আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

পে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা

কাওসার আলম

পে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করেছে পে কমিশন। এই সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের কোষাগার থেকে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে। তবে কমিশন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তাদের সুপারিশ পেশ করলেও আগামী নির্বাচিত সরকার এটি বাস্তবায়ন করবে বলে জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।

তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন ও ভাতাকাঠামো বাস্তবায়নে যে অতিরিক্ত ব্যয় হবে, তার চাপ পরবর্তী সরকারকে নিতে হবে এবং অর্থের সংস্থানের উপায় তাদেরই বের করতে হবে। অবশ্য পরবর্তী নির্বাচিত সরকার যদি মনে করে এর দরকার নেই, তাহলে তারা এর বাস্তবায়ন না-ও করতে পারে। তবে সুপারিশ করার পর এটি বাস্তবায়ন না করার কোনো বিকল্প পরবর্তী সরকারের হাতে নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন

অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকেরা বলছেন, বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে নতুন সরকারকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই পে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে প্রশাসনের নানা চাপের মুখে পড়বে। পুরো না হলেও কমপক্ষে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হবে। এটি বাস্তবায়নে বাড়তি অর্থের জোগান দেওয়াই হবে চ্যালেঞ্জিং। এর জন্য সরকারের আয় বাড়াতে হবে। কিন্তু এই পরিমাণ রাজস্ব আয় বাড়ানো সরকারের পক্ষে খুবই কঠিন হবে। সরকারকে ব্যয়ের এই সংস্থান করতে ভর্তুকি ও উন্নয়ন খাতসহ অন্যান্য খাতে খরচ কমাতে হবে। প্রকৃতপক্ষে এত খরচ কমানো সরকারের পক্ষে সম্ভব হবে না। ফলে পে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন নিয়ে একধরনের সংকট তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে। এছাড়া পে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হলে মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলবে এবং সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে।

গতকাল বুধবার পে কমিশনের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান সব সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে বেতন-ভাতা বাড়ানোর বিষয়ে সুপারিশের প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন। কমিশন সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২০টি স্কেলে বেতন সুপারিশ করে। সর্বনিম্ন বেতন স্কেল ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকার সুপারিশ করা হয়েছে এবং সর্বোচ্চ বেতন স্কেল ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার সুপারিশ করা হয়েছে। নতুন বেতনকাঠামোতে সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করা হচ্ছে ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ।

কমিশন-প্রধান জানান, প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের ব্যয় হচ্ছে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।

কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আমার দেশকে বলেন, পে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে অর্থায়ন হচ্ছে বড় চ্যালেঞ্জ। আর একবার বেতন বাড়লে প্রতি বছরই তা বাড়তে থাকবে। বেতন বৃদ্ধি ছাড়াই সরকারের ব্যয় মেটাতে রাজস্ব বাড়ানোর প্রয়োজন। প্রতি বছরই রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এখন রাজস্ব ব্যয় বাড়লে এটি সহ্য করার মতো শক্তি আমাদের অর্থনীতিতে রয়েছে কি না, সেটা ভেবে দেখতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের বেতন বাড়লে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও বেতন বাড়ানোর চাপ পড়বে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ আমার দেশকে বলেন, কমিশনের সুপারিশ পরবর্তী সরকার বাস্তবায়ন করবে। তারা একসঙ্গে না করতে চাইলে ধাপে ধাপেও বাস্তবায়ন করতে পারে। এটা নির্ভর করবে অর্থসংস্থানের ওপর।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী ড. এম মাসরুর রিয়াজ আমার দেশকে বলেন, বেসরকারি খাতের তুলনায় সরকারি খাতের বেতন-ভাতা কম। বেতন যদি গ্রহণযোগ্য না হয়, তাহলে সরকারি কর্মকর্তারা কর্মক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত হবেন, দুর্নীতিতে জড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। সে ক্ষেত্রে বেতন বাড়ানোর বিষয়টির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

তিনি বলেন, তবে বর্তমানে দেশের অর্থনীতি একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। বিনিয়োগ কম, মূল্যস্ফীতিও বেশি, সরকারের রাজস্ব আহরণেও দুর্বলতা রয়েছে। এছাড়া চলতি বছরের নভেম্বর মাসে এলডিসি উত্তরণেরও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের বেশি। ব্যাংকের সুদের হারও বেশি। এ সময়ে যদি আরো বাড়তি টাকা যুক্ত হয় তাহলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। সুতরাং এ ধরনের একটি সময়ে বেতন বাড়ানোর সুপারিশ কতটা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হচ্ছে—এটি একটি প্রশ্ন। অন্যদিকে রয়েছে প্রস্তুতির বিষয়টি। বেতন বাড়ানোর ফলে এর ফলাফল কী হবে, এটি কি পারফরম্যান্সের সঙ্গে সম্পর্কিত হবে কি না? পৃথিবীর সব দেশেই পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে বেতন বাড়ানো হয়। এছাড়া সুশাসনকেন্দ্রিক প্রস্তুতি কেমন, সেটাও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে কি না?

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান আমার দেশকে বলেন, বেতন বাড়ানোর যে সুপারিশ করা হচ্ছে তাতে সরকারের বাড়তি যে ব্যয় হবে তার সংস্থান কোথা থেকে হবে; এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা খুবই সীমিত। গত কয়েক বছর ধরে সরকারকে ঋণ করে ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। তার উপর পুরো উন্নয়ন ব্যয় ধারে করতে হয়। কর আহরণ বাড়ানো যায়নি। আমি আশা করব, কমিশন তাদের রিপোর্টে অর্থ কোথা থেকে যোগান দেবে, তাও উল্লেখ করবে।

যদি সরকারের আকার কমিয়ে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বেতন বাড়ানো হতো, তাহলে সেটি হলে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু ঋণ করে বেতন বাড়ালে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে। এতে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ সক্ষমতা কমবে। সরকার বিভিন্ন খাতে যে অর্থ বরাদ্দ করতে পারে না, তা থেকে বের হওয়ার পথ আরো লম্বা হবে। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তা বাস্তবায়ন কঠিন হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...