সিন্ডিকেটের কারসাজিতে চালের বাজারে অস্থিরতা

সরদার আনিছ

সিন্ডিকেটের কারসাজিতে চালের বাজারে অস্থিরতা
ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় বাজেট ঘোষণার আগেই অস্থির হয়ে উঠেছে চালের বাজার। পাইকারি ও খুচরা বাজারে সব ধরনের চালের দাম সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে পাঁচ টাকা আর এক মাসে সর্বোচ্চ ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। সাধারণ ব্যবসায়ীদের দাবি, এলসি বন্ধ থাকায় মিল মালিকদের কারসাজি এই মূল্যবৃদ্ধির কারণ। ক্রেতাদের অভিযোগ, অসাধু সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে মিল মালিকরা বলছেন, বাজারে ধানের সরবরাহ কমের পাশাপাশি দাম বাড়তির দিকে থাকায় চালের বাজার ঊর্ধ্বমুখী। যদিও সরকারের পক্ষে থেকে বলা হয়েছে, বাজেটকে ঘিরে কোনো পণ্যের দামই বাড়েনি।

তবে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) গতকাল সোমবারের বাজার দরের তালিকাতেও চালের দাম বাড়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, এক মাসের ব্যবধানে সরু জাতের চাল এক দশমিক ২৯ শতাংশ, মাঝারি জাতের দুই দশমিক ৫০ শতাংশ, মোটা জাতের চাল তিন দশমিক ৭০ শতাংশ বেড়েছে।

বিজ্ঞাপন

সোমবার রাজধানীর ইসলামপুরের বাবুবাজার, নয়াবাজার ও কারওয়ানবাজারসহ বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সব ধরনের চালের দামই ঊর্ধ্বমুখী। এ প্রসঙ্গে গতকাল তেজগাঁও এলাকার চাঁদপুর রাইস এজেন্সির মালিক বাচ্চু মিয়া আমার দেশকে বলেন, বোরো মৌসুমের ধান ওঠার পরও মাস না পেরোতেই বাজারে চালের মূল্যবৃদ্ধি কোনোভাবেই কাম্য নয়। দেশের বিশাল চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে ১০-১২টি বড় করপোরেট কোম্পানি। তারা আগেই বিপুল পরিমাণ ধান কিনে মজুত করেছে।

এখন তারা বাজারে ধানের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে চালের দাম বাড়াচ্ছে।

তিনি বলেন, ঈদের আগের তুলনায় মিনিকেট চালের দাম মানভেদে বস্তাপ্রতি ৫০০ টাকা এবং আটাশ জাতের চাল ৩০০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এতে মিনিকেট চাল কেজিপ্রতি ৮ থেকে ১০ টাকা, আর আটাশ দুই থেকে তিন টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

এই ব্যবসায়ী বলেন, চাল আমদানির এলসি বন্ধ থাকায় করপোরেট হাউসগুলো বাজারে বড় ধরনের কারসাজি শুরু করেছে। তারা কৌশলে দাম বাড়াচ্ছে। এই ব্যবসায়ীর মতে, আমদানি এলসি চালু থাকলে সিন্ডিকেট করে চাল বাড়াতে পারবে না। তাই সরকারের উচিত বাজার মনিটরিংয়ের পাশাপাশি এলসি চালু করা।

কারওয়ানবাজারের খুচরা চাল ব্যবসায়ী খলিলুর রহমান বলেন, শুধু মিনিকেট কিংবা আটাশ চালের দাম বাড়েনি। নাজিরশাল চালের দামও কেজিপ্রতি চার থেকে পাঁচ টাকা বেড়েছে। আমরা কয়েকদিন আগে ৭৮ টাকা বিক্রি করলেও এখন বিক্রি করতে হচ্ছে ৮২-৮৩ টাকা কেজি। এছাড়া মানভেদে পোলাওর চালের দামও ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

একই বাজারের মায়ের দোয়া স্টোরের ইমাম উদ্দিন বাবলু আমার দেশকে বলেন, সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিপ্রতি আটাশ ও পাইজাম জাতের চালের দাম পাঁচ টাকা বেড়ে ৬০ টাকা, নাজিরশাইল ১০ টাকা বেড়ে ৮০ থেকে ৯০ টাকা, মিনিকেট পাঁচ টাকা বেড়ে ৮০ থেকে ৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

তিনি বলেন, শুধু চাল নয়, আটা-ময়দার দামও কেজিতে পাঁচ টাকার মতো বেড়ে বর্তমানে দুই কেজির আটার প্যাকেট ১২০ ও ময়দা ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া সয়াবিন তেলসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামও বেড়েছে।

বাবুল আরো জানান, সোমবার বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম বাজার পরিদর্শনে এসে তার দোকান থেকে বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের দামের তথ্য নিয়েছেন। মন্ত্রণালয় থেকেও এমন তথ্য জানানো হয়েছে।

গতকাল কারওয়ানবাজারে চাল কিনতে আসা কামাল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণার আগেই বাজারে তোড়জোড় শুরু হয়। কয়েক দিনে হুট করে যে হারে চালের দাম বাড়ল, তাতে আমাদের মতো নিম্নআয়ের মানুষের সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে। বাজারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, যে যার মতো দাম বাড়াচ্ছে।

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, মিল মালিকরা চালের দাম বাড়িয়ে দেওয়ায় তারা বেশি দামে কিনে বাড়তি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

অন্যদিকে, পাইকারি বিক্রেতাদের অভিযোগ, বড় বড় করপোরেট কোম্পানি ও মিলার চাল মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। বিশেষ করে বাজেটকে সামনে রেখে তারা কৌশলে দাম বাড়িয়ে অধিক মুনাফা লুফে নিচ্ছে।

চালের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নজরদারি আরো জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন ক্রেতারা। বাজারে কোনো ধরনের মজুতদারি বা কারসাজি হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (সংগ্রহ) মো. মনিরুজ্জামান আমার দেশকে বলেন, এতদিন দাম কম থাকায় কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিলেন। এখন ধান-চালের দাম কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকরা দাম পেতে শুরু করেছে। তবে খুব বেশি বাড়লে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের হাতে অনেকগুলো পথ আছে। প্রাইভেট পর্যায়ে এলসির অনুমতিসহ আমদানি বাড়িয়ে দেওয়া এবং সরকারের হাতে মজুত প্রচুর খাদ্যপণ্য ওএমএসের মাধ্যমে বিক্রি বাড়িয়ে দিলেই বাজার নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কিছু নেই।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা নাম ও পদবি প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বক্তব্য দেওয়ার জন্য আমি কনসার্ন পারসন নই, এরপরও বলছি—বাজারে চালের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করতে শিগগিরই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। মনিটরিং টিম নিয়মিত বাজার তদারকি করছে এবং কোনো সিন্ডিকেটের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ প্রসঙ্গে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের আমার দেশকে বলেন, বাজেটের আগেই দুদফা তেল-গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কারণে বাজারে চালসহ অনেক নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার অনেক পণ্যের ওপর থেকে কর ও শুল্ক কমানোর ঘোষণা দিয়েছে এর সুবিধা সাধারণ মানুষ না-ও পেতে পারে। এছাড়া তদারকি সংস্থাগুলোর এক প্রকার নিশ্চুপ থাকার কারণে মনে হচ্ছে, অসাধু ব্যবসায়ীদের ক্রেতার পকেট কাটতে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। তাই বাজেটের ইতিবাচক প্রভাব নির্ভর করছে সরকারের বাজেট পরিকল্পনা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের ওপর।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন