগের চাপে ধুঁকছেন ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

জুলাই গণহত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত গ্রেপ্তার আওয়ামী জোটের ১১ হেভিওয়েট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত কার্যক্রমও মন্থর গতিতে চলছে। গুরুতর অন্য অভিযোগুলোর তদন্তেও দীর্ঘসূত্রতা দেখা যাচ্ছে। এমন অভিযোগ শহীদ পরিবারসহ বিচারপ্রার্থীদের।

বিজ্ঞাপন

ট্রাইব্যুনালের একাধিক প্রসিকিউটর জানান, ট্রাইব্যুনালে অধিক মামলার চাপ, প্রয়োজনীয় লোকবল, লজিস্টিক সাপোর্ট এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতায় বিচার কার্যক্রমকে কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

বিচারপ্রার্থী শহীদ পরিবারের সদস্যরা জানান, তাদের মধ্যে দ্রুত ও ন্যায়বিচার না পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জুলাই বিপ্লবে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের পর গণহত্যার বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। বিচারে গতি বাড়াতে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা একটি থেকে বাড়িয়ে দুটি করা হয়। বর্তমানে এ দুই ট্রাইব্যুনালে চলছে জুলাই গণহত্যা ও আওয়ামী লীগের দেড় দশকের দুঃশাসনের সময় গুম-খুন ও নির্যাতনের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচার।

ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলাগুলোর বিচার কার্যক্রম শ্লথগতিতে এগোচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে। এ বিচার নিয়ে পতিত ফ্যাসিস্ট শক্তির ক্রমাগত অপপ্রচার এবং দেশ-বিদেশি বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের মুখে বিচারের এ মন্থর গতি শহীদ পরিবার ও বিচারপ্রার্থীদের মাঝে উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি করেছে।

এছাড়া প্রায় দুবছরেও শহীদ ওয়াসিম ও মুগ্ধ হত্যার বিচার শুরু না হওয়া, জুলাই বিপ্লবে হত্যাকাণ্ডের অন্যতম স্পট যাত্রাবাড়ী, ফার্মগেট, মিরপুর-১০, উত্তরা, সাভার ও নরসিংদীতে সংঘটিত হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন এখনো দাখিল না হওয়ায় বিচার নিয়ে জনমনে শঙ্কা বেড়েছে। জুলাই বিপ্লবে সারা দেশে হত্যাকাণ্ডসহ বিগত ১৫ বছরের অসংখ্য গুম, নির্যাতন, হত্যা ও ক্রসফায়ারের

বিপুল অভিযোগ জমা পড়েছে ট্রাইব্যুনালে। মানবতাবিরোধী অপরাধের এসব মামলার বিচার ন্যায্য সময়ের মধ্যে নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বৃদ্ধিসহ প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার লজিস্টিক সুবিধা বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, দুই ট্রাইব্যুনালে ১০টি মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। একটি মামলায় যুক্তিতর্ক শুরু হবে। রায়ের অপেক্ষায় আছে তিনটি মামলা এবং চার্জ গঠনে শুনানির জন্য আছে আরো তিনটি মামলা। এছাড়া তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে আরো ৪৫টি মামলা। এ পর্যন্ত দুই ট্রাইব্যুনালে চারটি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে।

গতি নেই গুমের মামলার বিচারেও

বিগত আওয়ামী সরকারের সময় গুমসংক্রান্ত দুটি মামলায় সেনা কর্মকর্তাদের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় চলতি বছরের জানুয়ারিতে। এর মধ্যে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল বা আয়নাঘরে গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও সাবেক ও বর্তমান ১২ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দি নেওয়া হয় ১৯ জানুয়ারি। প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন চট্টগ্রাম-৭ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী। বিচার শুরুর পর দীর্ঘ পাঁচ মাস পেরোলেও এ মামলায় মাত্র ছয় সাক্ষীর জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে।

এদিকে, র‌্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম ও নির্যাতনের মামলায় সাবেক ও বর্তমান ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ আসামির বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচার শুরু হয় গত ২১ জানুয়ারি। এ মামলায় ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমেদ বিন কাশেম আরমান প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন। এ পর্যন্ত তিনিসহ মাত্র পাঁচ সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। এ মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেনÑমানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক শেখ হাসিনা, তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং পুলিশের সাবেক বিতর্কিত আইজিপি বেনজীর আহমেদ।

এছাড়া শতাধিক মানুষকে গুম-খুন ও নির্যাতনের মামলায় বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে বিচার শুর হয় গত ৮ ফেব্রুয়ারি। তার বিরুদ্ধে প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া। প্রায় পাঁচ মাসে এ মামলায় মাত্র পাঁচ সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।

বিচার এত ধীরগতিতে এগোচ্ছে কেনÑজানতে চাইলে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে বেশ কয়েকটি মামলার বিচার চলমান। আমাদের দিক থেকে ধারাবাহিকভাবে মামলার কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছি। গুমের দুই মামলার একটিতে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৭ আসামি এবং আরেক মামলায় আসামি ১৩ জন। এক সাক্ষীর জবানবন্দি নেওয়ার পর প্রত্যেক আসামির আইনজীবী আলাদা করে তাকে জেরা করেন। এজন্য বিচারে সময় বেশি লাগছে। ট্রাইব্যুনালে প্রতিদিন কোনো না কোনো মামলার বিচার চলছে, সাক্ষ্যগ্রহণ হচ্ছে। নতুন মামলা বিচারের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। সময় বেশি লাগাটা বাস্তবতা।

শতাধিক মানুষকে গুমের মামলায় বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের মামলায় এ পর্যন্ত মাত্র পাঁচ সাক্ষীর জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। এ মন্থরগতির বিষয়ে প্রসিকিউটর বলেন, মামলাটি আমাদের কাছে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। আমরা চেষ্টা করছি দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার। অন্যান্য মামলাও ধারাবাহিকভাবে শেষ করব। তবে বিচার আরো দ্রুত করতে চাইলে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানোসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে।

জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলায়ও প্রত্যাশিত গতি নেই

জুলাই বিপ্লবে রাজধানীর রামপুরা ও আশপাশের এলাকায় ২৮ জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিজিবি কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলাম ও মেজর রাফাত বিন আলমসহ চারজনের বিরুদ্ধে বিচার শুর হয় জানুয়ারিতে। প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন শহীদ গঙ্গাচরণ রাজবংশীর ছেলে বিশ্বজিৎ রাজবংশী। এ পর্যন্ত আট সাক্ষীর জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। এ মামলায় শতাধিক সাক্ষীর দীর্ঘ তালিকা রয়েছে। প্রত্যাশিত গতিতে এ মামলাও এগোচ্ছে না বলে শহীদ পরিবার থেকে অভিযোগ উঠেছে।

বিশ্বজিৎ রাজবংশী বলেন, ‘বিচার শুরু হয়েছে জানুয়ারিতে। এতদিনেও বিচারের কোনো কূলকিনারা দেখছি না। আমার বাবার হত্যার বিচারের জন্য আমাদের কত বছর অপেক্ষা করতে হবে, জানি না। ’এদিকে, জুলাই বিপ্লবে ইন্টারনেট বন্ধ করে গণহত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ ও সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের মামলা এবং হাসিনার সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে করা মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শ্লথগতিতে চলছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী পরিবারের। দুটি মামলায়ই যথাক্রমে সাত ও নয় সাক্ষীর জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে।

জুলাই বিপ্লবে বাড্ডা ও আশপাশের এলাকায় ২৩ জনকে হত্যার ঘটনায় সাবেক মন্ত্রী কামরুল ইসলাম ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের বিরুদ্ধে করা মামলায় এক সাক্ষী জবানবন্দি দিয়েছেন। এছাড়া জুলাই বিপ্লবে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ফারহান ফাইয়াজ ও মাহমুদুল রহমান সৈকতসহ ৯ জনকে হত্যার ঘটনায় ঢাকা দক্ষিণ সিটির সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপস এবং সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে করা মামলায়ও এক সাক্ষীর জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে।

বিচারের অপেক্ষায় শহীদ ওয়াসিম ও মুগ্ধের পরিবার

জুলাই বিপ্লবে চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ ওয়াসিম আকরাম। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই শহীদ হন তিনি। এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করা হলে দুই বছরেও বিচার শুরু হয়নি। মামলাটি এখন চার্জ গঠনের শুনানির পর্যায়ে রয়েছে। এ মামলায় সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক এমপি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়।

মামলার বিচারের বিষয়ে জানতে চাইলে শহীদ ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম আমার দেশকে বলেন, আমার ছেলেকে নির্মমভাবে ওরা হত্যা করেছে। ওর মা এখনো স্বাভাবিক হতে পারেনি। দিন-রাত ছেলের জন্য কাঁদে। এখনো বিশ্বাস করতে চায় না ওয়াসিম নেই। প্রতিটি ক্ষণে ওয়াসিমের স্মৃতি হাতড়ে বেড়ায়। ছেলের সব স্মৃতি যেন তার চোখের সামনে ভাসে। আমি বহু বছর বিদেশে ছিলাম, সে এই ছেলেকে বুকে নিয়ে বেঁচেছিল। ওয়াসিম হত্যার দুই বছর হতে চলেছে, আমরা বিচারের অপেক্ষায় আছি। সরকারের কাছে আমার আবেদন, ছেলের খুনিদের যেন বিচার হয়। খুনিরা যেন কোনোভাবেই রেহাই না পায়।

এদিকে, জুলাই বিপ্লবে রাজধানীর উত্তরায় শহীদ হন মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই আন্দোলনকারীদের মাঝে পানি-বিস্কুট বিতরণের সময় মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন তিনি। সে সময় তার ‘পানি লাগবে পানি’ কথাটি দেশের মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়কে নাড়া দিয়েছিল। জুলাই বিপ্লবে উত্তরায় দুই শতাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়। মীর মুগ্ধ হত্যায় করা মামলাটি ট্রাইব্যুনালে এখনো চার্জ গঠনের শুনানির পর্যায়ে রয়েছে। এ মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ২৬ জনকে আসামি করা হয়।

বিচারের অগ্রগতি নিয়ে কথা হয় মীর মুগ্ধের পরিবারে সঙ্গে। মুগ্ধের বড় ভাই মীর মাহমুদুর রহমান দীপ্ত বলেন, আমরা ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দাখিলের সময় মামলার যাবতীয় প্রমাণ, যেমন হত্যার ভিডিও ফুটেজ, আসামিদের অবস্থানসহ সব ডকুমেন্ট জমা দিয়েছি। আমার ভেবেছিলাম দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচার শুরু হবে। কিন্তু প্রায় দুই বছর হতে চলল, এখনো বিচার শুরু হয়নি। এটা খুবই দুঃখজনক। আমার ভাইয়ের খুনিদের বিচারের জন্য আমরাসহ দেশবাসী অপেক্ষায় আছে।

বিচার শুরু হয়নি ১১ হেভিওয়েট নেতার

জুলাই বিপ্লবের পর বিভিন্ন সময় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ১১ গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয় । কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাদের বিচার শুরু হয়নি । মামলাগুলো এখনো তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে। এসব নেতার মধ্যে আছেনÑসাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমু, শাজাহান খান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) ফারুক খান, আব্দুর রাজ্জাক, কামাল আহমেদ মজুমদার, গোলাম দস্তগীর গাজী এবং ডা. দীপু মনি। আরো আছেনÑহাসিনার উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, সাবেক বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব জাহাঙ্গীর আলম এবং সাবেক এমপি সোলায়মান সেলিম।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, আমাদের কাছে কোনো হেভিওয়েট নেই। সব আসামিকেই আমরা আসামি মনে করি। পর্যায়ক্রমে সবার বিচার হবে। আমাদের তদন্ত সংস্থা দিন-রাত পরিশ্রম করছে। তদন্ত শেষ হলে তারা আসামিদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দেবে। এরপর বিচার শুরুর পর্যায়ে যাবে।

মামলার তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা

জুলাই বিপ্লবে হত্যাকাণ্ডের অন্যতম স্পট ছিল রাজধানীর যাত্রাবাড়ী। ওই স্থানে নির্বিচারে ছাত্র-জনতার ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। কেবল ৫ আগস্ট ৫২ জনকে হত্যার তথ্য উঠে এসেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে। যাত্রাবাড়ীতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ট্রাইব্যুনালে কেবল একটি হত্যা মামলার বিচার চলছে। তা হলো পুলিশ কর্মকর্তার ছেলে ইমাম হাসান তায়িম হত্যা মামলা। এছাড়া অপর মামলাগুলোর তদন্ত প্রতিবেদন এখনো দাখিল হয়নি।

একই ভাবে মিরপুর-১০-এ ছাত্র-জনতার ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। এতে অসংখ্য ছাত্র-জনতা শহীদ হন। সাভারের এপিসি থেকে ফেলে শিক্ষার্থী আশহাবুল ইয়ামিনসহ ২২ জনকে হত্যা, নরসিংদীতে শিক্ষার্থী তাহমিদ অমিত ও ইমন মিয়া হত্যা এবং গাজীপুর হৃদয় হোসেন হত্যাসহ বেশ কয়েকটি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন এখনো দাখিল হয়নি। দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও আলোচিত এসব মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল না হওয়ায় শহীদ পরিবারসহ বিচারপ্রার্থীদের মাঝে বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কা্ তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শাপলা চত্বরে হেফাজতের ওপর গণহত্যার মামলাসহ বর্তমানে ৪৫টি মামলার তদন্ত করছে তদন্ত সংস্থা। ২৪ কর্মকর্তা এসব মামলার তদন্ত করছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, এত বিপুলসংখ্যক মামলার তদন্ত করতে আরো লোকবলসহ লজিস্টিক সাপোর্ট প্রয়োজন। না হলে বিচার বিলম্বিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ট্রাইব্যুনাল বাড়ানোর দাবি

জুলাই বিপ্লবে সারা দেশে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। এক হাজার ৪০০ মানুষকে হত্যা করা হয় এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষ গুরুতর আহত হন। অনেকে চিরতরে পঙ্গুত্ববরণ করেন। ওই সব ঘটনায় সারা দেশের অসংখ্য মামলার বিচার ন্যায্য সময়ে ত্বরান্বিত করতে আন্তর্জাতিক অপরাপ ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা আরো বাড়ানোসহ প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন বিচারপ্রার্থীসহ সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জুলাই বিপ্লবের শীর্ষনেতা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম আমার দেশকে বলেন, জুলাই বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তী সরকারকে সংস্কার, বিচার ও নির্বাচনÑএ তিনটি দায়িত্ব দিয়ে ক্ষমতায় বসায় এ দেশের জনগণ। তারা ন‍্যূনতম সংস্কার আর ন‍্যূনতম বিচারের চেষ্টা করেই নির্বাচন দিয়ে দিল। কিন্তু নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীনরা সংস্কার বাতিল করে দিল, বিচারে সর্বোচ্চ উদাসীনতা প্রকাশ করল। এ উদাসীনতাকে ব‍্যবহার করছে পরাজিত গোষ্ঠী। সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে জুলাই গণহত্যাসহ ফ‍্যাসিবাদীদের দ্বারা সংঘটিত সব হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অসংখ্য মামলা রয়েছে, এজন্য ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছি। পাশাপাশি বিচার নিশ্চিতে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তা বাড়ানোর আবেদন জানাচ্ছি।

ডিজিএফআইয়ের আয়নাঘরে গুম ও নির্যাতনের শিকার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) হাসিনুর রহমান বলেন, আমি গুমের মামলায় ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছি। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের কাছে খরব নিয়ে জানতে পেরেছি, আমার মামলায় গত প্রায় ছয় মাসে মাত্র পাঁচ সাক্ষীর জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। মামলার বিচার অত্যন্ত মন্থর গতিতে এগোচ্ছে। আমি সরকারের কাছে আবেদন জানাব, একটি ন্যায্য সময়ের মধ্যে বিচারের বিষয়ে যেন মনোযোগ দেয়। এজন্য ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি। তদন্ত সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানোও খুবই জরুরি। দক্ষ লোকবল না হলে অনেক সেনসেটিভ জায়গায় তারা ভালোভাবে কাজ করতে পারে না। পাশাপাশি তাদের লজিস্টিক সুবিধা বাড়ানোও জরুরি। না হলে বিচার শেষ করতে বহু বছর লেগে যাবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন