আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

খালেকুজ্জামানের চাকরিজীবন

মাহবুবুল আলম মাসুদ

খালেকুজ্জামানের চাকরিজীবন

এবার অগ্রহায়ণের শুরুতেই শীত জাঁকিয়ে বসেছে। যেন পৌষের শীত নেমে এসেছে। উত্তুরে কনকনে হাওয়া বইছে। রাস্তাঘাট ফাঁকা; বেশিরভাগ দোকান ক্রেতাশূন্য। সন্ধ্যারাতের শহরকে মনে হচ্ছে মাঝরাতের শহর।

খালেকুজ্জামান ফুটপাতে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকা একটা কুকুরকে পাশ কাটিয়ে গৌরহরী বস্ত্রালয়ে ঢুকে পড়ল। ফোনে বলাই ছিল। বহু দিনের পরিচিত দোকান। দোকানে সময় নষ্ট করল না। প্যাকেটটা নিয়েই দোকান থেকে বের হয়ে আবার ফুটপাত ধরে হাঁটতে শুরু করল।

বিজ্ঞাপন

গন্তব্য এখন হোটেল আল ফালাহ। আজ সকালে ঢাকা থেকে এমডি স্যার এসেছেন। আগামীকাল টাঙ্গাইলে একটা মিটিং করে ওদিক দিয়েই ঢাকা চলে যাবেন। সকাল থেকে স্যারের লেজ হয়ে ঘুরছে খালেকুজ্জামান। সারাটা দিনে স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস ফেলারও সুযোগ পায়নি। রাতটাও স্যারের পাশের রুমেই কাটাতে হবে—কখন কোন দরকার পড়ে যায়।

কী যে এক চাকরি কপালে জুটল! এই শীতে কোথায় লেপের নিচে শুয়ে একটু ওম নেবে—আর তাকে কিনা এই কনকনে হাওয়ায় হাঁটতে হচ্ছে ফুটপাতে। পদের বাহারটা অবশ্য ভালোই—অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট। হলে কী হবে? কাজ তো ওই কাগজ বিক্রিই। লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পলিসি সেল করা আর কাগজ বেচা তো একই কথা। কত কী যে বলতে হয়, কত কী যে করতে হয় এই পলিসি সেল করতে—কখনো হাতিকে ব্যাঙ বানাতে হয়, আবার ব্যাঙকে হাতি।

বছর পাঁচেক আগের ঘটনা। কোম্পানির এমডি তখন আশফাক খান।

একদিন ঠিক কাঁটায় কাঁটায় দশটায় খালেকুজ্জামানের মোবাইল বেজে উঠল। এমডি স্যারের ফোন। খালেকুজ্জামান তখন খাওয়াদাওয়া সেরে বিছানায় চিত হয়ে সিগারেটে একটা টান দিয়েছে মাত্র। ধীরে-সুস্থে অফিসে যাবে। অফিসে তো সে-ই বস। কিন্তু ফোন পেয়ে তিড়িং করে বিছানায় উঠে বসল।

ওপাশ থেকে এমডি স্যার—খালেকুজ্জামান তুমি কোথায়?

খালেকুজ্জামানের সিক্সথ সেন্স বলল, এমডি স্যার তার অফিসে উঠেই ফোনটা করেছেন। বাঁচতে হবে। উপায়ও বের করে ফেলল সঙ্গে সঙ্গেই; বলল, স্যার আমি তো ফুলপুর অফিসে রওনা হয়ে গেছি।

এমডি স্যার বললেন, ফুলপুর যাওয়ার দরকার নেই। আমি তোমার অফিসে। অফিসে আসো।

খালেকুজ্জামান সিগারেট ছুড়ে ফেলে সঙ্গে সঙ্গে পা দুটো ঢুকিয়ে দিল প্যান্টের ভেতরে। তারপর দ্রুত অফিসে রওনা হয়ে গেল।

এই করে করে কায়দাকানুন ভালোই শিখে ফেলল খালেকুজ্জামান। অত ভয়ডর আর নেই। হাওয়া বুঝে দাওয়া।

একদিন এই আশফাক খানেরই একটা ফোন এলো ঢাকা থেকে—খালেকুজ্জামান, তুমি নাকি মাঠকর্মীদের কমিশন ঠিকমতো দিচ্ছ না?

: জি স্যার।

: কী! আবার বলছ, জি স্যার! এত সাহস তোমার!

: আপনি সদা সত্য বলতে বলেছেন, তাই সত্য বলছি, স্যার।

: তা তো বলবেই। কিন্তু কমিশনের টাকা মেরে দিয়েছ কেন?

: কী করব স্যার? আমাকে তো নানা জায়গায় টাকাপয়সা খরচ করতে হয়। এখান থেকে না নিলে কোথায় পাব স্যার? চাকরি করতে এসে তো আর বাড়ির জমিজমা বিক্রি করতে পারি না।

: কেন, তোমাকে টাকাপয়সা খরচ করতে হবে কেন?

: আপনার ড্রাইভার-পিয়নকে একটু জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন, স্যার, ঈদ উপলক্ষে গত সপ্তাহে তাদের কত দিয়ে এসেছি। এ রকম ব্যয় যে কত জায়গায় হয়, তা তো আপনিও কিছুটা জানেন, স্যার।

‘আচ্ছা, ঠিক আছে, ঠিক আছে’ বলে ফোন রেখে দিয়েছিলেন আশফাক খান।

এই এমডি স্যারের ভাবগতিক এখনো পুরোপুরি ধরতে পারেনি খালেকুজ্জামান। অবশ্য সময়ও বেশি হয়নি। বছর পূর্ণ হয়নি স্যার কোম্পানিতে যোগ দিয়েছেন। আট-নয় মাস হলো। এই অঞ্চলে এটাই তার প্রথম সফর।

লিফটে হোটেল আল ফালাহ’র আটতলায় উঠে গেল খালেকুজ্জামান। দরজা খোলাই ছিল। এমডি স্যার দেখেই ডাকলেন—আসো খালেকুজ্জামান, আসো, বসো।

খালেকুজ্জামান রুমে ঢুকল, কিন্তু বসল না। স্যার দাঁড়িয়ে আছেন, সে বসে কী করে?

এমডি স্যার আবার বললেন, বসো, দাঁড়িয়ে আছ কেন?

: স্যার, আপনি বসুন।

: আরে, আমি দাঁড়িয়ে আছি কোমরের ব্যথায়। তুমি বসো।

খালেকুজ্জামান বসল, কিন্তু সহজ হতে পারল না।

এমডি স্যার বললেন, টার্গেট ফিলআপ করতে পারবে তো?

: ইনশাআল্লাহ পারব স্যার।

: টার্গেট ফিলআপ না হলে কিন্তু প্রমোশন হবে না।

: টার্গেটের বেশিই প্রিমিয়াম দেব ইনশাআল্লাহ, স্যার। প্রমোশনটা এবার দিয়েন স্যার।

: সময় কিন্তু বেশি নেই। জানুয়ারিতেই ক্লোজ করে দেব।

: সমস্যা নেই, স্যার। সব সময়মতোই হবে।

: তোমার হাতে কী?

: স্যার, আপনার জন্য একটা ব্লেজারের কাপড়।

: খোলো তো দেখি। বলে বসলেন এমডি স্যার।

খালেক প্যাকেট খুলল।

এমডি স্যার দেখেই আঁতকে উঠলেন, এটা কী কিনেছ?

: কেন স্যার? ভালো কাপড়।

: আরে কাপড়ের ভালো-মন্দ তো পরে। এটা একটা কালার হলো! এটা কী কালার?

: মেরুন কালার স্যার। আপনি বলেছিলেন মেরুন কালার আপনার পছন্দ।

: এটা মেরুন কালার! এটা তো লাল। রঙও চেন না। তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না।

খালেকুজ্জামান চুপসে গেল। সে আসলেই লাল-মেরুনের পার্থক্য বোঝে না। গৌরহরী তাকে ডুবিয়েছে। এত বিশ্বাস করা বোধহয় ঠিক হয়নি। কিন্তু বিশ্বাস না করেও তো উপায় নেই। সে তো এসব বোঝে না। বলল, স্যার, আমি এক্ষুনি এটা চেঞ্জ করে নিয়ে আসছি।

: কত দিয়ে কিনেছ?

: পাঁচ হাজার আটশ, স্যার।

: দাম তো কম নয়। কাপড় তো তেমন ভালো মনে হচ্ছে না। এক কাজ করো। তুমি আমাকে ক্যাশ দিয়ে দাও। আমি ঢাকা থেকে কিনে নেব।

: আচ্ছা স্যার।

খালেকুজ্জামান গুনে গুনে ছয় হাজার টাকা স্যারকে দিয়ে দিল। দুইশ কম তো আর দেওয়া যায় না।

: মেকিং চার্জ দেবে না?

: নিশ্চয়ই স্যার।

খালেকুজ্জামান আবার পকেটে হাত দিল। পকেট সত্যি শূন্য। পাঁচশ টাকার একটা নোট আছে মাত্র। সে বিব্রত ভঙ্গিতে নোটটা হাতে নিয়ে বসে রইল।

এমডি স্যার ব্যাপারটা বুঝলেন। বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে, পরে পাঠিয়ে দিও।

খালেকের বিব্রত ভঙ্গি তাতেও কাটল না।

এমডি স্যার বললেন, বাসায় চলে যাও খালেকুজ্জামান। খুব শীত পড়ে গেছে।

: কেন স্যার, পাশের রুম বুকিং দেওয়া আছে তো। আমি থাকি। আপনার কখন কী লাগে।

: না, না, তোমাকে আর কষ্ট করতে হবে না। সারা দিন অনেক কষ্ট করেছ।

: কষ্ট কী স্যার! এ তো আমার ভাগ্য। সারা দিন আপনার সঙ্গে কাটাতে পারলাম।

: না, না, বাসায় চলে যাও।

খালেকুজ্জামান উঠে দাঁড়াল।

লিফটে সুড়ুৎ করে নিচে নেমেই সে একটা সিগারেট ধরাল। সিগারেটে দুটো টান দিয়েও আওলা মাথাটা ঠিক হলো না তার। গৌরহরীর গৌরাকে কষে একটা গাল দিয়েও সাধ মিটল না। শেষে নিজেকেই একটা গাল দিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করল, কেন যে সাড়ে চার হাজার টাকার কাপড়টার দাম পাঁচ হাজার আটশ বলতে গেলাম? সব নষ্টের মূল ওই গৌরা শালা! রঙের প্যাঁচটা না লাগলে তো আর দামের প্যাঁচটা লাগত না।

খালেকুজ্জামান দ্রুত হাঁটতে শুরু করল। গৌরাকে এখনই ধরতে হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...