গত বছর প্রথমবারের মতো ভারত ও তুরস্কের বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি সম্মেলনের আয়োজন করে আঙ্কারাভিত্তিক একটি তুর্কি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক। দু’দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে তখন বেশ আশাবাদী ছিলেন সবাই ।
এই সম্মেলনের লক্ষ্য ছিল তুরস্ক-ভারত সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করার সূচনা করা। দুই দেশই উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি। রাজনৈতিকভাবে শীতল সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও দুই দেশ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ করছিল। মুসলিম বিশ্ব ও পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং ইসরাইলের সঙ্গে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির গভীরতর সম্পর্ক নিয়ে অস্বস্তি থাকা সত্ত্বেও দুই দেশ সম্পর্ক উন্নয়নে এগিয়ে আসে।
একাধিক সূত্রের মতে, সম্মেলনটি এতটাই সফল হয়েছিল যে, পাকিস্তানি কর্মকর্তারা এতে অসন্তুষ্ট ছিলেন, কারণ তাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করা হয়নি।
এরপর, কয়েক মাসের মধ্যেই সবকিছু বদলে গেল। এপ্রিলে কাশ্মীরে মন্ত্রাসী হামলার ঘটনা পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায় এবং তুরস্ককে একটি পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য করে।
ভারতের অপারেশন সিন্ধুরের বিরুদ্ধে আঙ্কারা যখন মৌখিকভাবে পাকিস্তানকে সমর্থন জানায়, তখন ভারতে উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে। ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো তুরস্ককে শত্রু হিসেবে চিত্রিত করতে করে এবং ইসলামাবাদে সামরিক সরঞ্জাম ও অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর অভিযোগ তোলে।
তুর্কি কর্মকর্তারা দাবি করেন যে, তারা পাকিস্তানকে কোনো অতিরিক্ত সহায়তা পাঠাননি। তাদের যুক্তি হলো, দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক সুপ্রতিষ্ঠিত। দুই দেশ কয়েক দশক ধরে সামরিক অংশীদারিত্ব বজায় রেখেছে এবং একে অপরকে কৌশলগত মিত্র হিসেবে বিবেচনা করে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একজন তুর্কি কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘বন্দর পরিদর্শন এবং কার্গো ফ্লাইটের মতো নিয়মিত কার্যক্রমগুলোকে অতিরিক্ত বা নতুন সরবরাহ হিসেবে ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে।’
আলোচনাই শ্রেয়
ভারতীয় গণমাধ্যম তুরস্কের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে থাকায় পর্যটন বয়কট শুরু হয় এবং তুরস্কের বাণিজ্যিক স্বার্থ চাপের মুখে পড়ে।
জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে তুর্কি সংস্থা চেলেবি এয়ারপোর্ট সার্ভিসেস ইন্ডিয়ার নিরাপত্তা ছাড়পত্র বাতিল করে দেয় ভারত। এই প্রতিষ্ঠানটি দিল্লি, মুম্বাই এবং বেঙ্গালুরুসহ নয়টি বিমানবন্দরে কার্যক্রম পরিচালনা করত। এরপর এয়ার ইন্ডিয়া তাদের ওয়াইড-বডি বিমানের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তুর্কি টেকনিকের ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করে।
দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক প্রায় এক বছর ধরে কার্যত স্থবির ছিল। এরপর ভারতে কিছুটা পরিবর্তন আসে। গত মাসে, ভারত অপ্রত্যাশিতভাবে তুরস্ককে ১২তম দ্বিপক্ষীয় আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। আলোচনার জন্য দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেরিস একিনচিকে পাঠায় তুরস্ক। তিনি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব সিবি জর্জের সঙ্গে যৌথভাবে বৈঠকের সভাপতিত্ব করেন।
তুর্কি কর্মকর্তারা মিডল ইস্ট আইকে জানিয়েছেন যে ফলপ্রসু হয়েছে এবং উভয় পক্ষই সুস্থ সংলাপ বজায় রাখতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
একজন ভারতীয় কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি, কথা না বলে মতবিরোধ ও ভুল বোঝাবুঝি আরো গভীর করার চেয়ে সংলাপ শ্রেয়।’
ভারতীয় সংসদ সদস্যদের উস্কানিমূলক মন্তব্য কিংবা বিমান ও পর্যটন খাতের বিরুদ্ধে সরকারের শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কোনো জবাব দেয়নি তুরস্ক। তাদের এই অবস্থান আলোচনার পথ প্রশস্ত করতে সাহায্য করেছে।
তুর্কি কর্মকর্তা বলেন, ‘পরিস্থিতি শান্ত করার জন্যই আমরা কোনো জবাব না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।’
তুর্কি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পর্যটন বয়কটের কারণে ২০২৫ সালে তুরস্কে ভ্রমণকারী ভারতীয় পর্যটকদের সংখ্যা তিন লাখ ৩০ হাজার থেকে কমে দুই লাখ ৫০ হাজারে দাঁড়ায়।
তবে ভারতীয় কর্মকর্তারা বিশ্বাস করেন যে উত্তেজনা কমে যাওয়ায় এই বছর সংখ্যা আবার বাড়বে।
করিডোর ও কাশ্মীর
ভারতীয় কর্মকর্তারা বলছেন, কূটনৈতিক সংকট সত্ত্বেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ছিল। তুরস্কের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ৯ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বাণিজ্য এখনো মূলত ভারতের অনুকূলেই রয়েছে। আঙ্কারা ভারত থেকে ৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করে। সম্পর্ক মেরামতের অন্যতম কারণ হিসেবে এই বাণিজ্যকে দেখা হচ্ছে।
আঙ্কারার সূত্রমতে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধ এবং ফেব্রুয়ারির শেষভাগ থেকে হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনার পর ভারত আরো গুরুত্বের সঙ্গে তার বিকল্পগুলো খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে।
২০২৩ সালে ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক করিডোরের জন্য একটি রূপরেখা উপস্থাপন করে, যা সমুদ্রপথে সংযুক্ত আরব আমিরাত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে সৌদি আরব, জর্ডান এবং ইসরাইলের মধ্য দিয়ে স্থলপথে অগ্রসর হবে। আঙ্কারা এই প্রকল্পটিকে তুরস্ককে কোণঠাসা করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখে এবং এর পরিবর্তে একটি প্রতিদ্বন্দ্বী ইরাকি প্রস্তাবকে সমর্থন করে।
২০২৩ সাল থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্ক ক্রমশ তিক্ত হওয়ায় প্রকল্পটি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
গাজায় যুদ্ধ এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে ইসরাইল ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ চুক্তিটিও স্থগিত হয়ে গেছে।
একই সময়ে, তুরস্ক নিজেকে মিডল করিডোরের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা আজারবাইজান, জর্জিয়া এবং আর্মেনিয়ার মধ্য দিয়ে পূর্ব এশিয়াকে ইউরোপের সাথে সংযুক্ত করে।
ভারতীয় কর্মকর্তারা মিডল ইস্ট আইকে জানিয়েছেন যে, তারা মিডল করিডোরসহ নতুন সংযোগ প্রকল্পে আগ্রহী, কারণ তারা একটিমাত্র করিডোরের ওপর নির্ভর করতে চান না।
ভারতের জন্য একটি মৌলিক বিষয় হলো কাশ্মীর। তুরস্ক মনে করে ভারত অন্যায়ভাবে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলটি নিয়ন্ত্রণ করে এবং কাশ্মীরিদের গণভোটের মাধ্যমে তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার দেওয়া উচিত।
তুরস্ক সাধারণত প্রতিটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানকে সমর্থন জানায়। তা সত্ত্বেও এরদোয়ান ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া তার ভাষণে এই বিষয়টি উল্লেখ করেননি, যা ছিল ভারতের প্রতি সৌজন্যতার ইঙ্গিত।
তবে গত বছরের সংকটের পর তার ভাষণে বিষয়টি আবার ফিরে আসে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে তিনি বলেন, ‘আমরা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবনা এবং আমাদের কাশ্মীরি ভাই-বোনদের প্রত্যাশার ভিত্তিতে সংলাপের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধানকে সমর্থন করি।’
ভারতীয় কর্মকর্তারা যুক্তি দেন যে, তুরস্ক যদি এই বিষয়ে তার প্রকাশ্য অবস্থান নরম করে এবং আরো সূক্ষ্ম ও কূটনৈতিক পন্থা অবলম্বন করে, তাহলে তা সম্পর্ককে আরো দৃঢ় করতে সাহায্য করবে।
আরএ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



ইরানের জবাবের অপেক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র, কী বলছে তেহরান
হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত জাহাজে থাকা মার্কিন নাগরিকদের সরিয়ে নিতে উদ্যোগ