নৃশংস খুন-ধর্ষণে উদ্বেগ বাড়ছে দেশজুড়ে

আল-আমিন

নৃশংস খুন-ধর্ষণে উদ্বেগ বাড়ছে দেশজুড়ে

দেশে সাম্প্রতিক সময়ে নৃশংস হত্যা, ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, গণপিটুনি, নারী নিপীড়নসহ পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে গেছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, তুচ্ছ সামাজিক বিরোধ, মূল্যবোধের অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা, মাদকের বিস্তার ও অনলাইনে বিদ্বেষমূলক কনটেন্টের প্রভাব মানুষের মধ্যে সহিংস ও নির্মম প্রবণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এসব ঘটনার শিকার হচ্ছে শিশুরাও। বিশেষ করে পল্লবীর রামিসা হত্যাকাণ্ড সারা দেশের বিবেকবান মানুষকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।

এদিকে একটির পর একটি নৃশংস ঘটনার কারণে অপরাধীদের মধ্যে ভয়ভীতি কমে যাচ্ছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। শুধু সাধারণ মানুষই নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও হামলার শিকার হচ্ছেন। সব মিলিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা ও জনমনে আস্থার সংকট ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনীগুলোকে। আবার এসব অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে যারা গ্রেপ্তার হচ্ছেন, তারা আইনের ফাঁক গলিয়ে দ্রুত মুক্তি পাওয়ায় পরিস্থিতি আরো খারাপ হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে সামাজিক অস্থিরতা বেড়েছে। এই অস্থিরতা থেকে মুক্তি পেতে হলে আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য সংস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি নিরপেক্ষ ও রাজনৈতিক চাপমুক্ত থেকে দায়িত্ব পালন করতে পারে, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস আরো শক্তিশালী হবে। আর এতে সামাজিক অপরাধসহ নৃশংস ঘটনা কমে আসবে।

অপরাধ বিজ্ঞানীদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে নৃশংস ও সহিংস অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা এবং মাদকের প্রভাব বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে। তাই পারিবারিক বন্ধনকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ানো জরুরি।

এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, ‘কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিলে তাৎক্ষণিক তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘যে কোনো অপরাধের বিচার হওয়া জরুরি। বিচারের শক্ত বার্তা না যাওয়ার কারণে এসব অপরাধ বাড়ছে।’

সাবেক আইজিপি ও পুলিশ-তাত্ত্বিক নুরুল হুদা বলেন, অপরাধ দমনে পুলিশকে শক্ত মনোবল নিয়ে মাঠে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিও জরুরি।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশের নিচু স্তর থেকে শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যন্ত বড় ধরনের পরিবর্তন শুরু হয়। অবকাঠামোগত সমস্যা ও ভেঙে পড়া মনোবল নিয়ে মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের নিয়ে নতুন নেতৃত্ব যাত্রা শুরু করে। গণঅভ্যুত্থানের পর বন্ধ হয়ে যাওয়া থানাগুলো পুনরায় চালু করা হয়। নানা মহল ও ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রমূলক আন্দোলন মোকাবিলা করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে পুলিশ। তবে এখন পর্যন্ত পুরোপুরি সফল হতে পারেনি তারা।

সাম্প্রতিক নৃশংস ঘটনা

গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর আগে ১৭ মে রাজধানীর মুগদার মান্ডা এলাকা থেকে পলিথিনে মোড়ানো মাথাবিহীন সাত টুকরো লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরকীয়া ও আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে মোকাররম নামের এক যুবককে হত্যা করা হয়েছে বলে জানা যায়। ৯ মে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় আন্দালিব সাদমান রাফি (৯) নামে এক শিশুকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। অনলাইনে জুয়ার টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। পরে অভিযুক্তের বাড়ির স্যানিটারি ল্যাট্রিনের রিং স্ল্যাবের ভেতর থেকে রাফির বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করা হয়। একই দিনে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় শারমিন আক্তার, তার তিন সন্তান ও ভাইসহ পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। আর্থিক লেনদেন, পরকীয়া ও পারিবারিক কলহের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরে অভিযুক্ত স্বামী ফোরকানের লাশও উদ্ধার করা হয়।

গত ১৫ এপ্রিল আসাদুল হক নামের এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। ১৪ এপ্রিল যাত্রাবাড়ীর কাজলায় পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে কলেজছাত্রী মাহাদিয়া হাসান নবনী ওরফে দিয়ামনিকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় তার মা, বোন ও ভাই গুরুতর আহত হন। ১২ এপ্রিল মোহাম্মদপুরে এলেক্স ইমন নামে এক যুবককে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। প্রেমঘটিত বিরোধের জেরে ১৫ মার্চ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর রাকিবুল ইসলামকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর আগে ২৭ ফেব্রুয়ারি মতিঝিলে মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহকে হত্যা করে তার লাশ সাত টুকরো করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তার রুমমেট শাহীন আলমের বিরুদ্ধে।

পুলিশের ওপরও বাড়ছে হামলা

শুধু অপরাধ সংঘটনই নয়, অপরাধ ঠেকাতে গিয়ে হামলার শিকার হচ্ছেন পুলিশ সদস্যরাও। গত ২০ মে রাজধানীর মিরপুরের বাউনিয়াবাদ এলাকায় বস্তি উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে বিক্ষুব্ধ লোকজন পুলিশের ওপর হামলা চালায়। এতে সাতজন পুলিশ সদস্য আহত হন। এর আগে ১১ মে মোহাম্মদপুরে ছিনতাইকারী ধরতে গেলে পুলিশের ওপর হামলা করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ফাঁকা গুলি ছোড়ে।

উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ৬৩২ জন নারী। একই বছর ধর্ষণের শিকার হন ৭৮৬ জন নারী, তাদের মধ্যে ৫৪৩ জনই শিশু। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৭৮ জন নারী।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপির) ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের ডাটা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডিএমপিতে খুন হয়েছে ১৭ জন। নারী ও শিশু ধর্ষণ হয়েছে ৭০ জন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৯৮ জন এবং অপহরণের শিকার হয়েছেন ২১ জন।

মার্চ মাসে শুধু ডিএমপিতেই খুন হন ২৪ জন। এছাড়া ধর্ষণ ৫৬টি, নারী ও শিশু নির্যাতন ৫৫টি এবং অপহরণের ঘটনা ঘটে ২০টি। বিভিন্ন অপরাধে মামলা হয়েছে এক হাজার ৩০৫টি।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের গত তিন মাসে দেশে ১২৮ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে ৩৫ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩১ ও মার্চে সবচেয়ে বেশি ৬১ জন। শুধু গত মার্চেই ছয় বছরের নিচে পাঁচজন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। সাত থেকে ১২ বছরের ১৪ জন শিশু ধর্ষণের শিকার। তাদের মধ্যে একজন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার। ১৩ থেকে ১৮ বছরের ১০ জন, ১৯ থেকে ২৪ বছরের চারজন, ২৫ থেকে ৩০ বছরের তিনজন, ৩০ বছরের বেশি ২৬ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিলে বিভিন্ন সহিংসতায় নিহত ২২ জন এবং পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ২৯৪ নারী ও শিশু। এর মধ্যে ৯ নারী ও শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত দেশে প্রায় ৭৭০টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে আড়াই শতাধিক হত্যার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার পেছনে পরিকল্পিত হত্যা, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

মামলা করতে ভয় পাচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবার

সূত্র জানায়, হত্যা-নির্যাতনের শিকার হলেও অনেক পরিবার আসামির হুমকির মুখে মামলা করার সাহস পায় না। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ মামলা নিতে অনীহা প্রকাশ করে অথবা প্রভাবশালী আসামিরা রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় জামিনে বেরিয়ে এসে ভুক্তভোগী পরিবারকে এলাকা ছাড়া করার হুমকি দেয়। এসব কারণে মামলা করা হয় না। ফলে প্রকৃত চিত্র থেকে যায় আড়ালে।

সমাধান যে পথে

সূত্র জানায়, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে পুলিশের মনোবলকে শক্তিশালী করতে হবে। কারণ, বিভিন্ন ভীতি থেকে পুলিশ মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে পারছে না। গণঅভ্যুত্থানের পর কিছু অপরাধী পুলিশ কর্মকর্তা গ্রেপ্তার ও আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর ফলে পুলিশের মধ্যে এক ধরনের ভীতি রয়েছে। কেবল অপরাধীরাই আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়াবে। কোনো নিরাপরাধকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে না—এই সাহস পুলিশের শীর্ষ নেতৃত্বকে মাঠ পর্যায়ে সদস্যদের দিতে হবে। তাহলে পুলিশ শক্ত মনোবল ফিরে পাবে। তখন অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।

সূত্র জানায়, আগে কমিউনিটি পুলিশিং খুবই শক্তিশালী ছিল। এটিকে আগের মতো শক্তিশালী করতে হবে। পুলিশকে যাতে অপরাধ দমন করতে জনগণ উৎসাহ প্রদান করে এজন্য সামাজিক বিভিন্ন কাজে পুলিশকে মাঠ পর্যায়ে অংশগ্রহণ করতে হবে। তাহলে নৃশংস অপরাধসহ সামাজিক অপরাধ কমবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন