আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ কি জাতিসংঘকে দুর্বল করে তুলবে?

আমার দেশ অনলাইন

ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ কি জাতিসংঘকে দুর্বল করে তুলবে?

"আমরা একসঙ্গে এমন এক অবস্থানে রয়েছি, যেখানে দশকের পর দশক ধরে চলা দুর্ভোগের অবসান ঘটানো, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জমে থাকা ঘৃণা ও রক্তপাত থামানো এবং ওই অঞ্চলসহ সারা বিশ্বের জন্য একটি সুন্দর, স্থায়ী ও গৌরবময় শান্তি গড়ে তোলা সম্ভব।"

এই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি। এই প্রতিশ্রুতি তিনি এ সপ্তাহে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে বিবেচিত দাভোস ইকোনোমিক ফোরামে নিজের নতুন ‘বোর্ড অব পিস’ উদ্বোধনের সময় ঘোষণা করেন।

বিজ্ঞাপন

অত্যধিক দুর্ভোগ ও সংঘাতে জর্জরিত এই পৃথিবী তাকে (ট্রাম্প) ভীষণভাবে বিশ্বাস করতে চায়।

কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন রাজধানীর অনেক পর্যবেক্ষক ও কর্মকর্তার মতে, এটি ট্রাম্পের সেই উদ্যোগের আরও এক প্রমাণ—যার লক্ষ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী আন্তর্জাতিক কাঠামো ভেঙে ফেলা এবং তার জায়গায় নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যা তার প্রভাবের অধীনে থাকবে।

"আমরা কাউকে আমাদের নিয়ে খেলতে দেব না," সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংক্ষেপে সতর্ক করেন পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক।

তবে ইউরোপে ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় সমর্থক ভিক্টর অরবান তার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বলেন, "ট্রাম্প থাকলে শান্তি।"

এই বোর্ডটি ঠিক কী করবে, যার নেতৃত্ব আজীবনের জন্য ট্রাম্প নিজেই দেবেন?

এটি কি সত্যিই জাতিসংঘের একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা?

বোর্ড চেয়ারম্যানের ক্ষমতা

গত বছর গাজা যুদ্ধের অবসানে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন প্রচেষ্টায় জন্ম নেওয়া এই ধারণা, যা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হয়েছিল, এখন আরও বৃহত্তর, মহাকায় এবং বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে এগোচ্ছে। আর সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ফাঁস হওয়া খসড়া সনদের তথ্যে দেখা যায়, ট্রাম্প পদ ছাড়ার পরও আজীবনের জন্য বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকবেন। ওই সনদ অনুযায়ী তার ক্ষমতা হবে ব্যাপক—কোনো দেশকে সদস্য হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হবে বা হবে না, উপ-সংস্থা বা সহায়ক সংস্থা গঠন বা বিলুপ্ত করা, এমনকি তিনি যখন ইচ্ছা পদত্যাগ করলে কিংবা অক্ষম হলে নিজ উত্তরসূরি নিয়োগের ক্ষমতাও থাকবে তার হাতে।

অন্য কোনো দেশ যদি স্থায়ী সদস্য হতে চায়, তার মূল্য ধরা হয়েছে চোখ কপালে তোলার মতো—১০০ কোটি ডলার (৭৪ কোটি পাউন্ড)।

এই নতুন বোমা ফাটানো তথ্য এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন সময়টি ইতিমধ্যেই ঘটনাবহুল। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ঘটেছে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে যুক্তরাষ্ট্রের কব্জায় নেওয়া, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি ও প্রস্তুতি, আর গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের ট্রাম্পের দাবি—যা ইউরোপজুড়ে এবং তার বাইরেও আলোড়ন তুলেছে।

দাভোসে বোর্ডের উদ্বোধনে দিকবিদিক থেকে উনিশটি দেশ উপস্থিত ছিল—আর্জেন্টিনা থেকে আজারবাইজান, সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র থেকে উপসাগরীয় রাজতন্ত্র পর্যন্ত। আরও বহু দেশ "যোগ দিতে সম্মত হয়েছে" বলেও জানা গেছে।

"এই দলে আমি প্রত্যেককে পছন্দ করি," ট্রাম্প হাসতে হাসতে বলেন, যখন তিনি বোর্ডের সদস্য কিংবা এর অধীনস্থ নির্বাহী স্তরগুলোর তালিকায় থাকা নেতা ও কর্মকর্তাদের দিকে তাকান।

সম্ভাব্য আরও অনেক সদস্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সাড়া দেয়নি।

"এটি এমন একটি চুক্তির বিষয়, যা আরও বিস্তৃত প্রশ্ন উত্থাপন করে, এবং শান্তি সংক্রান্ত কোনো উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উপস্থিতি নিয়ে আমাদেরও উদ্বেগ রয়েছে," ব্যাখ্যা করেন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার।

ট্রাম্প বলছেন, রাশিয়া এতে যুক্ত আছে, যদিও মস্কো থেকে বার্তা এসেছে যে তারা এখনো "অংশীদারদের সঙ্গে পরামর্শ করছে।"

"বর্তমান প্রস্তাব অনুযায়ী" সুইডেন জানায়, "আমরা যোগ দিচ্ছি না।"

"প্রস্তাবটি এমন কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেছে, যার উত্তর পেতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আরও সংলাপ প্রয়োজন,"—এভাবেই কূটনৈতিক ভাষায় প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে নরওয়ে।

এমনকি মুসলিমপ্রধান সাতটি দেশের একটি জোট—যার মধ্যে ছয়টি আরব দেশ, তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়া রয়েছে—স্পষ্ট করেছে যে তারা এতে যুক্ত হচ্ছে "গাজায় ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী শান্তি"র জন্য, যার মধ্যে বিধ্বস্ত অঞ্চলটির পুনর্গঠনও রয়েছে।

তবে বোর্ডের সনদের ফাঁস হওয়া তথ্যে গাজার কোনো উল্লেখ নেই।

কিছু সমালোচকের কাছে—যাদের মধ্যে যোগ দিতে অনিচ্ছুক দেশও রয়েছে—এটি এমন এক প্রেসিডেন্টের আত্মগৌরবের প্রকল্প, যিনি সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি, নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ের আকাঙ্ক্ষা লুকান না। এই পুরস্কারটি ২০০৯ সালে হোয়াইট হাউসে প্রথম মেয়াদের শুরুতে পেয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।

বিশ্বনেতারা জানেন, এই নতুন ক্লাবে যোগ না দিলে তার মূল্য দিতে হতে পারে।

"আমি তার ওয়াইন ও শ্যাম্পেনের ওপর ২০০ শতাংশ শুল্ক বসাব, তখন সে যোগ দেবে। তবে তাকে যোগ দিতেই হবে এমন নয়।"

এভাবেই ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁকে হুঁশিয়ারি দেন ট্রাম্প, তার পছন্দের অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিয়ে।

শুধু স্লোভেনিয়া প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানায়। প্রধানমন্ত্রী রবার্ট গোলব স্পষ্ট করে বলেন—এটি "বিপজ্জনকভাবে বিস্তৃত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করছে।"

এই উদ্বেগের জবাব ট্রাম্প সরাসরি দেন।

"এই বোর্ড পুরোপুরি গঠিত হয়ে গেলে, আমরা প্রায় যা ইচ্ছা তাই করতে পারব এবং জাতিসংঘের সঙ্গে সমন্বয় করেই তা করব।"

ভিড় ঠাসা হলের উদ্দেশে তিনি বক্তব্য দেন। সেখানে উপস্থিত সবাই তার প্রতিটি কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। তবে তিনি বিশ্বকে ধাঁধায় রাখতেই পছন্দ করেন।

এই মন্তব্যের একদিন আগে ফক্স টিভির এক সাংবাদিক ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তার বোর্ড কি জাতিসংঘকে প্রতিস্থাপন করবে। তিনি জবাব দেন, "হয়তো করবে। জাতিসংঘ খুব একটা সহায়ক হয়নি।"

এরপর তিনি যোগ করেন, "জাতিসংঘের সম্ভাবনার আমি বড় ভক্ত, কিন্তু সংস্থাটি কখনোই সেই সম্ভাবনার যথাযথ ব্যবহার করতে পারেনি। আমি যে যুদ্ধগুলোর মীমাংসা করেছি, সেগুলো জাতিসংঘেরই মিটিয়ে ফেলা উচিত ছিল।"

শান্তির প্রধান মধ্যস্থতাকারীর নতুন দাবিদার?

১৯৩ সদস্যের জাতিসংঘ বহু আগেই কার্যত শান্তির প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা হারিয়েছে।

২০১৬ সালের অক্টোবরে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের প্রথম মেয়াদের একেবারে প্রথম দিনেই—নিরাপত্তা পরিষদের প্রায় নজিরবিহীন সর্বসম্মত সমর্থন পাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর—আমি যখন তার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম তিনি "শান্তির জন্য কূটনীতির জোয়ার" আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

গত এক দশকে জাতিসংঘের প্রচেষ্টা বারবার ব্যাহত হয়েছে—অচল নিরাপত্তা পরিষদ, বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধে শান্তি ব্যাহতকারী পক্ষ ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষক দেশগুলোর সংখ্যা ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ার কারণে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তিগুলোর তুলনায় সংস্থাটির নিজস্ব অবস্থান ক্রমাগত ক্ষয়ে যাওয়ার কারণেও।

"যুদ্ধের অবসানে মি. ট্রাম্পের সক্রিয়তাকে আমাদের সবাইকে স্বাগত জানানো উচিত," বলেন জাতিসংঘের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা মার্টিন গ্রিফিথস।

গ্রিফিথস মনে করেন, নতুন উদ্যোগটি "স্পষ্টতই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এবং বৃহত্তর জাতিসংঘের ব্যর্থতার প্রতিফলন।"

তবে মানবিক বিষয়ক ও জরুরি ত্রাণ সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সাবেক এই আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল সতর্ক করে বলেন,"গত ৮০ বছরে অসংখ্য ব্যর্থতা ও জড়তার মধ্য দিয়ে আমরা যা শিখেছি, তা হলো অন্তর্ভুক্তির গুরুত্ব। অর্থাৎ, এটি কেবল মি. ট্রাম্পের বন্ধুদের জন্য নয়, বরং বিশ্ব সম্প্রদায়ের পক্ষে প্রতিনিধিত্বশীল থাকা সম্পর্কেও প্রযোজ্য।"

গুতেরেস নিজেও সম্প্রতি আক্ষেপ করে বলেন, "এমন মানুষও আছেন যারা মনে করেন আইনের শাসনের জায়গায় শক্তির শাসন আসা উচিত।"

ট্রাম্প ক্রমাগত দাবি করেন, তিনি আটটি যুদ্ধের ইতি টেনেছেন। এ বিষয়ে বিবিসির 'টুডে' অনুষ্ঠানে এক সাক্ষাৎকারে গুতেরেসের কাছে জানতে চাওয়া হলে বাস্তববাদী ভঙ্গিতে তিনি বলেন, "ওগুলো যুদ্ধবিরতি।"এর কিছু ইতোমধ্যেই ভেঙে পড়েছে।

রুয়ান্ডা ও গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোর মধ্যে অস্থায়ী শান্তি চুক্তি দ্রুত ভেস্তে যায়, সীমান্তে পরস্পরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ফের শুরু করে কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ড, আর পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাতের অবসানে ট্রাম্পের কেন্দ্রীয় ভূমিকার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত ।

তবে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ট্রাম্পের দৃঢ় মধ্যস্থতাই কার্যকর হয়েছিল।

সূত্র: বিবিসি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন