তালেবান শাসনেও যেভাবে ব্যবসায় সফল হচ্ছেন আফগান নারীরা

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

তালেবান শাসনেও যেভাবে ব্যবসায় সফল হচ্ছেন আফগান নারীরা
হেরাতের মৌচাষি ঘোঞ্চা কারিমি আফগানিস্তানে ‘বি কুইন’ নামে পরিচিত।

আফগানিস্তানে নারীদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে শিক্ষা, চাকরি ও জনজীবনের নানা ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ সীমিত করা হলেও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঠেকাতে এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কমাতে নারীদের নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ দিয়েছে সরকার । ফলে নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও উদ্যোক্তা হওয়াকে জীবিকার অন্যতম শেষ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিচ্ছেন হাজারো আফগান নারী।

বিজ্ঞাপন

আফগানিস্তান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশটিতে ১০ হাজারের বেশি নারী ব্যবসায়িক লাইসেন্সধারী। গত পাঁচ বছরে এই সংখ্যা প্রায় দশ গুণ বেড়েছে। এছাড়া প্রায় এক লাখ ২০ হাজার নারী লাইসেন্স ছাড়াই বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসায় যুক্ত আছেন। বিশ্বব্যাংকের মতে, ক্ষুদ্র ব্যবসা এখন আফগান নারীদের সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র।

তবে যারা একসময় আইনজীবী, প্রকৌশলী কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন, তাদের অনেকেই এখন কার্পেট বুনন, প্রসাধনী উৎপাদন বা কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রিক ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। সরকারি চাকরি, বহু বেসরকারি সংস্থা এবং বিভিন্ন পেশায় নারীদের কাজ করার সুযোগ সীমিত হয়ে গেছে।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত আফগান নারীদের মাত্র ৭ শতাংশ কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবুও বহু নারী উদ্যোক্তার জন্য ব্যবসাই এখন আত্মনির্ভরতা ও সামাজিক যোগাযোগের শেষ আশ্রয়।

হেরাত প্রদেশে নারী ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি বেহনাজ সালজুঘি বলেন, আফগানিস্তানে নারীদের জন্য এখন একমাত্র আশার জায়গা হলো ব্যবসা।

শিক্ষার স্বপ্ন ভেঙে কার্পেট ব্যবসায় সাফল্য

উত্তর আফগানিস্তানের মাজার-ই-শরিফে মাত্র ১৯ বছর বয়সী নাসিরা আজিজি পরিচালনা করছেন একটি কার্পেট উৎপাদন প্রতিষ্ঠান। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বন্ধ হয়ে গেলে তিনি হতাশায় ভুগতে শুরু করেন।

কার্পেট বুনছেন আফগান নারীরা
কার্পেট বুনছেন আফগান নারীরা

পরে ইউএনডিপির আর্থিক সহায়তায় কার্পেট ব্যবসা শুরু করেন তিনি। বর্তমানে তার দুইটি কারখানা ও ঘরে বসে কাজ করা মিলিয়ে প্রায় ৪৫০ জন কর্মী রয়েছে, যাদের অধিকাংশই নারী।

নাসিরা বলেন, শিক্ষা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মনে হয়েছিল জীবন থেমে গেছে। কিন্তু এই কারখানা আমাকে নতুন করে বাঁচার প্রেরণা দিয়েছে।

প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন থেকে সাবান ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা

২১ বছর বয়সী রোকিয়া রেজায়ি একসময় খনি প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর সেই পথ বন্ধ হয়ে যায়। পরে ইংরেজি পড়ালেও ব্যক্তিগত কোচিংয়ের ওপর বিধিনিষেধের কারণে শিক্ষার্থী কমে যায়। ২০২২ সালে হেরাতে তিনি ‘ম্যাগনোলিয়া’ নামে একটি সাবান উৎপাদন ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে এই ব্যবসার আয়েই চলছে সাত সদস্যের পরিবার।

কারখানায় হাতে তৈরি হচ্ছে জাফরান ও ভেষজ উপাদানে তৈরি ‘ম্যাগনোলিয়া’ ব্র্যান্ডের সাবান।
কারখানায় হাতে তৈরি হচ্ছে জাফরান ও ভেষজ উপাদানে তৈরি ‘ম্যাগনোলিয়া’ ব্র্যান্ডের সাবান।

তার ছোট্ট কারখানায় হাতে তৈরি হচ্ছে জাফরান ও ভেষজ উপাদানে তৈরি সাবান। সীমিত অবকাঠামো নিয়েও তিনি ভবিষ্যতে ইরান ও তাজিকিস্তানের বাজারে প্রবেশের পরিকল্পনা করছেন। ২০৩০ সালের মধ্যে ‘ম্যাগনোলিয়া’কে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডে পরিণত করার লক্ষ্য তার।

‘বি কুইন’ ঘোঞ্চা কারিমির সংগ্রাম

হেরাতের মৌচাষি ঘোঞ্চা কারিমি আফগানিস্তানে ‘বি কুইন’ নামে পরিচিত। তার ৫০টি মৌচাকের মধুই পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস। তবে ব্যবসা চালাতে গিয়ে তাকে নানা বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছে। পুরুষ ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগে নিষেধাজ্ঞা, চলাচলের সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক হয়রানি তার ব্যবসাকে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

‘বি কুইন’ ঘোঞ্চা কারিমি
‘বি কুইন’ ঘোঞ্চা কারিমি

কারিমি জানান, অনেক সময় মৌচাক দেখাশোনার জন্য শহরের বাইরে যেতে হলে তাকে পুরুষের পোশাক পরে বের হতে হয়েছে। ২০২৩ সালে নারীদের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ নিয়ে এক তালেবান কর্মকর্তার সঙ্গে বিরোধের জেরে তিনি ২০ দিন কারাবন্দিও ছিলেন।

তিনি বলেন, একদিকে সরকার নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তার কথা বলে, অন্যদিকে প্রতিদিন নতুন নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে।

সরকারি দাবি ও বাস্তবতার ফারাক

আফগান সরকারের শ্রম ও সামাজিক কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সামিউল্লাহ ইব্রাহিমি দাবি করেছেন, সরকার নারীদের কারিগরি প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানে উৎসাহিত করছে। তবে সমালোচকদের মতে, বাস্তবে এই উদ্যোগ অত্যন্ত সীমিত।

পোশাক বা কার্পেট কারাখানায় কাজ করছেন আফগান নারীরা।
পোশাক বা কার্পেট কারাখানায় কাজ করছেন আফগান নারীরা।

আফগানিস্তানের উইমেনস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির ভারপ্রাপ্ত প্রধান ফরিবা নুরি বলেন, আমাদের মায়েরা বলতেন, তারা কষ্ট করছেন যেন আমাদের ভবিষ্যৎ ভালো হয়। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ ভালো হয়নি। এখন আমরাও আমাদের সন্তানদের একই কথা বলছি, যদিও জানি না তা সত্যি হবে কি না।

সংগ্রামের মধ্যেই টিকে থাকার লড়াই

নারী উদ্যোক্তাদের অনেককেই ব্যবসা পরিচালনার জন্য বাবা, ভাই বা স্বামীর সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। পরিবার ও রক্ষণশীল সামাজিক মূল্যবোধও তাদের অগ্রযাত্রার বড় বাধা।

তবুও কঠিন বাস্তবতার মধ্যে আফগান নারীরা নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। শিক্ষা ও চাকরির সুযোগ সীমিত হয়ে যাওয়ার পর ব্যবসাই এখন তাদের আত্মমর্যাদা, স্বাধীনতা এবং পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অন্যতম ভরসা।

সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন