যা ঘটেছিল কারবালায়

সুলতান মাহমুদ সরকার

যা ঘটেছিল কারবালায়

ইতিহাসের পাতায় কিছু ঘটনা থাকে, যা শুধু একটি নির্দিষ্ট জাতি বা ধর্মের সীমা ছাড়িয়ে সমগ্র মানবজাতির বিবেককে নাড়া দেয়। কারবালার শাহাদত সেই বিরল ঘটনাগুলোর একটি। ৬১ হিজরির মহররমের দশম দিন, যে দিনটিকে আশুরা বলা হয়, ফোরাত নদীর তীরে যা ঘটেছিল তা কোনো সাধারণ যুদ্ধের বিবরণ নয়। এটি ছিল মানবতার ইতিহাসে সত্য ও মিথ্যার মধ্যকার এক অসম লড়াইয়ের দলিল, যেখানে সংখ্যার দিক থেকে ক্ষুদ্র একটি দল অসীম সাহস ও বিশ্বাসের শক্তিতে দাঁড়িয়ে পড়েছিল অন্যায়ের বিশাল শক্তির বিরুদ্ধে। সেই দলের নেতৃত্বে ছিলেন সাইয়িদুনা হোসাইন ইবনে আলি (রা.), যিনি ছিলেন আমাদের প্রিয়নবী (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র।

ঘটনার পটভূমি বুঝতে হলে একটু পেছনে যেতে হবে। মুয়াবিয়া (রা.)-এর মৃত্যুর পর তার ছেলে ইয়াজিদ খেলাফতের মসনদে বসেন। ইয়াজিদের চরিত্র ও শাসনপদ্ধতি নিয়ে সমকালীন মুসলিম পণ্ডিত এবং সাহাবাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ছিল। তিনি চাইলেন হোসাইন (রা.) তার কাছে আনুগত্যের শপথ নেন। কিন্তু হোসাইন (রা.) জানতেন এই আনুগত্য মানে শুধু একজন শাসকের প্রতি ব্যক্তিগত বশ্যতা নয়। এটি হবে অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া, সত্যকে বিসর্জন দেওয়া।

বিজ্ঞাপন

এই পরিস্থিতিতে কুফার মানুষ হোসাইন (রা.)-কে অসংখ্য চিঠি পাঠাল। তারা তাকে আমন্ত্রণ জানাল, সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিল। হোসাইন (রা.) প্রথমে তার চাচাতো ভাই মুসলিম ইবনে আকিলকে কুফায় পাঠালেন পরিস্থিতি যাচাই করতে। মুসলিম ইবনে আকিলের প্রতিবেদন ছিল উৎসাহজনক, হাজার হাজার কুফাবাসী তার হাতে আনুগত্যের শপথ করেছিল। কিন্তু তারপর যা হলো তা ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিশ্বাসঘাতকতার একটি। ইয়াজিদের পক্ষ থেকে নতুন গভর্নর উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদ কুফায় এসে রাজনৈতিক চাপ ও ভয় দেখিয়ে কুফাবাসীর মনোভাব পরিবর্তন করে দিলেন। মুসলিম ইবনে আকিল একাকী হয়ে পড়লেন এবং শেষ পর্যন্ত শহীদ হলেন।

হোসাইন (রা.) তখন মক্কা থেকে কুফার দিকে যাত্রা শুরু করেছেন। পথে যখন তিনি মুসলিম ইবনে আকিলের শাহাদতের খবর পেলেন, তখন তিনি তার সঙ্গীদের বললেন, যারা ফিরে যেতে চান তারা ফিরে যেতে পারেন। কারণ এটি আর নিরাপদ যাত্রা নয়। অনেকেই ফিরে গেলেন। কিন্তু হোসাইন (রা.) থামলেন না। শুধু তার পরিবার ও কিছু বিশ্বস্ত সঙ্গী নিয়ে তিনি এগিয়ে চললেন। এই এগিয়ে চলাটাই ছিল সেই মহান সিদ্ধান্ত, যা পৃথিবীর ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।

কারবালার প্রান্তরে পৌঁছে হোসাইন (রা.)-এর ছোট দলটি ঘেরাও হলো ইয়াজিদের বিশাল সৈন্যবাহিনী দ্বারা। ফোরাত নদীর পানি থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করা হলো। শিশু, নারী, বৃদ্ধ সবাই পানির কষ্টে ভুগতে লাগলেন। ইয়াজিদের পক্ষ থেকে একটাই শর্ত ছিল, হোসাইন (রা.) আনুগত্য স্বীকার করুন। কিন্তু সেই মানুষটি যিনি নবী করিম (সা.)-এর কোলে বড় হয়েছেন, যিনি শুনেছেন সত্যের পথে কতটা অবিচল থাকতে হয়, তিনি কি পারেন অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে? তিনি পারেননি।

১০ মহররম সকালে যুদ্ধ শুরু হলো। একে কি যুদ্ধ বলা যায়? একপাশে ৭২ জন মানুষ, অন্য পাশে হাজার হাজার সৈন্য। একে একে শহীদ হতে লাগলেন হোসাইন (রা.)-এর সঙ্গীরা। শহীদ হলেন তার ভাই আব্বাস (রা.), যিনি পানি আনতে গিয়ে উভয় হাত হারিয়েছিলেন কিন্তু শিশুদের জন্য পানির মশক ধরে রেখেছিলেন দাঁতে কামড়ে। শহীদ হলেন হোসাইন (রা.)-এর ছেলে আলি আকবর, মাত্র আঠারো বছরের তরুণ, যার চেহারা ছিল নাকি নবী করিম (সা.)-এর মতো। শেষ পর্যন্ত একাকী দাঁড়িয়ে রইলেন হোসাইন (রা.) নিজে, তার শরীরে তখন অসংখ্য ক্ষত।

সেই বিকালে কারবালার মাটি রঞ্জিত হলো। হোসাইন (রা.) শহীদ হলেন। তার শির মোবারক পৃথক করা হলো। সেই অবিশ্বাস্য নিষ্ঠুরতার কথা লিখতে গেলে কলম থেমে যায়। কিন্তু এখানেই ইতিহাসের সেই বিস্ময়কর বিরোধাভাস নিহিত। যে ইয়াজিদ শারীরিকভাবে জিতেছিল, সে ইতিহাসের আদালতে চিরকালের জন্য নিন্দিত হয়ে গেল। আর যে হোসাইন (রা.) শারীরিকভাবে পরাজিত হলেন, তিনি হয়ে উঠলেন মানবজাতির চিরন্তন প্রেরণার উৎস।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বিবেচনা করা দরকার। কারবালার ঘটনায় বিশ্বাসঘাতকতার বিষয়টিও একটি বড় শিক্ষা। কুফাবাসী যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে হোসাইন (রা.)-কে ডেকেছিল এবং তারপর যেভাবে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, এটি কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, মানুষ সুবিধার সময় ন্যায়ের পক্ষে থাকে, কিন্তু ঝুঁকি এলে সরে যায়। এই বাস্তবতা জেনেও হোসাইন (রা.) সত্যের পথ ছাড়েননি। এটাই তাকে শুধু ইসলামের ইতিহাসে নয়, পুরো মানবজাতির ইতিহাসে এক অসাধারণ উচ্চতায় স্থাপন করেছে।

আমাদের এ সময়ে, যখন পৃথিবীর নানা প্রান্তে ক্ষমতার অপব্যবহার, সত্যের অপলাপ ও দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার প্রতিদিনের খবর, তখন মহররম এবং কারবালার শিক্ষা আরো প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। এই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জুলুম কখনো চিরস্থায়ী হয় না। ইয়াজিদ যে সিংহাসন রক্ষা করতে এতটা নিষ্ঠুর হয়েছিল, সেই সিংহাসন আজ ধুলোয় মিশে গেছে। কিন্তু হোসাইন (রা.)-এর আদর্শ আজও লাখ লাখ মানুষের হৃদয়ে জীবিত।

লেখক : শিক্ষক, গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন