ভারতে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায়ও কেলেঙ্কারি, ক্ষোভে ফুঁসছে তরুণ প্রজন্ম

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

ভারতে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায়ও কেলেঙ্কারি, ক্ষোভে ফুঁসছে তরুণ প্রজন্ম
ছবি: ফিনান্সিয়াল টাইমস

মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় পাস করার পর উচ্ছ্বসিত ছিলেন ১৯ বছর বয়সি মনিশ কুমার। কিন্তু এর দুই সপ্তাহের মাথায় ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকার পরীক্ষা বাতিল করতে বাধ্য হয়। কারণ, পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে গিয়েছিল। ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় কোটা শহরের একটি কোচিং সেন্টারে গত তিন বছর ধরে দৈনিক ১২ ঘণ্টা পড়াশোনা করা মনিশ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার স্বপ্ন এত কাছে চলে এসেছিল। কোটি কোটি শিক্ষার্থীর এই উচ্চপর্যায়ের পরীক্ষায় এমনটা কীভাবে ঘটতে পারে?’

মনিশের মতো লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও তরুণ এখন ক্ষোভে ফুঁসছেন। ভারতের অন্যতম বড় এই মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষায় এবার ১ লাখ ৩০ হাজার আসনের বিপরীতে ২২ লাখেরও বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিলেন। এই প্রশ্ন ফাঁসের কেলেঙ্কারি ভারতের তরুণদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে, যারা ইতোমধ্যেই উচ্চ বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

এই অসন্তোষের জেরে অনলাইনে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামে একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণামূলক ক্যাম্পেইন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এর প্রতিষ্ঠাতা বস্টনপ্রবাসী অভিজিৎ দিপকের ডাকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে গণবিক্ষোভ করেছে শিক্ষার্থীরা।

দিপকে বলেন, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার এই বিপর্যয় এবং একের পর এক প্রশ্ন ফাঁস ও মূল্যায়নগত ভুল সরকারের চরম অক্ষমতারই প্রমাণ।

ভারতের ১৪০ কোটি জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই ৩০ বছরের কম বয়সি, যা বিশ্বের বৃহত্তম তরুণ জনগোষ্ঠী। বেঙ্গালুরুর আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের গত মার্চের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটিতে ১৫-২৫ বছর বয়সি গ্র্যাজুয়েটদের প্রায় ৪০ শতাংশ এবং ২৫-২৯ বছর বয়সিদের ২০ শতাংশই বেকার। এই উচ্চ বেকারত্বের কারণে অনেক তরুণ ও তাদের পরিবার সরকারি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাকেই অর্থনৈতিক মুক্তি ও নিরাপত্তার একমাত্র উপায় হিসেবে দেখেন। আর এ কারণেই প্রতিবছর ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ২ লাখ শিক্ষার্থী রাজস্থানের কোটা শহরে পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য আসেন।

পরীক্ষা বাতিলের পর বিহারের বাসিন্দা মনিশ কুমার পুনরায় ২১ জুনের নতুন পরীক্ষায় অংশ নিতে ৩৬ ঘণ্টার ট্রেন জার্নি করে আবার কোটায় ফিরে এসেছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করতে তিনিও ‘ককরোচ জনতা পার্টি’তে যোগ দিয়েছেন।

নতুন গঠিত এই রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক দল ‘সিজেপি’র তীব্র সমালোচনা করেছেন মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সদস্যরা। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’ (ককরোচ) বলে সম্বোধন করার ঘটনা থেকে এই দলের নামকরণ করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেণ রিজিজু অভিযোগ করেছেন, দলটির ২ কোটি ২০ লাখ ফলোয়ার মূলত চিরশত্রু পাকিস্তান এবং ‘ভারতবিরোধী গ্যাং’ থেকে আসা, যদিও দিপকে এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন।

এদিকে পোলস্টার ‘সিভোটার’-এর সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ১৮-৩৪ বছর বয়সিদের ৭৫ শতাংশেরও বেশি মানুষ শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ চান।

তবে এক লিখিত জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকার এই প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে নিয়েছে এবং সৎ ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষার্থেই পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগামী ২১ জুনের পুনর্বার পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পরিবহনের জন্য সরকার বিমানবাহিনী মোতায়েনের কথাও বিবেচনা করছে।

ভারতে পাবলিক পরীক্ষা নিয়ে বিতর্ক এবারই প্রথম নয়। ১৯৬১ সালে প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু সতর্ক করেছিলেন যে পরীক্ষার মান কঠোর ও উন্নত না করলে দেশ পিছিয়ে পড়বে।

সম্প্রতি নেটফ্লিক্সে জনপ্রিয় হওয়া ‘কোটা ফ্যাক্টরি’ সিরিজেও শিক্ষার্থীদের এই মানসিক চাপের চিত্র উঠে এসেছে। সরকারি চাকরি বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তির এই তীব্র প্রতিযোগিতার চাপ সহ্য করতে না পেরে অনেক শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথও বেছে নেন। কোটার একটি ছাত্রাবাসের ওয়ার্ডেন জানান, ফাঁসি রোধে তারা সিলিং ফ্যানে বিশেষ ডিভাইস এবং বারান্দায় সেফটি নেট লাগিয়েছেন।

কোটার অন্যতম বড় কোচিং সেন্টার ‘অ্যালেন ক্যারিয়ার ইনস্টিটিউট’-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট বিজয় সোনি বলেন, শিক্ষার্থীরা চাপ সামলাতে পারলেও প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় তাদের মনোবল ভেঙে গেছে।

উত্তর প্রদেশ থেকে ৮০০ কিলোমিটার ট্রেন জার্নি করে নিজের ১৭ বছর বয়সি মেয়েকে কোটায় ভর্তি করাতে আসা উমেশ চন্দ্র বলেন, ‘এখানে না আসলে আমাদের সন্তানদের কোনো সুযোগ নেই। এখন প্রশ্ন ফাঁস হয়ে গেল, আমরা কী করব? আমাদের সব সঞ্চয় শেষ। সরকারের কি একটি নিখুঁত পরীক্ষা ব্যবস্থার নিশ্চয়তা দেওয়া উচিত ছিল না?’

দুই বছর আগে পরীক্ষা সংস্কার কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মহাকাশ বিজ্ঞানী কোপিলিল রাধাকৃষ্ণান অবশ্য শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের বিরোধিতা করে বলেন, পরীক্ষা ব্যবস্থা সুরক্ষায় নেওয়া পদক্ষেপগুলো চমৎকার কাজ করছে।

তিনি আরো বলেন, ‘পরীক্ষা নেওয়া কোনো রকেট সায়েন্স নয়, তবে যখন ২০ থেকে ২৫ লাখ তরুণের ভবিষ্যৎ এর সঙ্গে জড়িত থাকে, তখন ঝুঁকি অনেক বেশি। ২১ জুনের পরীক্ষাটি পরীক্ষার্থীদের জন্য পুনর্বার পরীক্ষা হলেও, যারা পরীক্ষা নিচ্ছেন তাদের জন্য এটি একটি আসল পরীক্ষা।’

সূত্র: ফিনান্সিয়াল টাইমস

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন