হামের মধ্যেই চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু, ছড়িয়েছে ৫৮ জেলায়

গোলাম মোস্তফা

হামের মধ্যেই চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু, ছড়িয়েছে ৫৮ জেলায়

এক সময় ডেঙ্গুর মৌসুম বলতে শুধু বর্ষাকালকেই বোঝানো হতো। কিন্তু গত কয়েক বছরে সে ধারণা পাল্টে গেছে। এডিস মশার জীবনচক্রের পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং জনসচেতনতার ঘাটতির কারণে এখন শীত-গ্রীষ্মেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে।

রাজধানী ছাড়িয়ে রোগটি এখন গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। চলতি বছর হামের ভয়াবহ প্রকোপের মধ্যেই আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু। ইতোমধ্যে ৫৮ জেলায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোতে ডেঙ্গুর রোগী বেশি দেখা যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসের প্রথম ২১ দিনেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন এক হাজার ৭০৩ জন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় দুজনের মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্ত হয়েছেন ২২০ জন—যা চলতি বছরে এক দিনে সর্বোচ্চ আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ড। এর আগে মে মাসে আক্রান্ত ছিলেন ৭১৪ জন এবং এপ্রিলে ৬৪০ জন। অর্থাৎ, সংক্রমণের হার ধারাবাহিকভাবে বাড়ছেই।

আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে বরিশাল বিভাগে। যদিও এখন পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক কম, তবুও মৌসুম শুরুর আগেই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও কীটতত্ত্ববিদরা। একইসঙ্গে খোদ সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রীও শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, এবার ডেঙ্গু মোকাবিলা সহজ হবে না। ডেঙ্গু এখন আর সাধারণ কোনো রোগ নয়, এটি পুরো জাতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এডিস মশার প্রজননের অনুকূল সময়। মে মাসের পর জমে থাকা পানিতে মশার ডিম দ্রুত লার্ভায় পরিণত হয় এবং থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে প্রজনন আরো বাড়ে। আগে ঢাকাকে ডেঙ্গুর প্রধান কেন্দ্র হিসেবে দেখা হলেও এখন এটি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের মতে, বছরব্যাপী মশক নিধন কার্যক্রমে উদাসীনতা, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব এবং সমন্বিত উদ্যোগের ঘাটতির কারণেই পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।

দেশে প্রথম ডেঙ্গু শনাক্ত হয় ২০০০ সালে। সে সময় রোগটি ‘ঢাকা ফিভার’ নামে পরিচিত ছিল। পরে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এটি ডেঙ্গু জ্বর বলে শনাক্ত করেন এবং সে বছর থেকেই প্রথম ডেঙ্গু রোগীর তথ্য রেকর্ড করা হয়। ওই বছর ডেঙ্গুতে ৯৩ জনের মৃত্যু হয় এবং আক্রান্ত হন পাঁচ হাজার ৫৫১ জন। পরবর্তী এক দশকের বেশি সময় রোগটির প্রকোপ সীমিত থাকলেও ২০১৯ সালে তা ভয়াবহ রূপ নেয়। ওই বছর এক লাখ এক হাজার ৩৫৪ জন আক্রান্ত হন এবং ১৭৯ জন মারা যান।

তবে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয় ২০২৩ সালে। সে বছর ডেঙ্গুতে মারা যান এক হাজার ৭০৫ জন এবং আক্রান্ত হন তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন। তখন দেশের ৬৪ জেলাতেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৪ সালে আক্রান্ত হন এক লাখ এক হাজার ২১৪ জন এবং মৃত্যু হয় ৫৭৫ জনের। ২০২৫ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল এক লাখ দুই হাজার ৮৬১ এবং মৃত্যু হয় ৪১৩ জনের।

চলতি বছরের ২১ জুন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছেন মোট চার হাজার ৯০০ জন। এর মধ্যে প্রায় ৬২ দশমিক ৭ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশ নারী। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত বরিশাল বিভাগে। সেখানে রোগীর সংখ্যা এক হাজার ২৯৭ জন। আক্রান্তের সংখ্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ, যেখানে রোগী ৯৭২ জন। বরিশাল বিভাগের ছয় জেলাতেই ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলক বেশি। এর মধ্যে বরিশাল জেলায় আক্রান্ত ৩৪৪, পিরোজপুরে ২৯৭, পটুয়াখালীতে ২৪৪, ঝালকাঠিতে ২৩০, বরগুনায় ১১৮ এবং ভোলায় ৬৪ জন।

এডিস মশা নির্মূলে অভিযান

ডেঙ্গু মোকাবিলায় জাতীয় কমিটি পুনর্গঠন করেছে সরকার। একইসঙ্গে রাজধানীসহ সারা দেশে তিন মাসব্যাপী বিশেষ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। গত ৬ জুন রাজধানীতে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এ সময় তিনি বলেন, জনসচেতনতার পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কোথাও লার্ভা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু চিকিৎসা জোরদার করা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি ফিল্ড হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চালু করা হচ্ছে ডেঙ্গু কর্নার। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোও ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ৮০ শতাংশ ফ্রি করা হয়েছে। রোগী শুধু ওষুধ ও খাবার খচর বহন করবে।

গত কদিন আগে ‘বর্ষাপূর্ব এডিস মশার লার্ভা জরিপ ২০২৬’-এর ফলাফল প্রকাশ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। জরিপে ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৮টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৬৩টি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে ডিএনসিসির ৫৪ ওয়ার্ডের ৫৪৬টি স্কুলে লার্ভিসাইডিং, ফগিং ও নোভানিউরন ট্যাবলেট প্রয়োগের মাধ্যমে মশকনিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এছাড়াও মশার উপদ্রব কমানোর কাজে ভূমিকা নিলে পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছে সংস্থাটি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এবার ‘রিঅ্যাকটিভ’ নয়; বরং ‘প্রো-অ্যাকটিভ’ কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থাৎ, সমস্যা বড় আকার ধারণ করার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন প্রসঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসাদুজ্জামান আমার দেশকে বলেন, আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি; কিন্তু এখনো রোগী ভর্তির কার্যক্রম শুরু হয়নি। সরকারের নির্দেশনা পেলেই রোগী ভর্তি শুরু হবে।

ডেঙ্গু মোকাবিলায় ঘাটতি

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ফগিং করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত নজরদারি এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা ছাড়া কার্যকর ফল পাওয়া যাবে না।

তারা বলছেন, শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। বাসাবাড়ি ও আশপাশে কোথাও পানি জমতে না দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার আমার দেশকে বলেন, আমরা দুই যুগেও মশা নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। কেননা, এডিস মশা শুধু পরিষ্কার পানিতে নয়, ময়লা পানিতেও ডিম পাড়তে পারে। কৃত্রিম আলোর কারণে এখন রাতেও এ মশা দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ঢাকায় এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু ঢাকার বাইরে তো ডেঙ্গু মশা নিয়ন্ত্রণে কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয় না। মশা নিয়ন্ত্রণে সার্ভিলেন্স কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে এবং ডেঙ্গুর হটস্পটগুলোকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানী অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী বলেন, ডেঙ্গু এখন বছরব্যাপী রোগে পরিণত হয়েছে। এ মাসেও থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। এরকম বৃষ্টি হতে থাকলে মশা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। আর ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারি পর্যায়ের পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়েও তৎপরতা বাড়ানোসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন