ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশে নির্বাচনের সময় রাস্তায় বিরোধী দলের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। হয় তারা ভোট বর্জন করেছে, নয়তো জ্যেষ্ঠ নেতাদের গণগ্রেপ্তারের কারণে কোণঠাঁসা ছিল। তবে আগামী বৃহস্পতিবারের (১২ ফ্রেবুয়ারি) ভোটের আগে চিত্রটা সম্পূর্ণ বিপরীত।
ভোটের মাঠে বিএনপি এগিয়ে আছে বলে ধরা হচ্ছে, তবে ইসলামপন্থি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট একটি শক্তিশালী চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এর পাশাপাশি ৩০ বছরের কম বয়সি জেন-জিদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি নতুন দলও জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধেছে। এনসিপি নামের দলটির নেতাকর্মীরা হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয় থাকলেও তারা সেই জনসমর্থনকে স্বতন্ত্র নির্বাচনি শক্তিতে রূপ দিতে পারেননি।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান রয়টার্সকে বলেন, সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯২টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা তার দল সরকার গঠনের মতো পর্যাপ্ত আসন পাবে বলে আত্মবিশ্বাসী।
বিশ্লেষকদের মতে, ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে যদি স্পষ্ট রায় আসে, তাহলে ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরতে সহায়ক হবে।
এই নির্বাচনের ফলাফল দক্ষিণ এশিয়ার দেশটিতে আঞ্চলিক শক্তিধর চীন ও ভারতের ভূমিকার ওপরও প্রভাব ফেলবে। ঢাকার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসি বলেন, ‘জনমত জরিপে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও এখনো ভোটারদের বড় একটি অংশ সিদ্ধান্ত নেননি। ফলাফলের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’
তিনি বলেন, ‘ভোটের ফল নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় প্রভাব ফেলবে। এর মধ্যে জে-জিদের ভোট বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশই এই প্রজন্মের।’
সারা দেশে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ এবং জামায়াতের ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক সংবলিত সাদা-কালো পোস্টার ও ব্যানার খুঁটি, গাছ এবং সড়কের পাশের দেয়ালে লাগানো দেখা যাচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে বেশ কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রচারসামগ্রী। সড়কের মোড়ে মোড়ে দলীয় প্রতীক লাগানো অস্থায়ী কার্যালয় থেকে ভেসে আসছে প্রচারের গান। আগের নির্বাচনের সঙ্গে এর বড় পার্থক্য হলো— তখন সর্বত্রই আধিপত্য ছিল আওয়ামী লীগের ‘নৌকা’ প্রতীকের।
জনমত জরিপের বরাতে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমটি বলছে, ধারণা করা হচ্ছে- একসময় নিষিদ্ধ থাকা জামায়াত এবার তাদের ইতিহাসের সেরা নির্বাচনি ফল করতে পারে, যদিও দলটি এককভাবে সরকার গঠন না-ও করতে পারে।
ভারতের প্রভাব কমে চীনের প্রভাব বৃদ্ধি
বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের রায় আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশে চীন ও ভারতের ভূমিকার ওপরও প্রভাব ফেলবে। হাসিনার নয়াদিল্লিতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে ওপর চীনের প্রভাব বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এ অবস্থায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বিএনপির সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বেশি সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করছে বলে মনে করেন কিছু বিশ্লেষক। আবার কেউ কেউ বলছেন, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠন করলে বাংলাদেশ পাকিস্তানের দিকে বেশি ঝুঁকতে পড়তে পারে। কারণ পাকিস্তান একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবং ভারতের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী।
জামায়াতের মিত্র এনসিপি বলছে, বাংলাদেশে ‘নয়াদিল্লির আধিপত্য’ তাদের অন্যতম উদ্বেগের বিষয়। দলটির নেতারা সম্প্রতি চীনা কূটনীতিকদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। যদিও তারা বলছেন, তাদের দল কোনো দেশের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট নয়।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলছেন, তার দল সরকার গঠন করলে যে দেশ বাংলাদেশের জনগণ ও রাষ্ট্রের জন্য উপযোগী প্রস্তাব দেবে, তাদের সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের প্রতি ভোটারদের আকর্ষণের বড় কারণ তাদের ‘পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি’, ধর্মীয় অবস্থান নয়। জরিপে বলা হয়েছে, ভোটাররা নির্বাচনে অংশগ্রহণে আগ্রহী, ধর্মীয় বা প্রতীকী ইস্যুর চেয়ে দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং দায়িত্বশীল, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব প্রত্যাশা করছেন।
সবমিলিয়ে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানকে পরবর্তী সরকারপ্রধান হওয়ার সবচেয়ে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে যদি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট এগিয়ে যায়, তাহলে দলটির প্রধান ডা. শফিকুর রহমানও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে থাকতে পারেন।
২১ বছর বয়সি মোহাম্মদ রাকিব, যিনি প্রথমবারের মতো ভোট দিতে যাচ্ছেন, পরবর্তী সরকার জনগণকে তাদের মতামত প্রকাশ করতে এবং স্বাধীনভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ দেবে বলে আশাবাদী তিনি।
তিনি বলেন, ‘(হাসিনার) আওয়ামী লীগ নিয়ে সবাই বিরক্ত ছিল। জাতীয় নির্বাচনের সময়ও মানুষ ভোট দিতে পারেনি। মানুষের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সুযোগ ছিল না। আমি আশা করি, পরবর্তী সরকার, যে-ই ক্ষমতায় আসুক না কেন, এই মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে।’
আরএ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

