যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইসরাইলে অস্ত্র পাঠানোর ওপর আংশিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য কংগ্রেস সদস্য ডেলিয়া রামিরেজ যখন প্রথম ‘ব্লক দ্য বোম্বস অ্যাক্ট’ বিলটি ঘোষণা করেছিলেন, তখন মাত্র ২১ জন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা তার সাথে এই পদক্ষেপে যোগ দিয়েছিলেন।
সেটি ছিল ২০২৫ সালের জুন মাসের ঘটনা। এর এক বছর পর, এই আইনি প্রস্তাবে এখন ৭৩ জন সহ-পৃষ্ঠপোষক রয়েছেন, যা ফিলিস্তিনি অধিকার সমর্থকদের মতে একটি ‘ঐতিহাসিক’ অগ্রগতি।
গত বৃহস্পতিবার ক্যাপিটল হিলে এক সংবাদ সম্মেলনে রামিরেজ বলেন, ‘অনেকে এই বিলটিকে চরমপন্থি মনে করলেও এটি আসলে বেশ মূলধারার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।’
ইসরাইলে অস্ত্র সরবরাহে সীমাবদ্ধতা আনার এই বিলটিতে ৭৩ জন সদস্যের সমর্থন কংগ্রেসে গত কয়েক দশক ধরে ইসরাইলের ভোগ করা প্রায় সর্বসম্মত দ্বিপক্ষীয় সমর্থনে একটি বড় ফাটল তৈরি করেছে। তবে এই সংখ্যাটি ৪৩৫ সদস্যের প্রতিনিধি পরিষদে (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছিও নয়।
ইনস্টিটিউট ফর মিডল ইস্ট আন্ডারস্ট্যান্ডিং (আইএমইইউ)-এর নির্বাহী পরিচালক মার্গারেট ডিরিয়াস এই ধরনের বিলের অগ্রগতি চিহ্নিত করার ওপর জোর দিয়ে বলেন, ইসরাইলকে শর্তহীন সহায়তা প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে আরো বেশি আইনপ্রণেতার উচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারের পক্ষে দাঁড়ানো।
তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা এমন একটি ঘাটতি থেকে আসছি, যেখানে কংগ্রেসের সঠিক কাজটি করার সাহসের এত অভাব ছিল যে, এটি আসলে আমাদের আগের অবস্থানের চেয়ে একটি বিশাল উন্নতি। তবে স্পষ্টতই এখনও একটি দীর্ঘ, দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া বাকি।’
কংগ্রেসের বড় অংশ এখনও ইসরাইলপন্থি হলেও সমর্থকেরা এর সদস্যদের মার্কিন জনগণের পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটানোর আহ্বান জানিয়েছেন। একাধিক জরিপে দেখা গেছে, ইসরাইল দ্রুত সমর্থন হারাচ্ছে।
ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স-এর সাম্প্রতিক এক জরিপে মাত্র ১৬ শতাংশ উত্তরদাতা একমত হয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত কোনো নতুন নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই ইসরাইলকে অস্ত্র সরবরাহ বজায় রাখা।
‘আমেরিকানরা দেশের অভ্যন্তরে বিনিয়োগ চায়’
বৃহস্পতিবার রামিরেজ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইসরাইলের একাধিক সামরিক অভিযানের কথা উল্লেখ করে প্রতিনিধি পরিষদের ফ্লোরে তার বিলটি ভোটের জন্য আনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তবে এখন পর্যন্ত হাউসের রিপাবলিকান নেতৃত্বের কারণে বিলটি আটকে রয়েছে।
এই কংগ্রেস সদস্য ইরানের যুদ্ধ, লেবাননে ইসরাইলের আক্রমণ এবং গাজায় ক্রমবর্ধমান মৃত্যুর সংখ্যার পেছনে ভূমিকার জন্য ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচনা করেন, যেখানে একটি যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও ইসরাইল মারাত্মক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
রামিরেজ বলেন, ‘ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু যুদ্ধ বাড়াতে থাকবেন, যাতে তারা ক্ষমতা সুসংহত করতে পারেন, অফিসে টিকে থাকতে পারেন এবং আমাদের কষ্ট থেকে ফায়দা লুটতে পারেন।’
কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালাইবও জোর দিয়ে বলেন, ওয়াশিংটনের ইসরাইলকে সমর্থন করা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এখন আর কোনো ট্যাবু বা নিষিদ্ধ বিষয় নয়, যা ইসরাইলি নির্যাতনের বিষয়ে জনসাধারণের বর্ধিত সচেতনতাকে প্রকাশ করে।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমেরিকানরা চায় আমরা যেন দেশের অভ্যন্তরে বিনিয়োগ করি। তারা চায় না আমরা মৃত্যু, ধ্বংস আর বোমার পেছনে বিনিয়োগ করি। তারা চায় আমরা বিশুদ্ধ পানি, আবাসন, শিশু যত্ন এবং আরো অনেক কিছুতে বিনিয়োগ করি। অনেকেই ডাক্তারের কাছে যাওয়ার খরচ জোগাতে পারেন না, অথচ আমরা মুহূর্তের মধ্যে ইসরাইল সরকারকে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর বোমা মারার জন্য অর্থ খুঁজে পাই।.
ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এই কংগ্রেস সদস্য বিলটির প্রতি সমর্থন বৃদ্ধির জন্য সাধারণ নাগরিকদের কৃতিত্ব দিয়ে বলেন, পরিবর্তন কংগ্রেস থেকে নয়, বরং জনগণের কাছ থেকে আসবে।
নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য একটি খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে তালাইব বলেন, ‘সাধারণ নাগরিকেরা, যারা আমার ধর্ম বা জাতিগত পরিচয়ের অংশ নন, তারা টাউন হলগুলোতে এসে বলছেন, আপনারা কেন স্ন্যাপ কর্মসূচি কাটছাঁট করছেন এবং কেন গাজাকে ক্ষুধার্ত রাখছেন? আপনারা তাদের এসে বলতে শুনবেন, কেন আমরা গণহত্যায় অর্থায়ন করছি, কিন্তু দেশের চিকিৎসায় করছি না?’
বিলের ভেতরে যা আছে
‘ব্লক দ্য বোম্বস অ্যাক্ট’ বিলটি গাজায় ইসরাইলের চালানো যুদ্ধকালীন কিছু মারাত্মক হামলায় ব্যবহৃত নির্দিষ্ট কিছু ভারী বোমা এবং আর্টিলারি গোলাবারুদ ইসরাইলে স্থানান্তর নিষিদ্ধ করবে।
কংগ্রেসে প্রগতিশীল এবং ইসরাইলের সোচ্চার সমালোচকদের প্রাথমিক সমর্থনের মাধ্যমে বিলটি শুরু হয়েছিল। কিন্তু গাজা এবং পুরো অঞ্চলজুড়ে ইসরাইলের নৃশংসতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ যত জোরালো হয়েছে, কিছু অপ্রত্যাশিত নামও এই সহ-পৃষ্ঠপোষকদের তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
কংগ্রেস সদস্য ভ্যালেরি ফুশি, যিনি ২০২২ সালে আমেরিকান ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (এআইপিএসি)-সহ ইসরাইলপন্থি গোষ্ঠীগুলোর সমর্থনে কংগ্রেসে নির্বাচিত হয়েছিলেন, তিনিও গত বছর এই বিলটি সহ-পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। ২০২৫ সালের আগস্টে ফুশি বলেছিলেন, ‘গাজায় বেসামরিক নাগরিকদের সর্বোচ্চ সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যখন অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে না, তখন আমরা কেবল ইসরাইল সরকারকে অস্ত্র সরবরাহ বজায় রাখতে পারি না।’
গত মে মাসে এআইপিএসি টেক্সাসের এক প্রাথমিক নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রতিদ্বন্দ্বী আল গ্রিনকে পরাজিত করার জন্য কংগ্রেস সদস্য ক্রিশ্চিয়ান মেনিফিকে অভিনন্দন জানায়। মেনিফি গত মঙ্গলবার ‘ব্লক দ্য বোম্বস অ্যাক্ট’-এর সর্বশেষ সহ-পৃষ্ঠপোষক হয়েছেন।
রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য থমাস ম্যাসি, যিনি ট্রাম্প এবং ইসরাইলপন্থি গোষ্ঠীগুলোর সমর্থিত এক প্রার্থীর কাছে নিজের প্রাইমারি নির্বাচনে হেরেছিলেন, তিনিও চলতি সপ্তাহে এই প্রস্তাবে নিজের নাম যুক্ত করেছেন, যা বিলটিকে দ্বিপক্ষীয় রূপ দিয়েছে।
ম্যাসি বলেন, ‘আমেরিকার সরবরাহ করা গোলাবারুদ ব্যবহার করে ইসরাইল হাজার হাজার নিরীহ বেসামরিক মানুষকে হত্যা করেছে। গাজা এবং এর জনগণের ওপর ইসরাইলের ধ্বংসলীলায় সমর্থন বন্ধ করতে আমেরিকা নৈতিকভাবে বাধ্য। ইসরাইলে আক্রমণাত্মক অস্ত্রের স্থানান্তর সীমিত করতে আমি ‘ব্লক দ্য বোম্বস অ্যাক্ট’ সহ-পৃষ্ঠপোষকতা করছি।’
কংগ্রেসের পরিবর্তন
কংগ্রেসনাল প্রোগ্রেসিভ ককাসও এই বিলটিকে অনুমোদন দিয়েছে। বৃহস্পতিবার এর চেয়ারম্যান গ্রেগ ক্যাসার বলেন, ক্রমবর্ধমান এই সমর্থন প্রমাণ করে যে সোচ্চার হওয়া, পদযাত্রা করা এবং আইনপ্রণেতাদের সাথে যোগাযোগ করা পরিবর্তন আনতে পারে।
ক্যাসার বলেন, ‘আমাদের জীবন বাঁচাতে হলে স্পষ্টভাবেই রিপাবলিকান পার্টির মোকাবিলা করতে হবে, পাশাপাশি ডেমোক্র্যাট পার্টি হিসেবে আমরা কারা, তাও পরিবর্তন করতে হবে। ‘ব্লক দ্য বোম্বস অ্যাক্ট’-এর পেছনের ধারণাটি সহজ, আমাদের জীবনকালের অন্যতম নিকৃষ্ট বিপর্যয় বজায় রাখতে ব্যবহার করা হবে জানা সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচিত নয় এমন বোমা সরবরাহ করা।’
আইনপ্রণেতারা জোর দিয়ে বলেছেন, যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গাজায় মানবিক সংকট রয়ে গেছে এবং ইসরাইল এখনও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মানবিক সহায়তা সীমিত করছে। কংগ্রেস সদস্য লতিফা সাইমন বলেন, এই বিলটিকে সমর্থন করা কোনো দলীয় বিষয় হওয়া উচিত নয়।
তিনি বলেন, ‘লাল বা নীল দল হিসেবে নয়, বরং আমেরিকান হিসেবে আমাদের স্পষ্ট হওয়া উচিত যে-বোমার চেয়ে পেট ভরানো এবং মানবিক সহায়তাকে আমাদের প্রাধান্য দেওয়া উচিত, বিশেষ করে যখন আপনার কাছে লাখ লাখ শিশু, নারী ও বয়োবৃদ্ধ মানুষ ক্ষুধার্ত এবং নোংরা পরিবেশে বাস করছে। আমরা সেই মানবিক সংকটে অর্থায়ন করছি। আমার কেবল একটি বাক্যই বলার আছে ব্লক দ্য বোম্বস।’
‘ব্লক দ্য বোম্বস অ্যাক্ট’-এর এক বছর পূর্তি এমন এক সময়ে এলো যখন মার্কিন-ইসরাইল সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলা অন্যান্য আইনি প্রস্তাবগুলোও গতি পেয়েছে। গত বুধবার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধের বিরুদ্ধে এক ধরনের তিরস্কার হিসেবে, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ইরানের ওপর আক্রমণ করার ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত করতে হাউসে একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে। এছাড়া গত এপ্রিলে ১০০ জন সিনেটরের মধ্যে ৪০ জন (যার মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল) ইসরাইলে সামরিক বুলডোজার স্থানান্তর বন্ধ করার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন।
অ্যাডভোকেসি গ্রুপ ‘জেউইশ ভয়েস ফর পিস (জেভিপি) অ্যাকশন’-এর রাজনৈতিক পরিচালক বেথ মিলার বলেন, ‘ব্লক দ্য বোম্বস অ্যাক্ট’-এর প্রতি এই বর্ধিত সমর্থন যুক্তরাষ্ট্রে ফিলিস্তিনি অধিকার আন্দোলনের সক্রিয়তার কারণে চালিত হচ্ছে।
তবে তিনি উল্লেখ করেন, সহ-পৃষ্ঠপোষকদের এই সংখ্যাটি এখনও ভয়াবহভাবে কম।
মিলার বলেন, ‘এটি আমাদের কতদূর যেতে হবে তারই একটি লক্ষণ যে কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য এখনও গণহত্যা চালানো একটি দেশে বোমা পাঠাতে চান। আর সেজন্যই আমরা সবাই সোচ্চার হওয়া বজায় রাখব। এখন পুরো কংগ্রেসের পদক্ষেপ নেওয়ার সময়। এখনই সময় বোমা বন্ধ করার।’
সূত্র: আল-জাজিরা
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


