আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

স্ক্রল.ইনের বিশ্লেষণ

ভারতে ‘ভালো মুসলিম’ হওয়ার বোঝা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ভারতে ‘ভালো মুসলিম’ হওয়ার বোঝা
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে মুসলিম নাগরিকদের হেনস্তা ও নির্যাতনের মাত্রা। সেখানকার মুসলামানদের প্রায়শই বলা হয়, ভারতে থাকতে হলে তাদের ব্যতিক্রম হতে হবে। সেই ব্যতিক্রম অর্জন বা অবদানের ক্ষেত্রে নয়; বরং রাজনৈতিক নীরবতার ক্ষেত্রে। নীরবতার মধ্য দিয়ে তাদের বারবার প্রমাণ করতে হবে, তারা বিশ্বের অন্য মুসলিমদের চেয়ে আলাদা। দেশের কাছে তাদের দাবিদাওয়া কম হবে, তারা সর্বক্ষেত্রে কম দৃশ্যমান হবে, রাষ্ট্রের প্রতি তাদের অধিকার থাকবে কম।

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ভারতীয় মুসলমানরা গণতান্ত্রিক জীবন, নির্বাচনি রাজনীতি এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় উৎসাহের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছে। কিন্তু বর্তমানে একটি সূক্ষ্ম ও ক্ষয়িষ্ণু প্রক্রিয়া সামনে চলে আসছে। ভারতীয় মুসলমানদের জন্য বৈধভাবে রাজনৈতিক মতামত প্রকাশের সুযোগ ক্রমেই সংকীর্ণ হচ্ছে। মুসলামদের নিরাপদ জীবনযাত্রার জন্য শুধু আইন মেনে চলাই বাধ্যবাধকতা নয়; বরং রাজনৈতিকভাবেও তাদের নীরব থাকতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে ধারণা তৈরি হচ্ছে, রাজনৈতিকভাবে মুসলমানদের কণ্ঠস্বর কখনোই বলিষ্ঠ হতে পারবে না।

বিজ্ঞাপন

একসময় ধারণা দেওয়া হতো, ভারতীয় মুসলমানরা সাংস্কৃতিকভাবে পরিমার্জিত হলেও রাজনৈতিকভাবে সন্দেহভাজন। আধ্যাত্মিকভাবে সমৃদ্ধ কিন্তু নাগরিকভাবে শর্তাধীন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে তাদের। আক্রমণাত্মক সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনীতির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে এমনকি এই সীমিত এবং শর্তাধীন গ্রহণযোগ্যতাও ভেঙে পড়তে শুরু করেছে।

ভারতীয় মুসলিম ‘ব্যতিক্রমবাদের’ শিকড় স্বাধীনতা ও দেশভাগের পর থেকে শুরু। ১৯৪৭ সালের সহিংসতা কেবল সীমানা পুনর্নির্মাণ করেনি, এটি প্রত্যাশাকে আরো কঠিন করে তুলেছিল। ভারতে থাকা মুসলমানদের সম্পর্কে ধারণা করা হয়েছিল, থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তারা দেশের প্রতি আনুগত্যের প্রমাণ দিয়েছেন।

দেশভাগ-পরবর্তী এ কাঠামো তুলে ধরেছেন ইতিহাসবিদ মুশিরুল হাসান। তিনি দেখিয়েছেন, থেকে যাওয়া ভারতীয় মুসলমানরা কীভাবে নৈতিকভাবে চলে যাওয়াদের থেকে আলাদা ছিলেন। কেবল নাগরিক হিসেবে নয়; বরং বাসিন্দা হিসেবে তাদের অধিকারের চেয়ে আচরণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সংবিধান তাদের সমতা দিলেও সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবন তাদের ওপর অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়েছিল।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আবার সমান্তরাল এক বয়ান সামনে এসেছে। বলা হচ্ছে, ‘ভালো মুসলিম’ হচ্ছেন নগরমুখী, সমন্বিত, স্মৃতিকাতর; যারা রাষ্ট্রের ওপর রাজনৈতিক দাবির চেয়ে ইন্দো-পারসিক ঐতিহ্যের রক্ষক।

রাজনৈতিক তাত্ত্বিক মাহমুদ মামদানি তার ‘গুড মুসলিম, ব্যাড মুসলিম’ বইয়ে যুক্তি দিয়েছেন, আধুনিক ক্ষমতা প্রায়শই মুসলমানদের বিভক্ত করে দেয়। এদের মধ্যে অরাজনৈতিক ব্যক্তিরা গ্রহণযোগ্য এবং নিজস্ব দাবিদাওয়ার ভিত্তিতে আওয়াজ তোলা ব্যক্তিরা সন্দেহভাজন।

রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হিলাল আহমেদ দেখিয়েছেন, ভারতে মুসলমানদের স্বাভাবিক নাগরিক না দেখে দেশের জন্য সমস্যা বা বোঝা হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজনীতিতে তাদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আসার বদলে তাদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হয়। মুসলমানদের রাজনীতিকে স্বার্থের ভিত্তিতে অংশগ্রহণের পরিবর্ততে ব্যাখ্যাতীত অসংগতি হিসেবে বেশি বিবেচনা করা হয়।

এ ধরনের ফ্রেমিংয়ের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। যখন মুসলমানরা কোনো দাবিতে সংঘবদ্ধ হন, সংবিধানের আলোকে তা কমই বিবেচনা করা হয়। এর বদলে তাদের উদ্দেশ্য ও আনগুত্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলা হয়। স্বাভাবিক আন্দোলন, বিক্ষোভ ও সমাবেশকে মুসলমানদের ক্ষেত্রে ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করা হয়।

শুধু আইন বা নীতি দিয়েই মুসলমানদের জন্য ‘ব্যতিক্রমবাদ’ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে না, গণমাধ্যমের মধ্য দিয়েও তা স্বাভাবিক করার চেষ্টা হচ্ছে।

মুসলমানরা যখন কোথাও ভুক্তভোগী হন, তাদের ‘সংখ্যালঘু’ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। তারা যখন সংঘবদ্ধ হন, তখন তাদের ‘সাম্প্রদায়িক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যখন তারা বিক্ষোভ করেন, তাদের ‘ক্রুদ্ধ’, ‘মৌলবাদী’ বা ‘উসকানিদাতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। আর যখন তারা চুপ থাকেন, তাদের ‘সহনশীল’, ‘বিচক্ষণ’ বা ‘ঐক্যপন্থি’ হিসেবে প্রশংসা করা হয়।

বর্তমানে এ ধরনের ধারণার প্রচার আর সূক্ষ্ম নেই। বরং তা ক্রমেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে। মুসলমানদের ক্ষেত্রে পারিবারিক আইন, নাগরিকত্ব, প্রার্থনাস্থানের অধিকার, ধর্মীয় শিক্ষা ও দাতব্য সংস্থাসংক্রান্ত যাবতীয় আইনি সংস্কারকে নিরপেক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আইনি ও সাংবিধানিকভাবে যৌক্তিক অবস্থান থেকে মুসলমানরা বিরোধিতা করলেও তাকে ‘আবেগি ও পশ্চাদগামী মনোভাব’ বলে প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। মুসলমানদের এ ধরনের সংস্কার গ্রহণ করে নিতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...