রঙিন রোনালদো, পর্তুগালের গোলোৎসব হিউস্টনে

Picsart_26-06-04_12-40-53-266
এম. এম. কায়সার

রঙিন রোনালদো, পর্তুগালের গোলোৎসব হিউস্টনে

সমালোচনার ঝড়ের মাঝেই যেন সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে ওঠেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ক্যারিয়ারের দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দৃশ্যটা বারবার দেখা গেছে। যখন বলা হয় তার সময় শেষ, তখনই তিনি নতুন করে নিজের অস্তিত্ব জানান দেন। বিশ্বকাপের মঞ্চেও সেই পুরোনো গল্পেরই পুনরাবৃত্তি হলো। পর্তুগালের ৫ গোলের জয়ে রোনালদো জোড়া গোল করে জানান দিলেন, এই বিশ্বকাপে মেসি, এমবাপ্পে, হাল্যাল্ডদের সঙ্গে তিনিও আছেন এবং বেশ ভালোভাবেই আছেন!

ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে গোল করতে পারেননি। টানা ১০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে গোলশূন্য থাকার কারণে সমালোচনার তির ছুটে এসেছিল চারদিক থেকে। সাবেক খেলোয়াড়, বিশ্লেষক, সমর্থক—অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, ৪১ বছর বয়সি এই ফরোয়ার্ডকে ঘিরে পর্তুগালের এত নির্ভরতা কি এখনো যৌক্তিক?

বিজ্ঞাপন

উজবেকিস্তানের বিপক্ষে সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে রোনালদোর সময় লাগল মাত্র ছয় মিনিট।

হিউস্টনের এনআরজি স্টেডিয়ামে শুরু থেকেই ছিল পর্তুগালের দাপট। ডান দিক দিয়ে জোয়াও ক্যানসেলোর দুর্দান্ত দৌড় আর নিখুঁত ক্রস থেকে বল পেয়ে কাছের পোস্টে ঝাঁপিয়ে পড়েন রোনালদো। এক টাচেই বল জড়িয়ে দেন জালে। গোলের পর তার উদযাপনেও ছিল স্বস্তি, আত্মবিশ্বাস আর চেনা সেই আগুন।

গোলটি ছিল শুধু ম্যাচের প্রথম গোল নয়, ইতিহাসেরও অংশ। বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে ছয়টি ভিন্ন আসরে গোল করার কীর্তি গড়লেন রোনালদো। ২০০২, ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০২২ এবং এখন ২০২৬—চব্বিশ বছরের ব্যবধানে বিশ্বকাপের ছয় সংস্করণে গোল করা এক অবিশ্বাস্য অধ্যায়ের নাম এখন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।

প্রথম গোলের পর পর্তুগালের আক্রমণ আরো ধারালো হয়ে ওঠে। মাঝমাঠে ব্রুনো ফার্নান্দেস, দুই প্রান্তে ক্যানসেলো ও জোয়াও ফেলিক্স, আর সামনে রোনালদো—সব মিলিয়ে উজবেকিস্তানের রক্ষণকে বারবার ভেঙে ফেলছিল তারা। ম্যাচের মাঝপথে নুনো মেন্ডেস ব্যবধান দ্বিগুণ করেন।

তবে রাতটা ছিল রোনালদোর।

প্রথমার্ধের ৩৯ মিনিটে ব্রুনো ফার্নান্দেসের অসাধারণ থ্রু বল ধরে ডান পায়ের নিখুঁত ফিনিশে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন তিনি। সেই গোলের মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা নিয়ে যান দশে। আর তাতেই পর্তুগালের কিংবদন্তি ইউসেবিওকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসে দেশের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে যান রোনালদো।

এটাই ছিল ম্যাচের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত।

বিশ্বকাপে পর্তুগালের হয়ে সবচেয়ে বেশি গোল, ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল, ৪১ বছর বয়সে টুর্নামেন্টের অন্যতম প্রবীণ গোলদাতা—এক রাতেই যোগ হলো একাধিক মাইলফলক। বয়সকে যেন তিনি পরিণত করেছেন আরেকটি পরিসংখ্যানে, যা তাকে থামাতে পারেনি।

পর্তুগাল শেষ পর্যন্ত ম্যাচ জিতেছে ৫-০ গোলের বিশাল ব্যবধানে। স্কোরলাইনের মতোই দাপুটে ছিল তাদের পারফরম্যান্স। প্রেসিং, দ্রুত ট্রানজিশন, উইং প্লে এবং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়ে রবার্তো মার্টিনেজের দলকে এবার অনেক বেশি পরিণত ও ভয়ংকর মনে হয়েছে।

বিরতির পর দুটি পরিবর্তন নিয়ে মাঠে নামে পর্তুগাল। জোয়াও কানসেলো ও পেদ্রো নেতোর জায়গায় নামেন নেলসন সেমেদো এবং ফ্রান্সিসকো কনসেইসাও। দ্বিতীয়ার্ধেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছেই রাখে ইউরোপের দলটি। ৫৮ মিনিটে হ্যাটট্রিকের সুযোগ পেয়েছিলেন রোনালদো। ব্রুনো ফার্নান্দেজের লব করা বল থেকে নেওয়া তার শট দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দেন নেমাতভ। কিন্তু দুই মিনিট পর আর রক্ষা হয়নি উজবেকদের। ব্রুনোর কর্নার থেকে রোনালদোর স্পর্শের পর বল খুসানোভের গায়ে লেগে গোলমুখে যায়। সেটি ঠেকাতে গিয়ে উল্টো নিজের জালেই বল জড়িয়ে ফেলেন গোলরক্ষক নেমাতভ। আত্মঘাতী সেই গোলে ব্যবধান দাঁড়ায় ৪-০।

উজবেকিস্তান অবশ্য ৭৮ মিনিটে সান্ত্বনার গোলের খুব কাছাকাছি গিয়েছিল। শোমুরোদভের শট অল্পের জন্য ক্রসবারের ওপর দিয়ে চলে গেলে হতাশ হতে হয় তাদের। শেষদিকে আরো একবার জ্বলে ওঠে পর্তুগাল। ৮৭ মিনিটে ডান দিক থেকে নেলসন সেমেদোর দারুণ ক্রস পেয়ে বদলি খেলোয়াড় রাফায়েল লেয়াও জালের ওপরের বাঁ কোণায় নিখুঁত শটে বল পাঠিয়ে স্কোরলাইন ৫-০ করেন।

ইনজুরি টাইমে হ্যাটট্রিকের সুযোগ পেয়েও গোল করতে পারেননি রোনালদো। তবে তাতে ম্যাচের গল্প বদলায়নি। রেকর্ডগড়া জোড়া গোল আর দলীয় আধিপত্যের প্রদর্শনীতে পর্তুগাল তুলে নেয় বিশ্বকাপের অন্যতম দাপুটে জয়। উদ্বোধনী ম্যাচের ধাক্কা ভুলে নকআউটের লড়াইয়ে নিজেদের শক্ত অবস্থানের বার্তাও দিয়ে রাখল রোনালদোর দল।

পর্তুগাল দাপটের সঙ্গে ম্যাচ জিতেছে। গোল উৎসবে মেতেছে। তবে ম্যাচ শেষে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন একজনই। কারণ, ফুটবল ইতিহাসে অনেক বড় খেলোয়াড় এসেছেন, অনেক রেকর্ডও গড়া হয়েছে। কিন্তু সমালোচনার জবাব বারবার মাঠে নেমে, গোল করে, ইতিহাস লিখে দেওয়ার ক্ষমতা খুব কম মানুষেরই থাকে।

রোনালদো আরেকবার সেই উদাহরণই তৈরি করলেন। বিশ্বকাপে তার উপস্থিতি নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর তিনি সংবাদ সম্মেলনে দেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নয়। উত্তর দিয়েছেন নিজের সবচেয়ে পরিচিত ভাষায়—গোলের ভাষায়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

বিষয়: