বিশ্বের বৃহত্তম ডিজিটাল ক্যামেরা

আশিকুর রহমান তালহা

বিশ্বের বৃহত্তম ডিজিটাল ক্যামেরা

বর্তমান সময়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এক অবিশ্বাস্য মাইলফলক স্পর্শ করেছে মানবজাতি। বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী ডিজিটাল ক্যামেরা মহাকাশ বিজ্ঞানে এক নতুন যুগের সূচনা করতে যাচ্ছে। চিলির ‘Vera C. Rubin Observatory’-তে স্থাপিত অত্যন্ত হাই রেজল্যুশন সক্ষমতার এই ৩,২০০ মেগাপিক্সেল ক্যামেরাটি মহাবিশ্বের অজানা, রহস্যময় অঞ্চলগুলো পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আমাদের জ্ঞানকে নিয়ে যাবে এক নতুন মাত্রায়। ভেরা সি. রুবিন মানমন্দিরটি অবস্থিত দক্ষিণ আমেরিকার চিলির উত্তরাঞ্চলের ‘সেরো পাচোন’ পর্বতশৃঙ্গে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উঁচুতে এবং মেঘমুক্ত আকাশে মহাবিশ্বের স্পষ্ট ছবি তোলার জন্য এই স্থানটি নির্বাচন করা হয়েছে। এখানে ২০২৩-২৪ সালের শেষদিকে বসানো হয় এই গিগাপিক্সেল ক্যামেরা, যার কার্যক্রম ২০২৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। এই দানবীয় ক্যামেরাটি যুক্তরাষ্ট্রের ‘SLAC National Accelerator Laboratory’ (স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির অংশ) কর্তৃক নির্মিত এবং এটি তৈরি করা হয়েছে বিশাল LSST (Legacy Survey of Space and Time) প্রকল্পের জন্য। মহাজাগতিক এই প্রকল্পের পেছনে জড়িয়ে রয়েছে বিপুল শ্রম ও অর্থ। LSST প্রকল্পের মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৫ সাল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের প্রায় এক দশকের যৌথ প্রচেষ্টায় এই উচ্চ প্রযুক্তি গড়ে উঠেছে। এটি শুধু আকারেই নয় (ওজন প্রায় ৩ টন এবং একটি ছোটখাটো গাড়ির সমান), বরং ক্যামেরাটির প্রযুক্তিও অত্যন্ত অভাবনীয় এবং উচ্চ মানের। এতে রয়েছে ২০১টি কাস্টম-ডিজাইন করা CCD সেন্সর, যা মিলে গঠিত হয়েছে একটি অতিসূক্ষ্ম ফোকাল প্লেন। এই সেন্সরগুলো মাত্র ৫ মাইক্রন পর্যন্ত সমতল, যা একটি মানুষের চুলের প্রস্থের দশমাংশেরও কম! (তুলনায়, একটি সাধারণ কাগজের পুরুত্ব প্রায় ৫০ থেকে ১০০ মাইক্রন)। এই উচ্চপ্রযুক্তির ক্যামেরাটি সংরক্ষণ করা হয়েছে বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রিত-১০০° ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার কক্ষে, যাতে একেবারে ধুলামুক্ত পরিবেশে এর কার্যক্ষমতা ও স্থায়িত্ব কার্যকরভাবে বজায় থাকে। এর সামনের লেন্সটির ব্যাস প্রায় ৫ ফুট, যা এ ধরনের কাজের জন্য তৈরি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ লেন্স।

এর রেজল্যুশন এতটাই নিখুঁত যে প্রায় ২৪ কিলোমিটার দূর থেকে একটি গলফ বলের স্পষ্ট ছবি তোলা সম্ভব! বিজ্ঞানীদের মতে, এই সুবিশাল মহাবিশ্বের বিস্তৃতি হতে পারে প্রায় ৯৩ বিলিয়ন লাইট ইয়ার (আলোকবর্ষ) বা তারও বেশি। যার আবার প্রায় ৯৫ শতাংশ অংশ গঠিত রহস্যময় ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি দিয়েÑযেগুলোর প্রকৃতি এখনো মানুষের কাছে সম্পূর্ণ অজানা। এই অজানাকে জানার পথকে সুগম করবে LSST ক্যামেরার তোলা ছবি ও তথ্য। এই ক্যামেরা শুধু সুদূর গ্যালাক্সি নয়, বরং নিকটবর্তী গ্রহাণু, সুপারনোভা (তারার বিস্ফোরণ) এবং দ্রুত গতিসম্পন্ন মহাজাগতিক বস্তু শনাক্তেও ব্যবহৃত হবে, যা পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। ক্যামেরাটি প্রতি রাতে প্রায় ১৫ টেরাবাইট (TB) ডেটা বা ছবি সংগ্রহ করবে। এই বিপুল পরিমাণ ডেটা প্রসেস, বিশ্লেষণ এবং সংরক্ষণ করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বিশ্বের অত্যাধুনিক সুপারকম্পিউটার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তি।

বিজ্ঞাপন

এই ডিজিটাল ক্যামেরাটি এক বিশাল মহাজাগতিক ইতিহাসের পাতা। এর নিখুঁত লেন্স দিয়ে আগামী দিনগুলোয় অনবরত রাতের আকাশের ছবি তোলা হবে, যা দিয়ে তৈরি হবে মহাবিশ্বের প্রথম ত্রিমাত্রিক (3D) মানচিত্র। যার মাধ্যমে অদূর ভবিষ্যতে মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তার অজানা রহস্যগুলো মানুষের সামনে তুলে ধরা যাবে খুব সহজেই। আরো গভীরভাবে এসব স্রষ্টার সৃষ্টি নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা, জ্ঞানার্জন, নতুন করে জ্ঞানের দরজা উন্মোচন করতে পারবেন বিজ্ঞানীরা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন