ভ্যাপসা গরমে হাঁসফাঁস, স্বস্তি মিলবে কবে

সরদার আনিছ

ভ্যাপসা গরমে হাঁসফাঁস, স্বস্তি মিলবে কবে
ছবি: সংগৃহীত

দেশজুড়ে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমে জেঁকে বসেছে তীব্র ভ্যাপসা গরম। থার্মোমিটারে তাপমাত্রা যতটা দেখাচ্ছে, বাস্তবে গরম অনুভূত হচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশি। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বাতাসে জলীয় বাষ্প বা আর্দ্রতার আধিক্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় আবহাওয়া তার স্বাভাবিক তাপমাত্রা শোষণের ক্ষমতা হারিয়েছে। ফলে শরীর থেকে ঘাম বের হলেও তা শুকাচ্ছে না, আর তাতেই তৈরি হয়েছে দমবন্ধ পরিস্থিতি।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীতে বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছিল আবহাওয়া অধিদপ্তর। তবে বাস্তবে কোনো বৃষ্টি হয়নি। এতে সকাল থেকেই রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশে জ্যৈষ্ঠের খরতাপ যেন আরো তীব্র হয়ে ওঠে। সকাল ৭টায় রাজধানীর আকাশে আর্দ্রতার পরিমাণ ছিল ৮৯ শতাংশ।

আবহাওয়া অফিস জানায়, সকাল ৭টা থেকে পরবর্তী ছয় ঘণ্টায় আকাশ আংশিক মেঘলা থেকে অস্থায়ীভাবে মেঘলা থাকতে পারে। একই সঙ্গে অস্থায়ীভাবে বৃষ্টি কিংবা বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে। দক্ষিণ-দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে ঘণ্টায় ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার বেগে বাতাস প্রবাহিত হতে পারে। এছাড়া উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া বয়ে যেতে পারে।

তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবহাওয়া পরিস্থিতি আরো গরম হয়ে ওঠায় বৃষ্টির সম্ভাবনা অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে পড়ে।

এ প্রসঙ্গে আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন নেসা বলেন, বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্যের কারণেই এ ধরনের ভ্যাপসা গরম অনুভূত হচ্ছে। শুক্রবার রাজধানীতে বৃষ্টি হলেও তা খুব বেশি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে এ ধরনের গরম আরো কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে।

বৃষ্টির পরও কেন গরম অনুভূত হচ্ছে—এ প্রশ্নের জবাবে আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবির আমার দেশকে বলেন, বৃষ্টির পরিমাণ কম হলে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে যায়। এতে গরম আরো বেশি অনুভূত হয়, কারণ ঘাম সহজে শুকাতে পারে না। রাজধানীসহ সারা দেশে গরম কমার সম্ভাবনাও আপাতত দেখা যাচ্ছে না।

এর আগে বুধবার রাজধানীতে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। আগের দিনের তুলনায় তাপমাত্রা ২ দশমিক ২ ডিগ্রি কমে বৃহস্পতিবার ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হলেও ভ্যাপসা গরমের তীব্রতা কমেনি। গত বুধবার তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত চার থেকে পাঁচ দিন ধরে রাজধানীতে প্রচণ্ড গরম বিরাজ করছে। একই সঙ্গে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় দেশের অধিকাংশ এলাকাতেই ভ্যাপসা গরম বেড়েছে।

দেশের কোথাও তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তাকে মৃদু তাপপ্রবাহ বলা হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও যশোর জেলার ওপর দিয়ে তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। আগের দিন ১০ জেলার ওপর দিয়ে এই তাপপ্রবাহ প্রবাহিত হয়েছিল। এদিন খুলনার কয়রায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে ভারী বৃষ্টি হলেও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কম ছিল। ফলে ভ্যাপসা গরম আরো তীব্র আকার ধারণ করেছে।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী পাঁচ দিনের পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে, দেশের তিনটি বিভাগে মাঝারি ধরনের ভারী থেকে ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে কিছু অঞ্চলের ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় কুড়িগ্রামের রাজারহাটে সর্বোচ্চ ১০৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া নীলফামারীর সৈয়দপুরে ৯৯, দিনাজপুরে ৯৮, রংপুরে ৬২, পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ৫০ এবং নওগাঁর বদলগাছীতে ৪৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

কেন এত ভ্যাপসা গরম?

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, আর্দ্রতা ৮০ শতাংশের বেশি হলেই বাতাসের তাপ শোষণ ক্ষমতা কমে যায় এবং ভ্যাপসা গরম দেখা দেয়। বর্তমানে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ ৮০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত ওঠানামা করছে।

আর্দ্রতা বেড়ে গেলে বাতাস নতুন করে তাপ বা জলীয় বাষ্প সহজে শোষণ করতে পারে না। ফলে চারপাশের বায়ুমণ্ডল গরম চাদরের মতো শরীরকে ঘিরে রাখে। মানবশরীর সাধারণত ঘাম বাষ্পীভবনের মাধ্যমে নিজেকে ঠান্ডা রাখে। কিন্তু বাতাসে জলীয় বাষ্প বেশি থাকায় ঘাম বাতাসে মিশতে পারে না। ফলে দীর্ঘক্ষণ শরীর ভেজা থাকে এবং অস্বস্তি বহুগুণ বেড়ে যায়।

এ অবস্থায় থার্মোমিটারে তাপমাত্রা ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস দেখালেও আর্দ্রতার কারণে তা শরীরে ৪২ থেকে ৪৪ ডিগ্রির মতো অনুভূত হচ্ছে।

এই তীব্র ভ্যাপসা গরমে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষ। রাস্তায় বের হলেই অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন পথচারীরা। চিকিৎসকেরা বলছেন, এ ধরনের আবহাওয়ায় হিট স্ট্রোক ও পানিশূন্যতার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।

চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, তৃষ্ণা না পেলেও দিনে অন্তত ৩ থেকে ৪ লিটার নিরাপদ পানি বা খাবার স্যালাইন পান করতে হবে। বাইরে বের হলে হালকা রঙের ঢিলেঢালা সুতি পোশাক পরা উচিত। বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে ছাতা ও সানগ্লাস ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি সহজে হজম হয় এমন তরল খাবার গ্রহণ এবং বাসি বা খোলা খাবার পরিহার করতে বলা হয়েছে।

আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, ভারী বৃষ্টিপাত না হওয়া পর্যন্ত বাতাসের এই আর্দ্রতা কমার সম্ভাবনা নেই। ফলে আরো কয়েকদিন ভ্যাপসা গরমের অস্বস্তি অব্যাহত থাকতে পারে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন