আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মধ্যেও ইরানে বিক্ষোভ অব্যাহত

আমার দেশ অনলাইন

ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মধ্যেও ইরানে বিক্ষোভ অব্যাহত

ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ থাকার মধ্যেও শনিবার রাতে ইরানের রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় সরকারবিরোধী স্লোগানে আবারও মুখর হয়ে ওঠে রাজপথ। প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের পরও গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী আন্দোলন থামেনি বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।

বিজ্ঞাপন

দুই সপ্তাহ আগে অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে তেহরানে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ দ্রুত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। অল্প সময়ের মধ্যেই আন্দোলন ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা উৎখাতের দাবিতে রূপ নেয়। তবে ইরান সরকার এই বিক্ষোভের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সহিংসতায় এখন পর্যন্ত বহু মানুষ নিহত হয়েছে। শনিবার তারা সতর্ক করে জানায়, দমন-পীড়ন আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে। বৃহস্পতিবার থেকে কার্যত ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট চলায় দেশ থেকে তথ্য আসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে, ওই সময় থেকে ইরানে প্রায় কোনো সংযোগই নেই।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তার দেশ এই আন্দোলনকে “সহায়তা করতে প্রস্তুত”। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, “ইরান এমন এক স্বাধীনতার মুখোমুখি, যা তারা আগে কখনো দেখেনি। যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করতে প্রস্তুত।”

নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের বিকল্প নিয়ে ট্রাম্পকে সম্প্রতি অবহিত করা হয়েছে। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। উল্লেখ্য, গত জুনে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্ত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

শনিবার তেহরানের উত্তরাঞ্চলে আবারও লোকজন জড়ো হয়। এএফপি যাচাইকৃত ভিডিওতে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীরা পটকা ফোটাচ্ছে, হাঁড়ি-পাতিল বাজাচ্ছে এবং অপসারিত রাজতন্ত্রের পক্ষে স্লোগান দিচ্ছে। যাচাই না করা ভিডিওতে রাজধানীর আরও কয়েকটি এলাকায় সরকারবিরোধী স্লোগান শোনা গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত সাবেক শাহের পুত্র রেজা পাহলভি সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় আরও সংগঠিত ও লক্ষ্যভিত্তিক আন্দোলনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু রাস্তায় নামা নয়, শহরের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলো দখল ও নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার প্রস্তুতি নেওয়া।”

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ক্ষমতায় থাকা ধর্মতান্ত্রিক শাসকদের জন্য এই আন্দোলন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। শুরুতে সংযমের বার্তা দিলেও সরকার এখন কঠোর অবস্থানে গেছে। শুক্রবার এক ভাষণে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বিক্ষোভকারীদের ‘ভাঙচুরকারী’ আখ্যা দিয়ে অভিযোগ করেন, তারা ট্রাম্পের ইশারায় কাজ করছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের “উদ্বেগজনক” তথ্য তারা পর্যবেক্ষণ করছে। নরওয়ে-ভিত্তিক ইরান হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, দমন-পীড়নে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫১ জন নিহত হয়েছে, যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। সংস্থাটি পূর্ব তেহরানের আলঘাদির হাসপাতালের মেঝেতে গুলিবিদ্ধ লাশের ছবি প্রকাশের দাবিও করেছে।

শুক্রবার তেহরানের সাদাতাবাদ এলাকায় ‘খামেনির মৃত্যু চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগান শোনা যায়। এ সময় গাড়ির হর্ন বাজিয়ে অনেকে বিক্ষোভে সমর্থন জানান। তেহরানের বাইরে মাশহাদ, তাবরিজ, কুম ও পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর হামেদানেও বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। হামেদানে এক ব্যক্তিকে শাহ আমলের সিংহ-সূর্য প্রতীকযুক্ত পতাকা ওড়াতে দেখা যায়। একই পতাকা লন্ডনে ইরানের দূতাবাস ভবনের বারান্দায়ও স্বল্প সময়ের জন্য উত্তোলিত হয়।

এর আগে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার তেহরানের অনেক এলাকা ফাঁকা ও অন্ধকারে ডুবে থাকতে দেখেন এএফপি সাংবাদিকরা। বিকেলে এক ক্যাফে ব্যবস্থাপক বলেন, “এলাকাটি নিরাপদ নয়।”

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংঘর্ষে নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েকজন সদস্যও নিহত হয়েছেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে শনিবার শিরাজসহ বিভিন্ন শহরে নিহত নিরাপত্তা সদস্যদের জানাজা ও ভবনে অগ্নিসংযোগের দৃশ্য দেখানো হয়।

ইরানের সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, “শৃঙ্খলা ও শান্তি বিঘ্নিত করতে চাওয়া শত্রুদের বিরুদ্ধে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান উরসুলা ভন ডার লেয়েনসহ বিশ্বনেতারা সংযমের আহ্বান জানিয়েছেন এবং বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংস দমন নীতির নিন্দা করেছেন।

শনিবার, ইরানে প্রথম কর্মদিবসে তেহরানের এক বাসিন্দা বলেন, ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় তিনি কাজের ই-মেইলও দেখতে পারছেন না। তিনি বলেন, “জনগণের বিজয়ের আগ পর্যন্ত এই মূল্য আমাদের দিতেই হচ্ছে।”

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন