আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ইরান আগ্রাসনে অসন্তোষের মুখে যুক্তরাষ্ট্র

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরান আগ্রাসনে অসন্তোষের মুখে যুক্তরাষ্ট্র

প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও জেরাল্ড ফোর্ড প্রশাসনের সবচেয়ে ক্ষমতাধর পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন হেনরি আলফ্রেড কিসিঞ্জার। ১৯৬৮ সালে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের শাসনামলে তার একটি বিখ্যাত উক্তি ছিল, ‘আমেরিকার শত্রু হওয়া বিপজ্জনক, কিন্তু বন্ধু হওয়া আরো মারাত্মক।’ তার এই উক্তি এ সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোড়ন তুলেছে। এর কারণ হলো ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা নতুন যুদ্ধটি কিসিঞ্জারের মন্তব্যকে শুধু সামনেই আনেনি, তার উক্তিটি যে কতটা সত্য, তা আবারও প্রমাণ করেছে। আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ যেমন মিত্রদের ধ্বংস করতে পারে, তেমনি শত্রুদেরও। এই যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট দুর্ভোগ শুধু যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইরানই ভোগ করছে না; বরং তা সমগ্র অঞ্চল, এমনকি বিশ্বজুড়ে বিস্তার লাভ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের উসকানিতে বিভিন্ন সময়ে মধ্যপ্রাচ্য সংকটে হতাহত হয়েছে হাজার হাজার মানুষ। এর প্রধান শিকার ইরান ও লেবানন। দেশ দুটি এবারও ইসরাইলি আগ্রাসনের কবলে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের কারণে অতীতের মতো বর্তমানেও ভুক্তভোগী হয়েছে সৌদি আরব, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।

আঞ্চলিক মানবিক ক্ষতির বাইরেও এই যুদ্ধ তেল ও গ্যাসের দামকে আকাশচুম্বী করে বিশ্বঅর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করছে। ১১ মার্চ দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, এই যুদ্ধ বিশ্বঅর্থনীতির ওপর এক মারাত্মক আঘাত হেনেছে, যা ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার পতন, ইউক্রেনের যুদ্ধ এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশৃঙ্খল নীতি প্রণয়নের কারণে বিপর্যস্ত। এ যুদ্ধের ফলে বিশ্বে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, উচ্চ সুদহার এবং সম্ভবত ক্ষুধার প্রকোপও দেখা যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন

এ বিপর্যয়ের জন্য সরাসরি দায়ী করা হচ্ছে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু সরকারকে, যারা এমন এক শত্রুর বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে এই যুদ্ধ শুরু করেছেÑযার কোনো আসন্ন হুমকি ছিল না। প্রায় দুই সপ্তাহের সংঘাতের পরও ট্রাম্প তার আক্রমণের কোনো বিশ্বাসযোগ্য যুক্তি বা একটি সম্ভাব্য লক্ষ্যও দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের বাকিদেরও ঠিক একই অবস্থা। ১১ মার্চ সিএনএন জানিয়েছে, যুদ্ধের অন্যতম সম্ভাব্য পরিণতির জন্যও যুক্তরাষ্ট্রের কোনো পরিকল্পনা ছিল না। চলমান অভিযানটির পরিকল্পনা করার সময় হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার বিষয়ে ইরানকে একেবারেই আমলে নেয়নি পেন্টাগন ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ। যার ফল এখন ভোগ করছে যুক্তরাষ্ট্রসহ গোটা বিশ্ব।

অন্যান্য আঞ্চলিক সরকারগুলো, বিশেষ করে উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো এই যুদ্ধ চায়নি; কিন্তু এর জন্য বিশাল মূল্য দিতে হচ্ছে তাদের। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাম্রাজ্যবাদী খেলার আনুষঙ্গিক ক্ষতি হিসেবে নিজেদের দেখার পেছনে তাদের যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। ইসরাইলি সংবাদপত্র হারেৎজে আরব উপসাগরীয় রাষ্ট্র ইনস্টিটিউটের আবাসিক গবেষক হুসেইন ইবিশ উল্লেখ করেছেন, ওয়াশিংটনের মধ্যেও এক সুস্পষ্ট হতাশা রয়েছে, যারা ইসরাইলের সতর্কবার্তা সত্ত্বেও তাদের সঙ্গে মিলে যুদ্ধ শুরু করেছে।

সম্প্রতি ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি যুক্তরাষ্ট্রের এ অভিযানের প্রতি বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ওয়াশিংটন শুধু ইরানকে দুর্বল করতে চায় না, বরং এ অঞ্চলটিকে নতুন রূপ দিতে চায়। একইসঙ্গে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠন প্রতিরোধ করতে এবং যারা এই প্রকল্পকে সমর্থন করে, তাদেরও দুর্বল করতে চায়। তিনি আরো বলেন, ওমান এখন ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রত্যাখ্যান করবে এবং গাজার তত্ত্বাবধানের জন্য গঠিত তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’-এ যোগ দেওয়া থেকে বিরত থাকবে। আলবুসাইদির মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, একসময়ের একনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে আমেরিকার প্রতি এখন ওমানের মোহভঙ্গ ঘটেছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের পরাশক্তি মর্যাদা এবং স্থিতাবস্থা বজায় রাখার প্রবণতার কারণে এই সম্পর্কগুলো রাতারাতি ছিন্ন হবে না। কিন্তু ট্রাম্প বিশ্বে যে বিপর্যয় ডেকে এনেছেন, তা বিবেচনা করে অনেক মিত্র দেশ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলবে যে, আমেরিকার সঙ্গে বন্ধুত্বের এই মূল্য দেওয়াটা আদৌ যুক্তিযুক্ত কি-না। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা উভয় সংকটে পড়েছে। যে দেশের ওপর তারা সামরিক সুরক্ষার জন্য গভীরভাবে নির্ভর করে, সেই দেশই এখন তাদের নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি। একটি বেপরোয়া পরাশক্তি হিসেবে তারা খামখেয়ালি ও অবিশ্বস্ত প্রমাণিত হয়েছে এবং সাম্রাজ্যবাদী অভিযান চালানোর জন্য বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন