ফিলিস্তিনের গাজাবাসীর জন্য ত্রাণ নিয়ে যাওয়া ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ নৌবহরের সমাজকর্মীদের প্রতি ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভিরের উপহাস ও দুর্ব্যবহারের ভিডিও বিশ্বজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এ ঘটনার পর কট্টর ডানপন্থি হিসেবে পরিচিত ইতালির মেলোনি সরকারও ইসরাইল থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে বাধ্য হচ্ছে, যা দুই দেশের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে বড় ফাটলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বেন গভির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) ভিডিওটি পোস্ট করার মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি এক্সে লেখেন, ‘এসব সমাজকর্মী, যাদের মধ্যে অনেকেই ইতালির নাগরিক, তাদের সঙ্গে এমন আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, যা মানুষের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে। ইতালি এ ঘটনার জন্য ক্ষমা দাবি করছে।’
আমেরিকান থিংক ট্যাংক আটলান্টিক কাউন্সিলের ইতালীয় সিনিয়র ফেলো অ্যালিসা পাভিয়া মনে করেন, এ ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নাটকীয় মোড়। তিনি বলেন, ‘ইউরোপে ইসরাইল তার অন্যতম প্রধান মিত্রকে হারাতে পারে। রোম ও জেরুজালেমের মধ্যকার এই দূরত্ব এখন সম্পূর্ণ বিচ্ছেদের দিকে যাচ্ছে।’
অথচ অতীতে এই ফ্লোটিলা বা সমাজকর্মীদের প্রতি মেলোনি সরকারের কোনো সহানুভূতি ছিল না। গত সেপ্টেম্বরে যখন ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ মধ্যপ্রাচ্যের দিকে রওনা হয়েছিল, তখন মেলোনি এটিকে ‘অহেতুক, বিপজ্জনক এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। কিন্তু গত ৩০ এপ্রিল গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের অদূরে আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমা থেকে ইসরাইল কর্তৃক বেশ কয়েকটি ফ্লোটিলা জাহাজ জব্দের পর মেলোনির সুর বদলে যায়। তখন তিনি এক বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় জাহাজ জব্দের তীব্র নিন্দা জানান এবং অবৈধভাবে আটক সমস্ত ইতালীয় নাগরিককে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার দাবি করেন।
২০২২ সালে মেলোনি ক্ষমতায় আসার পর থেকে রোমকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে জেরুজালেমের অন্যতম সহানুভূতিশীল মিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
রোমের লুইস গুইডো কার্লি ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের পরিচালক জিওভানি ওরসিনা বলেন, ‘মেলোনি সরকারের অধীনে ইসরাইলের সাথে ঘনিষ্ঠতা আরো তীব্র হয়েছিল। তারা আগের সরকারগুলোর চেয়ে ইসরাইলের প্রতি বেশি সদয় ছিলেন।’
কিন্তু গত কয়েক মাসে সেই ঘনিষ্ঠতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ওরসিনা মনে করেন, ইসরাইলের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ইতালির জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে, যা ইতালীয় সরকারকে নীতি পরিবর্তনে বাধ্য করেছে।
ক্যাথলিক চার্চ ও ট্রাম্পের প্রভাব
লুইসের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক লরেঞ্জো কাস্তেলানির মতে, ইতালির এই নীতি পরিবর্তনের পেছনে প্রধান দুটি কারণ হলো-ইসরাইলে খ্রিস্টান (বিশেষ করে ক্যাথলিক) সম্প্রদায়ের ওপর ধারাবাহিক হেনস্থা এবং ইরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক মার্কিন-ইসরাইল যুদ্ধ।
গত এপ্রিল ও মে মাসের মধ্যে ইসরাইলি পুলিশ কর্তৃক জেরুজালেমে লাতিন প্যাট্রিয়ার্ক পিয়েরবাত্তিস্তা পিজাবাল্লাকে পাম সানডে-র ব্যক্তিগত প্রার্থনা অনুষ্ঠান পরিচালনায় বাধা দেওয়া এবং দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি সেনাদের যিশুর মূর্তি ভাঙার ঘটনা বিশ্বজুড়ে ক্ষোভের জন্ম দেয়।
কাস্তেলানি বলেন, ‘অধিকাংশ ইতালীয়র ক্যাথলিক মানসিকতার কারণে এই খ্রিস্টানবিরোধী ঘটনাগুলোর প্রভাব ইতালিতে ফ্লোটিলাকাণ্ডের চেয়েও বেশি ছিল। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন পোপের সমালোচনা করেছিলেন, তখন মেলোনি ট্রাম্পের সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি করেছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণেও ইতালির ডানপন্থি ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ব্যাপক হ্রাস পেয়েছে, যা সরকারের পক্ষে ইসরাইল নীতি পরিবর্তন করা সহজ করেছে ‘
যুদ্ধ ও ‘গাজা প্রজন্ম’
ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধটিই মূলত সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে কাজ করেছে। কাস্তেলানি বলেন, ইতালির ভোটাররা যুদ্ধকে নিজেদের অর্থনীতি ও বাজেটের ওপর আঘাত হিসেবে দেখে। সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ১১ শতাংশ ইতালীয় মনে করে ইসরাইলকে মিত্র হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, যার মধ্যে মেলোনির নিজস্ব ডানপন্থি ভোটারদের হার মাত্র ২১ শতাংশ।
গত ২২ ও ২৩ মার্চ ইতালিতে বিচার বিভাগীয় সংস্কার সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ গণভোটে ৫৩ শতাংশের বেশি ভোটার সরকারের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের পররাষ্ট্রনীতির (ইসরায়েলপন্থি অবস্থান) বিরুদ্ধে তরুণ ভোটারদের (১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী) প্রতিবাদের কারণেই এটি হয়েছে, যাদের অনেকে ‘গাজা প্রজন্ম’ বলে অভিহিত করছেন।
সম্পর্কের ফাটল কি জোড়া লাগবে?
গত তিন মাসে ইতালি সরকার ইসরাইলের সাথে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্থগিত করেছে, ইসরাইলি রাষ্ট্রদূতকে তিনবার তলব করেছে এবং তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেছে। এছাড়া উগ্রপন্থি ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের পাশাপাশি মন্ত্রী বেন গভিরের ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য ইতালি এখন সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করছে।
তবে ওরসিনা ও কাস্তেলানি স্পষ্ট করেছেন, ইতালি এখনো ইসরাইলের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ সম্পর্কচ্ছেদ বা ইইউ-এর সাধারণ কঠোর নিষেধাজ্ঞার মতো চরম পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত রয়েছে।
কাস্তেলানি মনে করেন, ‘ইতালীয়রা মূলত ইসরাইল সরকারের ভেতরের অতি-ডানপন্থি- কট্টরপন্থি অংশটিকে সমস্যা হিসেবে দেখছে, পুরো ইসরাইলকে নয়। একটি যুদ্ধবিরতি হলে এবং গাজায় পুনর্গঠন শুরু হলে এই বৈরিতার অবসান ঘটতে পারে। এটি একটি সাময়িক ফাটল, স্থায়ী বিচ্ছেদ নয়।’
সূত্র: দ্য টাইমস অব ইসরাইল
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


