আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

কে এই মোজতবা খামেনি, যুদ্ধের মধ্যে ইরানের নতুন সুপ্রিম লিডার

আমার দেশ অনলাইন

কে এই মোজতবা খামেনি, যুদ্ধের মধ্যে ইরানের নতুন সুপ্রিম লিডার
ছবি: সংগৃহীত

ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় নিহত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছেলে মোজতবা হোসেইনি খামেনি ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। রোববার দেশটির ধর্মীয় নেতারা আয়াতুল্লাহ খামেনির দ্বিতীয় ছেলেকে নতুন নেতা হিসেবে ঘোষণা করেন। এর আগে কয়েক দিন ধরেই পশ্চিমা ও ইসরাইলি বিভিন্ন গণমাধ্যমে আভাস দেওয়া হচ্ছিল যে ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনিই নতুন নেতা হতে যাচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

৩ মার্চ লন্ডনভিত্তিক ইরানি বিরোধী সংবাদমাধ্যম ‘ইরান ইন্টারন্যাশনাল’ও সূত্রের বরাতে জানায়, ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা ৮৮ সদস্যের ‘বিশেষজ্ঞ পরিষদ’ প্রয়াত আয়াতুল্লাহ খামেনির স্থলাভিষিক্ত হিসেবে তার দ্বিতীয় ছেলে মোজতবাকে বেছে নিয়েছে। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো প্রথমদিকে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। আল-জাজিরা বা মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক বড় কোনো গণমাধ্যমও তখন মোজতবা খামেনির নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।

দীর্ঘদিন ধরেই অনেকের ধারণা ছিল, বাবার পর ইরানের নেতৃত্বে আসতে পারেন মোজতবা খামেনি। খামেনির সমর্থকদের মতে, তাকে সেইভাবেই প্রস্তুত করা হয়েছিল।

অন্যদিকে সমালোচকদের দাবি, বড় মাপের ধর্মীয় আলেম না হওয়া সত্ত্বেও তার নেতৃত্বে আসার পেছনে বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী আইআরজিসির ভূমিকা থাকতে পারে। ইরানের প্রভাবশালী এই বাহিনীর মধ্যে মোজতবার যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।

মোজতবা বেশিরভাগ সময়ই জনসম্মুখের বাইরে থেকেছেন। তিনি কখনো কোনো সরকারি দায়িত্বে ছিলেন না এবং খুব কমই প্রকাশ্যে বক্তৃতা দিয়েছেন। তবে ইরানের জটিল ধর্মতান্ত্রিক ক্ষমতাকাঠামোর ভেতরে তার প্রভাব বিস্তৃত বলে মনে করা হয়।

১৯৬৯ সালে মাশহাদ শহরে জন্ম নেওয়া মোজতবা ছয় ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয়। ছোটবেলাতেই তার বাবা ইরানের শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে উৎখাতের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর খামেনি পরিবার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে।

তেহরানে আসার পর মোজতবা পড়াশোনা করেন আলাভি হাই স্কুলে। পরে তিনি ধর্মীয় শিক্ষা নিতে কোম শহরে যান এবং রক্ষণশীল আলেমদের কাছে দীর্ঘ সময় পড়াশোনা করেন। তবে এত বছর ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করলেও তিনি আয়াতুল্লাহ পদমর্যাদা অর্জন করতে পারেননি।

সাংবিধানিকভাবে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার উচ্চ ধর্মীয় মর্যাদা থাকার কথা থাকায় তার ক্ষমতায় আসা নিয়ে জ্যেষ্ঠ আলেমদের মধ্যে আপত্তি থাকতে পারে বলে মনে করা হয়।

ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় মোজতবা হাবিব ব্যাটালিয়নে অংশ নেন। সে সময় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থায় পরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়া অনেক ব্যক্তির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে।

নির্বাচনে জয়ী হওয়া বা কোনো সরকারি পদে না থাকলেও দীর্ঘদিন ধরেই তাকে বাবার কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে দেখা হতো। অনেকেই তাকে সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনির ছেলে আহমাদ খোমেনির মতো প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করতেন।

২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র মোজতবা খামেনির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তখন ওয়াশিংটনের অভিযোগ ছিল, আয়াতুল্লাহ খামেনি তার কিছু দায়িত্ব ছেলের কাছে হস্তান্তর করেছেন এবং জবাবদিহির বাইরে থেকেই মোজতবা সরকারি কাজে প্রভাব খাটাচ্ছেন।

ইরানের সংস্কারপন্থি রাজনীতিক ও বিদেশি কয়েকটি সরকারও তার বিরুদ্ধে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার এবং নিরাপত্তা বাহিনীর দমনপীড়নে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে। তবে ইরানি কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমা বিভিন্ন দেশে বেনামে মোজতবা খামেনির বড় ধরনের বিনিয়োগ থাকতে পারে। যদিও তার সম্পদের সঠিক পরিমাণ নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।

অন্যদিকে নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মৃত্যুর আগে আয়াতুল্লাহ খামেনি তার উত্তরসূরি হিসেবে তিনজন জ্যেষ্ঠ আলেমের নাম উল্লেখ করেছিলেন, সেখানে মোজতবার নাম ছিল না। তবু বাবার পর তিনি যদি সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেন, তাহলে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর রাজতন্ত্রবিরোধী যে শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে, সেটি নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।

ইরান ইন্টারন্যাশনালের দাবি, মোজতবার ক্ষমতায় আসার পেছনে বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী আইআরজিসির বড় ভূমিকা রয়েছে। তাদের মতে, এই বাহিনী নেতা নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা আলেমদের ওপর মোজতবাকে বেছে নিতে চাপ সৃষ্টি করেছিল।

দায়িত্ব গ্রহণ করলে তাকে একদিকে আইআরজিসির কৌশল নির্ধারণ করতে হবে, অন্যদিকে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা মোকাবিলা করতেও প্রস্তুতি নিতে হবে। একই সঙ্গে ইরাক সীমান্তে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত কুর্দি যোদ্ধাদেরসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং সম্ভাব্য অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ পরিস্থিতিও সামাল দিতে হতে পারে। এ ছাড়া দীর্ঘদিনের পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় দুর্বল হয়ে পড়া দেশের অর্থনীতির উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে তাকে।

ইরানের ক্ষমতা কাঠামোয় সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়। তিনি পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বিষয়গুলো তদারকি করেন। একই সঙ্গে তিনি আইআরজিসিসহ দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...