বিশ্বকাপের রাতগুলো কখনো কখনো শুধু ফুটবল নয়, রূপকথাও লেখে। আর সেই রূপকথার সবচেয়ে বড় গল্পকারের নাম যদি হয় লিওনেল মেসি, তাহলে প্রতিটি ম্যাচই যেন নতুন কোনো অধ্যায়ের অপেক্ষা।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে তিনি যা করেছেন তাতে হ্যাটট্রিকের সঙ্গে বিশ্বকাপে বহু বছর ধরে চলে আসা সর্বসেরা কে—এই বিতর্কেরও একটা চূড়ান্ত ফয়সালা হয়ে গেছে! বয়স তার ৩৮। কিন্তু শরীর মনে এবং খেলায় এখনো যে কুড়ি বছরের স্বপ্ন বাস করে, সেই প্রমাণই রাখলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। তিন গোল, বেশ কয়েকটি জাদুকরি মুহূর্ত আর প্রতিপক্ষকে অসহায় বানিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করলেন দুর্দান্ত এক জয়ে।
এবার সামনে অস্ট্রিয়া। আজ সোমবার রাতে (বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা) আর্লিংটনের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে গ্রুপ জে-এর দ্বিতীয় ম্যাচ। এই ম্যাচের গুরুত্ব শুধু তিন পয়েন্টে আটকে নেই। এটি হতে পারে আরেকটি ইতিহাস গড়ার রাত। হতে পারে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে এককভাবে বসার রাত। হতে পারে আর্জেন্টিনার নকআউট নিশ্চিত করার রাতও।
মেসির নামের পাশে এখন বিশ্বকাপে ১৬ গোল। মিরোস্লাভ ক্লোজার রেকর্ডের সমান। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে একটি গোল মানেই জার্মান কিংবদন্তিকে পেছনে ফেলে নতুন ইতিহাস। তবে যারা মেসিকে কাছ থেকে চেনেন, তারা জানেন—ব্যক্তিগত রেকর্ড নয়, তার চোখে এখন শুধুই বিশ্বকাপ ধরে রাখার স্বপ্ন।
কাপ জেতার কাজটা তো চার বছর আগেই শেষ করেছেন মেসি!
গত বুধবার আলজেরিয়ার বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ে যেন পুরোনো সেই মেসিকেই ফিরে পেয়েছিল ফুটবল বিশ্ব। শুধু হ্যাটট্রিকই নয়, অফসাইডের কারণে বাতিল হওয়া আরেকটি গোলও দেখিয়ে দিয়েছে, প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের ওপর কতটা প্রভাব বিস্তার করেছিলেন তিনি। আরেকটি বিশেষ উপলক্ষ ছিল সেটি—আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ।
এই আর্জেন্টিনা এখন শুধুই একটি দল নয়, যেন ফুটবল মাঠে এক ঝড়। বিশ্বকাপের শেষ সাত ম্যাচে জয়। প্রতিটি ম্যাচেই আত্মবিশ্বাস, পরিণত ফুটবল আর চ্যাম্পিয়নসুলভ মানসিকতা। স্কালোনির দল জানে, বিশ্বকাপে শিরোপা ধরে রাখার পথ কখনো সহজ হয় না। কিন্তু তারা এটাও জানে, পথ যত কঠিন হবে, ততই উজ্জ্বল হয়ে উঠবেন তাদের অধিনায়ক। তবে ভুল করলে চলবে না। অস্ট্রিয়া কোনোভাবেই সহজ প্রতিপক্ষ নয়। আলজেরিয়ার চেয়ে আজ অস্ট্রিয়া খানিকটা বড় প্রতিপক্ষ।
রাল্ফ র্যাংনিকের দল আধুনিক ইউরোপীয় ফুটবলের প্রতিচ্ছবি। প্রেসিং ফুটবল, দ্রুত ট্রানজিশন আর মাঝমাঠে নিরন্তর চাপ—এই তিন অস্ত্র নিয়েই তারা মাঠে নামে। জর্ডানকে ৩-১ গোলে হারিয়ে আত্মবিশ্বাস নিয়ে আর্জেন্টিনার সামনে দাঁড়াচ্ছে দলটি। ১৯৮২ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপের নকআউটে ওঠার স্বপ্নও দেখছে অস্ট্রিয়ানরা।
অধিনায়ক ডেভিড আলাবা জানেন, মেসিকে থামানোই যথেষ্ট নয়। তিনি বলেছেন, ‘আর্জেন্টিনার শক্তি শুধু মেসিতে সীমাবদ্ধ নয়। পুরো দলটিই বিশ্বমানের।’
আর্জেন্টিনাও প্রতিপক্ষকে হালকাভাবে নিচ্ছে না। দলের সহকারী কোচ পাবলো আইমার মনে করিয়ে দিয়েছেন, অস্ট্রিয়া শারীরিকভাবে শক্তিশালী এবং সুযোগ পেলে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য রাখে।
কৌশলগত লড়াইটাও হবে দারুণ উপভোগ্য। বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে রাখতে চাইবে আর্জেন্টিনা। মাঝমাঠে মেসির স্বাধীন বিচরণ, ডি পলের শ্রম, ম্যাক অ্যালিস্টার ও এনজো ফার্নান্দেজের পাসিং, সামনে আলভারেজ কিংবা লাওতারোর দৌড়—সব মিলিয়ে আক্রমণের ছন্দ তৈরি করবে স্কালোনির দল।
অন্যদিকে অস্ট্রিয়া চেষ্টা করবে শুরু থেকেই আর্জেন্টিনার ডিফেন্সে এবং মিডফিল্ডে চাপ তৈরি করতে। তবে হাইপ্রেসিং করতে গিয়ে যদি সেই প্রেসিং একবার ভাঙে, তাহলে পেছনে তৈরি হওয়া ফাঁকা জায়গাগুলো কাজে লাগাতে মেসির মতো শিল্পীর দ্বিতীয়বার ভাবার প্রয়োজন পড়বে না। প্রথম ম্যাচে হ্যাটট্রিক করে মেসি বুঝিয়ে দিয়েছেন তার গোলক্ষিদে কেমন।
দুই দলের অতীত পরিসংখ্যান খুব বেশি সমৃদ্ধ নয়। ১৯৮০ সালে আর্জেন্টিনা জিতেছিল ৫-১ ব্যবধানে। আর ১৯৯০ সালে প্রীতি ম্যাচে দুই দল ১-১ গোলে ড্র করেছিল। তবে বিশ্বকাপের মঞ্চে অতীতের হিসাব খুব কমই তেমন কাজে দেয়। বিশ্বকাপে এই প্রথম উভয় দল মুখোমুখি হচ্ছে আজ রাতে।
সম্ভাব্য একাদশেও বড় কোনো চমক থাকার সম্ভাবনা নেই। এমিলিয়ানো মার্তিনেজের সামনে থাকবেন রোমেরো ও লিসান্দ্রো মার্তিনেজ। মাঝমাঠে ডি পল, এনজো, ম্যাক অ্যালিস্টার এবং সামনে মেসিকে ঘিরেই সাজানো হবে আক্রমণের ছক। অথবা পরিস্থিতি বদলে আর্জেন্টিনা হয়তো ৪-৩-১-২ এই ছকেও খেলতে পারে। সেক্ষেত্রে তিন মিডফিল্ডারের সঙ্গে প্লে মেকারের ভূমিকা নিয়ে আলমাদা আক্রমণে মেসি ও লাউতারো মার্তিনেজের জন্য বল বাড়াবেন। আবার সেই সঙ্গে নিচে নেমে মিডফিল্ডারদের সঙ্গে লড়াইয়েও নামবেন।
এই ম্যাচের বাজির বাজার বলছে, ফেভারিট আর্জেন্টিনা। পরিসংখ্যানও তাই বলছে। কিন্তু বিশ্বকাপের বিউটি হলো, এখানে ভবিষ্যদ্বাণীর চেয়ে ম্যাচের মুহূর্ত অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী।
আর সেই মুহূর্তের নাম যদি হয় লিওনেল মেসি, তাহলে সেই শক্তিমানের শক্তি দেখার অপেক্ষায় থাকুন আজ রাতে।
হয়তো সোমবার রাতেই ইতিহাস আবার নতুন করে লেখা হবে। হয়তো আরেকটি গোল, আরেকটি জাদুকরী স্পর্শ কিংবা আরেকটি জয়—যাই-ই হোক, ফুটবল বিশ্ব জানে, মেসি যখন মাঠে নামেন, তখন শুধু একটি ম্যাচ নয়; জন্ম নেয় আরেকটি গল্প। আরেকটি নতুন ইতিহাস!
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


