পৃথিবীর গতানুগতিক অন্যান্য অর্থব্যবস্থায় অক্ষম লোকদের জন্য সম্পদের যে অংশ রয়েছে, তা কেবলই বিত্তশালীদের করুণা। বিত্তশালীরা ইচ্ছা করলে দুর্বলদের দেবে, ইচ্ছা না করলে দেবে না। কিন্তু ইসলামই একমাত্র অর্থব্যবস্থা, যেখানে অক্ষমতার দরুন উৎপাদনে সম্পৃক্ত হতে না পারা দুর্বল ও দরিদ্রদের হাতে সম্পদের একটি অংশ বাধ্যতামূলকভাবে যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তা-ই জাকাত। জাকাত ফরজ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ধনীরা গরিবদের প্রতি এক ধরনের ঋণী হয়ে যায়। ঋণের ক্ষেত্রে তার পাওনাদার খুঁজে বের করে অথবা তার বাড়িতে গিয়ে দিয়ে আসা তার কর্তব্য; তা দিয়ে না আসা পর্যন্ত যেমন সে দায়মুক্ত হয় না, তেমনি জাকাতদাতাও এর হকদারের কাছে ঋণী। জাকাতের হকদারকে খুঁজে বের করে তাদের হাতে তা পৌঁছে না দেওয়া পর্যন্ত সে দায়মুক্ত নয়। জাকাত ইসলামি অর্থব্যবস্থার মেরুদণ্ড; গরিব-ধনীর সেতুবন্ধ।
বাংলাদেশের বিত্তশালী মুসলিমরা জাকাত দেন। কিন্তু এর প্রাতিষ্ঠানিক ও সরকারি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না থাকায় দারিদ্র্য বিমোচনে তেমন ফলপ্রসূ ভূমিকা থাকছে না। উল্টো জাকাত আনতে গিয়ে দুর্ঘটনায় স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় তিন শতাধিক মানুষ মারা গেছেন। সুষ্ঠু সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় জাকাত হতে পারে দ্রুততম সময়ে দারিদ্র্য বিমোচনের একমাত্র মাধ্যম। এ বছরের ২৯ জানুয়ারি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে চতুর্দশ জাকাত ফেয়ার উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বাংলাদেশে সুষ্ঠুভাবে জাকাত আদায় করা হলে এক লাখ কোটি টাকা জাকাত আদায় করা সম্ভব। (যুগান্তর : ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬)। আসলেই কি এত টাকা জাকাত আদায় করা সম্ভব?
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে শুধু ব্যাংকে জমাকৃত অর্থের হিসেবে কোটিপতির সংখ্যা ১ লাখ ২৮ হাজারেরও বেশি। (যুগান্তর : ৭ ডিসেম্বর, ২০২৫)। শুধু গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই ১ লাখ ২৮ হাজার কোটিপতির সম্পদ ও তাদের জাকাত কত আসতে পারে, তার একটি ধারণা পাওয়া যেতে পারে। ২০২৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শীর্ষ ২১ কোটিপতির সম্পদ পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি। এছাড়া ২৮ হাজার ৯৩১ জনের সম্পদ ১০ কোটি থেকে ৫৩ কোটি টাকা। তাদের সম্পদ থেকেই সম্ভাব্য জাকাত আসে ২৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি দৈনিক বণিকবার্তায় প্রকাশিত শীর্ষ ধনীদের এক তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, ৩০ হাজার ৫৫৯ জন শীর্ষ ধনীর সম্পদ থেকে জাকাত আসতে পারে ৩৪ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা। বাকি ৯৭ হাজার কোটিপতির সম্পদ থেকে সম্ভাব্য জাকাত আসে ১২ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এতে দেখা যায়, শুধু ব্যাংকে জমাকৃত টাকার হিসেবে থাকা বিত্তশালীদের সম্পদ থেকেই প্রায় ৪৫-৫০ হাজার কোটি টাকা জাকাত আদায় করা যেতে পারে। এ তো শুধু ব্যাংকে জমাকৃত টাকার হিসেবে। ব্যাংকের বাইরে অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির হাতে থাকা অর্থ ও ব্যবসায়ী পণ্যের জাকাত যদি হিসেবে করা হয়, তাহলে আদায়যোগ্য জাকাত লাখ কোটি টাকা ছাড়াতে পারে। আর জাকাত তো ইবাদত। তাতে সম্পদের মালিক স্বেচ্ছায় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই ফাঁকি না দিয়ে হিসেব করে দেবেন। ফলে জাকাতের সংগ্রহ অনায়াসেই লাখ কোটি টাকা ছাড়াবে।
আদায়যোগ্য এ এক লাখ কোটি টাকা জাকাতের মাধ্যমে সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় পাঁচ বছরের একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে আল্লাহর বিধান জাকাত দিয়ে বাংলাদেশ থেকে দারিদ্র্যকে সমূলে উৎপাটন করা সম্ভব। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ভূমিহীন পরিবারের সংখ্যা ১৫ লাখ ৯৯ হাজার ৩২০ এবং প্রত্যেক পরিবারে গড়ে রয়েছে ৪ দশমিক ১৯ জন সদস্য। (দৈনিক কালবেলা : ২ এপ্রিল, ২০২৪)। ভূমিহীন ১৫ লাখ ৯৯ হাজার ৩২০টি পরিবার বা ৬৭ লাখ ৩৫ হাজার ৫১৭ জন মানুষের বিপরীতে আদায়যোগ্য জাকাত এক লাখ কোটি টাকা। যদি ৮০ হাজার কোটি টাকাও বছরে জাকাত আদায় করা যায়, তাহলে প্রথম বছরেই প্রায় ১৬ লাখ ভূমিহীন পরিবারকে পাঁচ লাখ করে জাকাতের অর্থ প্রদান করা যাবে এবং প্রত্যেক পরিবারে থাকা ৪ দশমিক ১৯ জনকে মাথাপিছু এক লাখেরও বেশি টাকা দিয়ে ব্যবসায়ী পণ্য বা ক্ষুদ্র ব্যবসার মূলধন, পশু পালন, রিকশা, সেলাই মেশিন, ভ্যান ও কৃষি সহায়তা দিয়ে কর্মসংস্থান তৈরি করে তাদের দারিদ্র্যসীমার ওপরে নিয়ে আসা যাবে।
দ্বিতীয় বছর আবার জাকাত আসবে অন্তত ৮০ হাজার কোটি টাকা। তখন তো আর ভূমিহীন পরিবার নেই। জাকাত ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান তখন এমন ব্যবসায়ীদের খুঁজে বের করবে, যাদের দোকান আছে কিন্তু মালামাল নেই। তারা এমন কৃষকদেরও খুঁজে বের করবে, যারা অর্থের অভাবে জমি চাষ করতে পারছেন না; পাশাপাশি ঋণগ্রস্ত ও অভাবগ্রস্ত মানুষদেরও শনাক্ত করবে। এমন ১৬ লাখ পরিবারকে প্রদান করবে পাঁচ লাখ টাকা করে। এভাবে চার বছরে ৬৪ লাখ পরিবারকে দারিদ্র্যসীমার উপরে নিয়ে আসতে পারবে। তিন-চার বছরে জাকাতের সংগ্রহ আরো বাড়বে, কারণ আগের তিন-চার বছরে জাকাত পাওয়া ৬৪ লাখ পরিবার থেকে অন্তত ২০-৩০ লাখ পরিবার আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হয়ে তারাও কিছু কিছু জাকাত দেবে। পঞ্চম বছরে দেখা যাবে, জাকাতের দাতা বাড়ছে, গ্রহীতা কমছে; কিন্তু এই ১ লাখ বা ৮০ হাজার কোটি টাকা জাকাত যাদের সম্পদ থেকে আদায় করা হবে, তাদের কি কোনো ক্ষতি হবে? কিছুতেই না। কারণ তা আদায় করা হবে জীবন-জীবিকার অতিরিক্ত সম্পদ থেকে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদেরও পুরোটা নেওয়া হবে না, নেওয়া হবে মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ। নেওয়া হবে ওই মালিকের নির্দেশে, যিনি তাকে এত সম্পদের মালিক বানালেন, যিনি চাইলেই তাকে ফকির বানিয়ে রাখতে পারতেন। ভূমিহীন, ঋণগ্রস্ত ও দরিদ্র পরিবারগুলোকে সরাসরি নগদ অর্থ প্রদানের পাশাপাশি কয়েক হাজার কোটি টাকা বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষায় দরিদ্র মুসলিম শিক্ষার্থীদের কর্মমুখী শিক্ষার ব্যবস্থা করলে তারা পরিবারগুলোকে দাঁড় করাতে পারবে। হিজড়াসহ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়তে কর্মমুখী শিক্ষার ব্যবস্থা করা যাবে।
জাকাত ব্যক্তিপর্যায়েও প্রদান করা যায়। বেসরকারিভাবে বিশ্বস্ত সংস্থাগুলো সে কাজ করতে পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন মুসলিম দেশে বেসরকারিভাবেও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় জাকাত সংগ্রহ ও বিতরণের মডেল রয়েছে। কিন্তু জনগণ আস্থা রাখতে পারবে, জাকাতের এমন সরকারি ব্যবস্থাপনা ইসলামি সরকারের অন্যতম মৌলিক কাজ, মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানের অনিবার্য দায়িত্ব। আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘তারা এমন যে, আমি যদি দুনিয়ায় তাদের ক্ষমতা দান করি, তবে তারা নামাজ কায়েম করবে, জাকাত আদায় করবে, মানুষকে সৎকাজের আদেশ করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে। সব কাজের পরিণতি আল্লাহরই হাতে।’ (সুরা হজ : ৪১)
সরকারিভাবে এমন একটি বিশ্বস্ত সংস্থা থাকতে পারে, যার প্রতি গণমানুষের আস্থা থাকবে। দেশের পরীক্ষিত আমানতদার ও যোগ্য আলেমদের তত্ত্বাবধানে স্বতন্ত্রভাবে তা পরিচালিত হবে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পুরো জাকাত ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটালাইজ করতে হবে অ্যাপ বা অনলাইন ব্যবস্থাপনার মতো আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে। এভাবে অনিয়মের সব পথ বন্ধ করে প্রতিবছর জাকাত সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করতে হবে। তারপর প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কর্মসূচি কঠোরভাবে মূল্যায়ন ও মনিটরিং করে বছর শেষে গণমানুষের কাছে তা স্পষ্ট প্রতিবেদন আকারে তুলে ধরলে মানুষ সরকারি তহবিলে জাকাত দিতে উদ্বুদ্ধ হবে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত জাকাত তহবিলে যে অর্থ দেওয়া হয়, তার ওপর কর রেয়াত পাওয়ার ব্যবস্থা ইতোমধ্যেই রয়েছে। সেটাকে আরো হালনাগাদ করা যায়।
জাকাত বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও ইসলামি অর্থনীতিবিদ বিজ্ঞ আলেমদের পরামর্শে ‘জাকাত তহবিল ব্যবস্থাপনা আইন ২০২৩’ আরো সময়োপযোগী করে জাকাতভিত্তিক দারিদ্র্যবিমোচন কর্মসূচির সঙ্গে সরকারি কর্মসূচির একটি সফল সংযোগ করে বছরে কতজনকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দেওয়া গেল, বছর শেষে তার তথ্য তুলে ধরা হলে বাড়বে জাকাতদাতার পরিমাণ। ‘সিআইপি’দের মতো যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান মোটা অঙ্কের জাকাত দেবে, তাদের পুরস্কৃত করলেও কাজে আসতে পারে। জাকাতের অর্থে কর্মসংস্থান তৈরি করা যাবে, আবার জাকাত সংগ্রহ, বিতরণ ও মনিটরিংয়েও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মতো জাকাত বোর্ডেও হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। জাকাত সংগ্রহ ও বিতরণের দায়িত্বে থাকা কর্মচারী-কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতাও জাকাতের অর্থ থেকে দেওয়ার ব্যবস্থাও পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রেখেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় জাকাত হচ্ছে ফকির-মিসকিনদের জন্য এবং এতে নিয়োজিত কর্মচারীদের জন্য...।’ (সুরা তাওবা : ৬০)। এ রকম প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা হলে আশা করা যায় পাঁচ বছরেই দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব।
লেখক : প্রিন্সিপাল, বাইতুল হিকমাহ একাডেমি, গাজীপুর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

