স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে যে একাদশ খেলিয়েছিলেন, ঠিক সেই দল নিয়েই আজ মাঠে নেমেছে ব্রাজিল। অন্যদিকে সুইডেনের সঙ্গে ড্র করা ম্যাচের একাদশে চারটি পরিবর্তন এনেছে জাপান। দক্ষিণ আমেরিকার পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা তাদের ঐতিহ্যবাহী হলুদ জার্সিতে খেলছে, আর জাপান নেমেছে সাদা জার্সিতে।
গ্যালারিভর্তি দর্শকদের বজ্রধ্বনির করতালির মধ্যে টানেল পেরিয়ে মাঠে উঠছেন দুই দলের খেলোয়াড়রা। সামনে অপেক্ষা করছে শেষ ষোলোর টিকিট। একই সঙ্গে দক্ষিণ আমেরিকা ও এশিয়ার দুই ফুটবল পরাশক্তির এই লড়াইয়ে জয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের গর্বও। উত্তেজনায় ফুটছে হিউস্টনের স্টেডিয়াম।
হিউস্টনের স্টেডিয়ামে টানটান উত্তেজনার মধ্যে মাঠে প্রবেশ করেছে ব্রাজিল ও জাপানের ফুটবলাররা। এখন জাতীয় সংগীত পরিবেশনের পালা। আর কয়েক মুহূর্তের অপেক্ষা, এরপরই শুরু হবে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের বহুল প্রতীক্ষিত এই লড়াই।

আজকের নকআউট লড়াইয়ের আগে অনুপ্রেরণা খুঁজতে চাইলে জাপান ফিরে তাকাতে পারে ব্রাজিলের বিপক্ষে নিজেদের সর্বশেষ দেখায়।
গত বছরের অক্টোবর মাসে টোকিওতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও ৩-২ ব্যবধানে ব্রাজিলকে হারিয়েছিল সামুরাই ব্লুরা।
সেদিন ম্যাচের ২৬তম মিনিটে পাওলো হেনরিকে দুর্দান্ত এক শটে ব্রাজিলকে এগিয়ে দেন। ছয় মিনিট পর ব্যবধান দ্বিগুণ করেন আর্সেনাল ফরোয়ার্ড গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি। তবে বিরতির পর বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। দারুণ প্রত্যাবর্তন করে জাপান।
ঘণ্টার কাঁটা পেরোনোর পরপরই সাবেক লিভারপুল ফরোয়ার্ড তাকুমি মিনামিনো এবং কেইতো নাকামুরার গোলে সমতায় ফেরে স্বাগতিকরা। এরপর ৭১তম মিনিটে আয়াসে উয়েদার শক্তিশালী হেডে জয়সূচক গোলটি আসে।
তবে পরিসংখ্যান জাপানের পক্ষে নয়। সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ব্রাজিলের বিপক্ষে ১৪টি ম্যাচ খেলেছে তারা। এর মধ্যে জাপানের জয় মাত্র একটি, ড্র দুটি এবং হার ১১টি।

একটি মজার তথ্য হলো,এটি ব্রাজিলের কোচ হিসেবে কার্লো আনচেলত্তির ১৬তম ম্যাচ। আর এই ম্যাচেই ঘটেছে ব্যতিক্রমী ঘটনা। আগের ১৫ ম্যাচে প্রতিবারই তিনি শুরুর একাদশে পরিবর্তন এনেছিলেন। কিন্তু এবারই প্রথম কোনো পরিবর্তন না করে আগের ম্যাচের একই একাদশ মাঠে নামিয়েছেন ইতালিয়ান এই কোচ।
চমকে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত বটে!

বাংলাদেশ না থেকেও আছে বিশ্বকাপে। ব্রাজিলের খেলা দেখতে বাংলাদেশের পতাকা হাতে মাঠে হাজির জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া।
‘টুর্নামেন্ট যত এগোবে, ব্রাজিলও তত উন্নতি করবে’
স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি বিশ্বকাপের বাকি দলগুলোর জন্যও একটি বার্তা ছিল—আমার মনে হয়, ব্রাজিল অবশেষে নিজেদের ছন্দ খুঁজে পেয়েছে।
প্রথম ম্যাচে তারা ভালো খেলতে পারেনি। দ্বিতীয় ম্যাচটিকেও আমি খুব বেশি মূল্যায়ন করব না। তবে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ব্রাজিল সত্যিই দারুণ একটি ম্যাচ খেলেছে।
স্কটল্যান্ড অবশ্য কয়েকটি সহজ ভুল করে গোল উপহার দিয়েছে, কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্রাজিল দেখিয়েছে তারা আসলে কী করতে সক্ষম। আমার বিশ্বাস, টুর্নামেন্ট যত এগোবে, ব্রাজিলও তত উন্নতি করবে।
জাপানের বিপক্ষে ম্যাচটি অবশ্যই কঠিন হবে। তবে প্রথম ম্যাচ দেখার পর যতটা শঙ্কা ছিল, এখন আমি তার চেয়ে অনেক বেশি আশাবাদী।
-সাবেক ব্রাজিল মিডফিল্ডার লুকাস লেইভা
বিবিসি রেডিও ৫ লাইভে
সংখ্যার বিচারে গ্যালারিতে ব্রাজিল সমর্থকদেরই হয়তো আধিপত্য থাকবে। তবে জাপানি সমর্থকেরা ভালোভাবেই জানেন কীভাবে গ্যালারিকে রঙিন করে তুলতে হয় আর কীভাবে অভিনব পোশাকে নজর কাড়তে হয়।



‘নেইমার সমালোচনার জবাব দেবে’
নেইমার ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। বর্তমান ব্রাজিল দলে তার মতো একাই ম্যাচ জিতিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য আর কোনো খেলোয়াড়ের মধ্যে আমি দেখি না।
তাই যদি আমরা তাকে পাশে পাই, তাহলে সেই সুযোগ কোনোভাবেই হাতছাড়া করা উচিত নয়। চিকিৎসকেরা তাকে খেলার অনুমতি দিয়েছেন, সে এখন শারীরিকভাবে প্রস্তুত। এখন তার সামনে সুযোগ আছে—যারা তাকে বিশ্বাস করেনি, তাদের মুখ বন্ধ করে দেওয়ার।
২০০২ সালে আমিও এমন একটি প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে গিয়েছিলাম। তাই আমি নেইমারের পাশে আছি। ৩৪ বছর বয়সে এসে তার প্রতিভা নতুন করে প্রমাণ করার কিছু নেই। তবে আমি আশা করি, মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই সে তাকে নিয়ে যারা সন্দেহ করেছে, তাদের সব সমালোচনার জবাব দেবে।
- রোনালদো নাজারিও, ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি

এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের আক্রমণের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে উঠেছেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা তিন ম্যাচে করেছেন চারটি গোল, সঙ্গে রয়েছে একটি অ্যাসিস্ট। তাঁর গতি, ড্রিবলিং ও গোল করার ক্ষুধাই এখন সেলেসাওদের আক্রমণের মূল চালিকাশক্তি।
নকআউট পর্বের শুরুতে তুলনামূলক কম শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হচ্ছে ব্রাজিল। তাই ভিনিসিয়ুসের কাছ থেকে আরেকটি উজ্জ্বল পারফরম্যান্সই প্রত্যাশা করছেন সমর্থকেরা। যদি তিনি গ্রুপ পর্বের সেই দুর্দান্ত ফর্ম ধরে রাখতে পারেন, তবে ব্রাজিলের শেষ ষোলো পেরিয়ে আরও দূরে যাওয়ার সম্ভাবনাও অনেকটাই বেড়ে যাবে।
বিশ্বকাপ সবসময়ই স্বপ্নবাজদের মঞ্চ। প্রতি চার বছর পরপরই নতুন আশায় বুক বেঁধে মাঠে নামে দেশগুলো—ইতিহাস নতুন করে লেখার বিশ্বাস নিয়ে।
কিন্তু টুর্নামেন্টের নকআউট পর্বে রূপকথার জন্য খুব বেশি জায়গা থাকে না। এখানে স্বপ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায় ফুটবলের সবচেয়ে পুরোনো আর শক্তিশালী পরাশক্তিরা।
জাপানের জন্য সেই পরীক্ষার মুহূর্ত এসেছে হিউস্টনে। ‘সামুরাই ব্লু’ গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে ধারাবাহিক চমক জাগানো দলগুলোর একটি। ১৯৯৮ সালের পর চারবার কঠিন গ্রুপ পেরিয়ে নকআউটে উঠেছে তারা। কিন্তু আজও বিশ্বকাপের পুরুষদের আসরে নকআউট পর্বের কোনো ম্যাচ জয়ের স্বাদ পায়নি জাপান।
আর সেই দীর্ঘ অপেক্ষার সামনে এবার দাঁড়িয়ে আছে এমন এক প্রতিপক্ষ, যারা অন্য সবার চেয়ে বেশি বার বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছে—পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল।

একাদশ
ব্রাজিল: অ্যালিসন; দানিলো, মারকিনিওস, গ্যাব্রিয়েল, ডগলাস সান্তোস; কাসেমিরো, ব্রুনো গিমারায়েস, লুকাস পাকেতা; ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, মাতেউস কুনিয়া, রায়ান।
জাপান: জিয়ন সুজুকি; তাকেহিরো তোমিয়াসু, শোগো তানিগুচি, হিরোকি ইতো; রিৎসু দোয়ান, দাইচি কামাদা, কাইশু সানো, কেইতো নাকামুরা; দাইজেন মায়েদা, জুনিয়া ইতো; আয়াসে উয়েদা।

পুরোনো প্রবাদই যেন মানছেন কার্লো আনচেলত্তি—যা ভালো চলছে, তা বদলানোর দরকার নেই। তাতে, আজও শুরুর একাদশে জায়গা হলো না নেইমারের।
স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে গ্রুপ পর্ব শেষ করা দলটিতেই কোনো পরিবর্তন আনেননি ব্রাজিল কোচ। শেষ ষোলোর গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে জাপানের বিপক্ষেও সেই একই একাদশকে মাঠে নামিয়েছেন তিনি।
আক্রমণের মূল ভরসা হিসেবে থাকছেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। অন্যদিকে চোটের কারণে রাফিনিয়া এখনও পুরোপুরি সুস্থ নন। ফলে সেলেসাওদের সম্ভাব্য কোয়ার্টার ফাইনালের আগে তার মাঠে ফেরার সম্ভাবনা খুবই কম।
স্বাগতম!
আবারও বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনায় আপনাদের স্বাগত। আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে দারুণ এক মহারণ। শেষ ষোলোর টিকিটের লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছে ব্রাজিল ও জাপান। দৈনিক আমার দেশ-এর লাইভ ব্লগে আপনাকে স্বাগতম।