ইন্টারপোলের সহায়তায় দুর্নীতিসহ একাধিক মামলায় অভিযুক্ত পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
রোববার (১৪ জুন) জাতীয় সংসদে বেনজীর আহমদকে গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দিয়ে এসব কথা বলেন তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে পলাতক একসময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা সম্বন্ধে ভয়াবহ সব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। হাসিনার গুম-খুনের অন্যতম সহযোগী সাবেক আইজিপি বেনজির আগাগোড়াই ছিলো আক্রমণাত্মক। আওয়ামী ফ্যাসিবাদেরে অন্যতম হাতিয়ার সাবেক এই কর্মকর্তা সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে উঠেছিলেন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নে (র্যাব) মহাপরিচালক পদে দায়িত্ব পালনের সময়। সেসময় গুম-খুনে জড়িত র্যাবের কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করতেন। তৎকালীন সময়ে র্যাবে কর্মরত গুম-খুনে পারদর্শী কর্মকর্তাদের বেনজির অত্যন্ত কর্মদক্ষ ও উচ্চমানের নেতৃত্ব রয়েছে উৎসাহিত করতেন। এতে করে ওই কর্মকর্তারা মানুষ হত্যায় আরো বেশি করে আগ্রহী হয়ে উঠতেন।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গুম কমিশনের দ্বিতীয় অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদনের ৬ষ্ঠ অধ্যায়ে এমন তথ্য তুলে ধরা হয়। গত বছরের (২০২৫ সাল) জুন মাসে এ অধ্যায়টি গণমাধ্যমের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এর আগে ওই বছরের ৪ জুন প্রতিবেদনটি সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে হস্তান্তর করে গুম কমিশন। বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ব্রিগেডিয়ার হিসেবে কর্মরত থাকা এক কর্মকর্তার বিষয়ে র্যাবের ডিজি থাকা অবস্থায় বেনজির বলেছিলেন, ‘কর্মদক্ষতা খুবই সন্তোষজনক’ এবং ‘নেতৃত্ব উচ্চমানের’।
‘প্রশ্রয়মূলক প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি’ শিরোনামের এ অধ্যায়ে বলা হয়, গুমের ঘটনাগুলোর প্রকৃতি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে, এগুলো একক ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন কাজ ছিল না। বরং প্রতিটি ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ইউনিটের একাধিক সদস্যের অংশগ্রহণ ছিল, যা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অজান্তে হওয়া প্রায় অসম্ভব। এসব ইউনিটে গোয়েন্দা সংস্থার নিজস্ব সদস্যরা নিয়মিতভাবে নিযুক্ত থাকতেন, যাদের নির্দিষ্ট দায়িত্ব ছিল সহকর্মীদের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করে ঊর্ধ্বতনদের কাছে প্রতিবেদন দেওয়া। তা সত্ত্বেও যদিও সংশ্লিষ্ট সময়কালে অপরাধের মাত্রা ছিল ব্যাপক ও বহুলচর্চিত, পর্যালোচনা করা কোনো ফাইলেই ‘গুম’ শব্দটি উল্লেখ পর্যন্ত করা হয়নি। মনে হয় যেন এই সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তারা কখনো এমন কোনো অপরাধে জড়িতই হননি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় গুমে জড়িত কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করতেন বেনজীর আহমেদ। উদাহরণস্বরূপ তৎকালীন র্যাবে দায়িত্বরত এক কর্মকর্তার বিষয়ে প্রতিবেদনে বিশেষভাবে প্রশংসা করে বেনজীর লিখেন, তিনি ‘স্ব-উদ্যোগে’, ‘চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে’, ‘ইসলামি জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসী, চোরাচালান এবং মাদকের সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেটের’ বিরুদ্ধে অনুসন্ধান পরিচালনা করেন। প্রতিবেদনে আরো জোর দিয়ে বলা হয়, ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ‘কোনো নেতিবাচক তথ্য পাওয়া যায়নি’।
এ অধ্যায়ে বলা হয়, বাংলাদেশে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কিছু নয় বা কেবল কয়েকজন কর্মকর্তার দায়িত্বহীনতার ফল নয়। বরং এটি একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ফল, যেখানে এসব অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে, স্বাভাবিক করে তোলা হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে পুরস্কৃতও করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক উভয় পক্ষই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ৫ আগস্ট ২০২৪-এ সরকার পরিবর্তনের পরও এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি বহাল আছে এবং পূর্ববর্তী কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে আগের মতোই কাজ করছে।
গুম কমিশনের প্রকাশ করা ৬ষ্ঠ অধ্যায়ে শেখ হাসিনার শাসনামলে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থী, তরুণসহ বিভিন্ন বয়সি নাগরিকদের গুম করে রাখার বর্ণনা তুলে ধরা হয়। ভাগ্যক্রমে যারা প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন; তাদের সঙ্গে কথা বলে তাদের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। ডিজিএফআই, র্যাব ও সিটিটিসির গোপন আস্তানায় যাদের অন্তরীণ রাখা হয়; তুলে ধরা হয় সেসব নির্যাতিতদের বক্তব্যও। মানবতাবিরোধী এসব গোপন নির্যাতনের অন্ধকার কক্ষগুলোতে দায়িত্ব পালন করা বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও অধস্তনদের সঙ্গেও কথা বলেছে। যারা কমিশনের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাদের একটি অংশ ইচ্ছার বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
দুবাইয়ে গ্রেপ্তার বেনজির
বিএনপি সরকার গঠনের পর জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে রোববার (১৪ জুন) সংসদে দেওয়া বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ জানান, গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডাইরেক্টরেট জেনারেল অফ ফেডারেল ক্রিমিনাল পুলিশ ও ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আবুধাবি থেকে পাঠানো একটি ইমেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে এই গ্রেপ্তারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। তিনি বর্তমানে সেখানে পুলিশি হেফাজতে আটক আছেন।
বেনজির আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তারের ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ (এক্সট্রাডিশন) আবেদন করতে হবে। সরকার ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত কার্যক্রম শুরু করেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দুদকের মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও তদন্ত সংক্রান্ত দলিলাদি প্রস্তুত করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক্সট্রাডিশন প্রপোজাল অনুমোদন করেছে এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তা ইউএই কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হচ্ছে। এনসিবি আবুধাবির সাথে সমন্বয় করে অতিদ্রুতই তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হবে।
অভিযোগের বিষয়ে মন্ত্রী জানান, বেনজির আহমেদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারা এবং বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার ১৯৭৩-এর ১১ ধারায় মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বেনজির আহমেদকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) ঢাকা ইন্টারপোলের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করেছে। যার প্রেক্ষিতে গত ১১ এপ্রিল ২০২৫ ইন্টারপোল রেড নোটিশ জারি করে।
এটিকে বাংলাদেশ পুলিশের একটি ‘ঐতিহাসিক সাফল্য’ হিসেবে অভিহিত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এর মাধ্যমে আমরা বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হব। এই ঘটনা প্রমাণ করে, অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। এটি দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।
এএস
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


