প্রতিষ্ঠার একুশ বছর পর প্রথমবারের মতো কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচন দেখল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি)। ডাকসু, জাকসু, চাকসু ও রাকসুর মতোই জকসু নির্বাচনেও অপ্রতিরোধ্য অবস্থান তৈরি করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। কেন্দ্রীয় সংসদের মোট ২১টি পদের মধ্যে ভিপি (সহসভাপতি), জিএস (সাধারণ সম্পাদক), এজিএসসহ ১৬টিতেই জয় পেয়েছেন শিবির সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য পরিষদ’ প্যানেলের প্রার্থীরা।
ভোটগ্রহণের প্রায় ৩০ ঘণ্টা পর বুধবার রাত ১টায় আনুষ্ঠানিকভাবে জকসু নির্বাচনের ফল ঘোষণা করা হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মোস্তফা হাসান ফল ঘোষণা করেন।
আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণার সময় ছাত্রশিবিরের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক সিবগাতুল্লাহ সিবগাহ, সাবেক সভাপতি জাহিদুল ইসলাম ও জবির সাবেক শিবির নেতারা বিজয়ীদের শুভেচ্ছা জানান।
শীর্ষ তিন পদসহ ১৬টিতে জয়ী শিবির প্যানেল
কেন্দ্রীয় সংসদে ২১টি এবং হল সংসদের একমাত্র ছাত্রী হলে ১৩টি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে কেন্দ্রীয় সংসদে ১৫৭ জন এবং হল সংসদে ৩৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ৩৮টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। মোট ভোটার ১৬ হাজার ৪৪৫ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ৮ হাজার ৪৭৯ এবং পুরুষ ভোটার ৮ হাজার ১৭০ জন।
নির্বাচনে ভিপি পদে ৫ হাজার ৫৫৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন ছাত্রশিবির সমর্থিত অদম্য জবিয়ান ঐক্য পরিষদের প্রার্থী রিয়াজুল ইসলাম। তার তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদল ও ছাত্র অধিকার পরিষদ জোটের নির্ভীক জবিয়ান ঐক্য পরিষদের প্রার্থী এ কে এম রাকিব পেয়েছেন ৪ হাজার ৬৮৮ ভোট।
জিএস পদে ৫ হাজার ৪৭৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন শিবির সমর্থিত পরিষদের আব্দুল আলিম আরিফ। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী খাদিজাতুল কুবরা পেয়েছেন ২ হাজার ৩৭৯ ভোট। এজিএস পদে জয় পাওয়া মাসুদ রানা পেয়েছেন ৫ হাজার ২০ ভোট, তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আতিকুর রহমান তানজিল পেয়েছেন ৪ হাজার ২২ ভোট।
এছাড়া আরো আট পদে বিজয়ী হয়েছেন অদম্য জবিয়ান ঐক্য পরিষদের প্রার্থীরা।
এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্র সম্পাদক পদে নুরনবী, শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক পদে ইব্রাহিম খলিল, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক পদে নুর মোহাম্মদ, সমাজসেবা ও শিক্ষার্থী কল্যাণ সম্পাদক পদে মোস্তাফিজুর রহমান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে সুখীমন খাতুন, আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক পদে হাবিব মোহাম্মদ ফারুক আযম, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পদে নওশীন নাওয়ার জয়া এবং ক্রীড়া সম্পাদক জর্জিস আনোয়ার নাঈম।
অন্যদিকে শীর্ষ পদ না পেলেও দুটি পদে জয় পেয়েছে ছাত্রদল-ছাত্র অধিকার পরিষদের নির্ভীক জবিয়ান ঐক্য পরিষদ। এর মধ্যে একটি পরিবহন সম্পাদক পদে মাহিদ হাসান, পাঠাগার ও সেমিনার সম্পাদক পদে রিয়াসাল রাকিব এবং সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক পদে তাকরিম আহমেদ।
এ ছাড়া কার্যকরি সদস্য পদে সাতটির মধ্যে চারটিতে জয় পেয়েছেন শিবির সমর্থিত প্রার্থীরা। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে প্রথম সদস্য হয়েছেন ফাতেমা আক্তার। এ ছাড়া মোহাম্মদ আকিব হাসাম, শান্তা আক্তার এবং আব্দুল্লাহ আল ফারুক এ প্যানেল থেকে নির্বাচিত হন।
বাকি তিন সদস্যের মধ্যে সাদমান সাম্য ও ইমরান হাসান ইমন ছাত্রদল সমর্থিত নির্ভীক জবিয়ান ঐক্য পরিষদের। অন্যজন মো. জাহিদ হাসান স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করে জয়ী হন।
একমাত্র ছাত্রী হলে ১০ পদে জয়ী শিবির প্যানেল
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র ছাত্রী হল নওয়াব ফয়জুন্নেসা হল সংসদের ভোটে ভিপি, জিএস, এজিএসসহ ১০ পদে জয় পেয়েছেন অদম্য জবিয়ান ঐক্য পরিষদের প্রার্থীরা। এর মধ্যে ভিপি হয়েছেন জান্নাতুল উম্মে তারিন। জিএস নির্বাচিত হন সুমাইয়া তাবাসসুম ও এজিএস রেদোয়ানা খাওলা। এছাড়া সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক ফারজানা আক্তার, সংস্কৃতি সম্পাদক ফাতেমা-তুজ-জোহরা, পাঠাগার সম্পাদক ফাতেমা তুজ জোহরা সামিয়া, ক্রীড়া সম্পাদক সাবিকুন-নাহার, সমাজসেবা ও শিক্ষার্থী কল্যাণ সম্পাদক ফারজানা আক্তার এবং স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক মোছা. খাদিজা খাতুন।
হল সংসদে কার্যনির্বাহী সদস্য হন সাবরিনা আক্তার, নওসিন বিনতে আলম, মোছা. সায়মা খাতুন ও লস্কর রুবাইয়া জাহান।
কেন্দ্রের বাইরে বিএনপি-জামায়াতের মুখোমুখি অবস্থান
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ১৯ বছর পর প্রথমবার ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের বৃহত্তম দুই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে চলছে উত্তেজনা। জকসু ভোটকেন্দ্রের বাইরে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছেন। গতকাল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে মুখোমুখি অবস্থান নিতে দেখা যায় তাদের।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল গেটের বাইরে শিক্ষার্থী সহযোগিতা কেন্দ্রের মধ্যে অবস্থান নিয়েছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। ছাত্রদলের সহযোগিতা কেন্দ্রের মধ্যে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবের নেতৃত্বে বিএনপি ও তাদের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সকাল থেকে অবস্থান নিতে দেখা যায়।
অন্যদিকে ছাত্রশিবিরের সহযোগিতা কেন্দ্রের মধ্যে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের সমাজসেবা সম্পাদক শাহীন আহমদ খানের নেতৃত্বে মহানগর দক্ষিণ জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মীরা অবস্থান নিয়েছেন।
ব্যালট বাক্স খুলতে গিয়ে আহত পোলিং এজেন্ট
ভোট গণনা চলাকালীন একটি ব্যালট বাক্স খুলতে গিয়ে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে জ্ঞান হারিয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থী মিথুন চন্দ্র দাশ। মেডিকেল টিমের তত্ত্বাবধানে জবি শিক্ষক সমিতির কার্যালয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয় তাকে। গতকাল সন্ধ্যায় জকসু নির্বাচন কমিশনের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষে এ ঘটনা ঘটে।
এ বিষয়ে নাট্যকলা বিভাগের চেয়ারম্যান ক্যাথরিন পিউরিফিকেশন আমার দেশকে বলেন, দীর্ঘ সময় না ঘুমানোর কারণে ক্লান্ত শরীর ছিল। এর মাঝে ব্যালট বাক্স খোলার সময় টেবিলে হাতের কনুইয়ে কোনোভাবে আঘাত লাগে, যা খুব সম্ভব নার্ভে লেগেছে, যার কারণে হঠাৎ চেয়ার থেকে পড়ে যান। পরে শিক্ষক সমিতির কার্যালয়ে আনা হলে চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে থেকে তিনি এখন কিছুটা সুস্থ আছেন। চিকিৎসক এক্স-রে করার পরামর্শ দিয়েছেন। এখনো এখানেই চিকিৎসা চলমান।
এসআই
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

