আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

তরুণ ও নারী ভোটারের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি

মাহফুজ সাদি, সাইদুর রহমান রুমী, বেলাল হোসেন ও পীর জুবায়ের

তরুণ ও নারী ভোটারের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হাসিনা আমলের বিগত তিনটি নির্বাচন ছিল বিনা ভোট, রাতের ভোট ও ডামি ভোট হিসেবে পরিচিত। টানা ১৫ বছর নির্বাচনে ভোট দিতে না পারায় এবার ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও সংস্কার প্রশ্নে গণভোট নিয়ে মানুষের আগ্রহ ছিল ব্যাপক। একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ এই নির্বাচনে ভোটারের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে ভোটকেন্দ্রগুলোতে তরুণ প্রজন্ম ও নারী ভোটারের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি লক্ষ করা গেছে। এমনকি তাদের রায়েই জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে বলেও মনে করছেন অনেকে।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সারা দেশে ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রের ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি ভোটকক্ষে একযোগে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। বড় ধরনের কোনো অঘটন ছাড়াই কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদ দিলে উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ শেষ হয়। রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব আসনের ভোটকেন্দ্রে বিপুলসংখ্যক ভোটারের উপস্থিতি দেখা গেছে।

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘদিন পর ভোট দেওয়ার সুযোগ পাওয়ায় এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে এবারের নির্বাচন হওয়ায় ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ করা যায়। প্রতিটি কেন্দ্রে ভোটারদের ভোর থেকেই লাইন ধরতে দেখা গেছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে ভোটারদের উপস্থিতিও। এর মধ্যে তরুণ ও নারী ভোটারদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিতে দেখা যায়। অনেকেই সপরিবারে ভোট দিতে আসেন।

তবে প্রথমবার ভোট দেওয়া তরুণ ভোটারদের উচ্ছ্বাস প্রকাশ ছিল চোখে পড়ার মতো। আগে ভোটার হওয়া তরুণেরাও বিগত তিন নির্বাচনে ভোট দিতে না পারায় এবার আগেভাগে কেন্দ্রে আসেন। তাদের অনেকে জানিয়েছেন, ২০০৮ সালের পর এবারই তারা ভোটকেন্দ্রে এসেছেন। নারী ভোটারদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে।

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্যানুযায়ী, ১৮ থেকে ৩৭ বছরের ভোটারদের তরুণ হিসেবে ধরলে তাদের সংখ্যা হয় ৫ কোটি ৫৬ লাখ ৫২ হাজার ১৫৭। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ কোটি ৮৮ লাখ ৯৫ হাজার ৫১৩ জন এবং নারী ২ কোটি ৬৭ লাখ ৫৬ হাজার ৬৪৪ জন। তরুণ ভোটারের হার মোট ভোটারের প্রায় ৪৪ শতাংশ। ফলে এই তরুণ ভোটারদের রায় এই নির্বাচনে জয়ের ক্ষেত্রে নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। তরুণদের একটি বড় অংশ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে থাকায় ভোটের হিসাবে প্রভাব পড়েছে।

ইসির তথ্যমতে, এবার মোট ভোটার ছিল ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন এবং নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন। এছাড়া হিজড়া ভোটার ছিলেন ১ হাজার ২৩২ জন।

পুরুষ ভোটারের চেয়ে নারী ভোটার ২০ লাখের মতো কম হলেও ভোটার উপস্থিতির দিক দিয়ে পুরুষের চেয়ে নারী ছিল অনেক বেশি। পুরুষ ভোটারের লাইনের চেয়ে নারীর লাইনগুলোও ছিল দীর্ঘ। অনেকে কেন্দ্রে পুরুষ ভোটারের লাইন দেখা না গেলেও নারীদের লাইন ধরতে দেখা যায়।

নারী-তরুণ ভোটারের ব্যাপক উপস্থিতি

ঢাকা-৯ আসনের বিভিন্ন কেন্দ্রে বিপুল নারী ও তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। আসনের অনেকগুলো কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, নারী ভোটকেন্দ্রগুলো পুরুষ কেন্দ্রগুলো থেকে বেশি সরগরম ছিল। বিশেষ করে বয়স্কদের তুলনায় তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

এ আসনের মদিনাবাগ ন্যাশনাল স্কুল কেন্দ্রে ভোটার সাম্মি আখতার বলেন, মা এবং ছোট বোনকে নিয়ে ভোট দিতে এসেছি। আমাদের পরিবার এত বছরে কোনো ভোট দিতে পারেনি। এবার আমরা ভোট দিতে লাইনে আছি।

এ কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মেহেদী হাসান জানান, এখানের ২ হাজার ২৮২ জন ভোটারের মধ্যে বেলা ১টা পর্যন্ত ৭১২ জন ভোট দিয়েছেন, যা মোট ভোটের প্রায় ২৭ শতাংশ। এখানের চারটি বুধের সবগুলোতে তরুণ ভোটারদের লাইনটি সবচেয়ে দীর্ঘ দেখা গেছে। মদিনাবাগ কিন্ডারগার্টেন আরেকটি ভোটকেন্দ্রেও নারীদের বিপুল উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। এই কেন্দ্রের ২ হাজার ৬৮৪ জন ভোটারের মধ্যে বেলা ১টা পর্যন্ত প্রায় ৬৫০ কাস্ট হয়েছে।

মান্ডা গ্রিন মডেল-সংলগ্ন ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুল কেন্দ্রে দেখা যায় অনেক নারী ভোট তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন। বেলা আড়াইটা পর্যন্ত এ কেন্দ্রের মোট আটটি বুথে ৩ হাজার ৬৬০ ভোটের মধ্যে ২ হাজার ৩৩০টি ভোট পড়ে। প্রিসাইডিং অফিসার মনির হোসেন জানান, ভোট খুব শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে।

জীবনের প্রথম ভোট দিয়ে উচ্ছ্বসিত তরুণেরা

এবার জীবনের প্রথম ভোট দিতে পারায় উচ্ছ্বসিত তরুণেরা। গতকাল ঢাকা-৪ আসনের শ্যামপুর এলাকার হাজী সলিমুল্লাহ স্কুল ভোটকেন্দ্রে মো. জাহিদুল ইসলাম, মো. রিফাত আহমেদ ও মো. শাহরিয়ার ইসলাম জীবনের প্রথম ভোট দেন। তারা আমার দেশকে জানান, এবারই আমরা জীবনে প্রথম ভোট দিয়েছি। আগের মতো বিশৃঙ্খলা বা জোর করে ভোট নেওয়ার কোনো পরিবেশ নেই।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কথা স্মরণ করে জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা জুলাই আন্দোলন করেছি। গণভোট ও সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে পেরে খুবই আনন্দিত। রিফাত আহমেদ বলেন, আমাদের ভোটে দেশের শাসক নির্বাচিত হবে। অবশ্যই নতুন নির্বাচিত সরকারের কাছে আশা থাকবে তরুণদের নিয়ে যেন আলাদাভাবে ভাবেন। জুলাই স্পিরিট ধারণ করতে হবে বলে জানান এই তরুণ ভোটার।

এ সময় শাহরিয়ার ইসলাম বলেন, ভোটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সুষ্ঠু তদারকিতে কোনো রকম ঝামেলা ছাড়াই সবাই ভোটকেন্দ্রে এসেছেন এবং তাদের ভোট দিয়েছেন।

উৎসবের মতো নারী ভোটারদের ভিড়, শিশুরা ভয়ডরহীন

গতকাল সকাল থেকেই ঢাকা-১১ আসনের ভোটকেন্দ্রগুলোতে উৎসবমুখর পরিবেশে ছিল ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। বিশেষ করে নারী ভোটারদের উপস্থিত ছিল লক্ষণীয়। আর তাদের সঙ্গে আসা শিশুরাও ভয়ডরহীনভাবে খেলার ছলে এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করে ভোট উৎসব উপভোগ করে। উত্তর বাড্ডা ইসলামিয়া কামিল মাদরাসা, একেএম রহমত উল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, বাড্ডা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন কেন্দ্রে এমন চিত্র দেখা যায়।

তাসলিমা জাহান নামের এক ভোটার বলেন, আমি ভোটার হয়েছি আরো আগে। কিন্তু তখন কোনো ভোট দিইনি। এবারই আমার প্রথম ভোট। গতকাল থেকে মুখিয়ে ছিলাম কখন যে ভোট দিতে আসব। এখানে এসে দেখি সবার মধ্যে অন্যরকম এক উৎসব কাজ করছে। আমার সঙ্গে ছেলেকে নিয়ে আসছি। সে তো রাত থেকে ঘুমায়নি।

মুসলিমা বেগম নামে মধ্যবয়সি আরেক ভোটার বলেন, আজ ভোট দিতে এসে মনে হচ্ছে কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে ঘুরতে এসেছি। সবার মধ্যে কত আনন্দ। সবাই হাসি-খুশি। মন খুলে কথা বলতে পারছি একে অন্যের সঙ্গে। বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি করতেছে। মনে হচ্ছে ঈদ। আসলে এবারের মতো ভোট কখনো হয়নি। এই ভোট আয়োজন সব বয়সিরা উপভোগ করছেন।

তিনি বলেন, আগে ভোটের সময় এলে আতঙ্ক কাজ করত। এই বুঝি খারাপ কিছু ঘটে গেল এমন উৎকণ্ঠায় থাকতাম। কিন্তু এখন আর তা নেই। আমরা এমন ভোটাধিকারই চাই।

চট্টগ্রামে ভোট দিয়ে নারী ভোটারদের উচ্ছ্বাস

চট্টগ্রামের বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোট দিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন নারী ভোটাররা। দীর্ঘ সময় তীব্র রোদে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ভোট দিয়েই বাইরে এসেই সেলফিতে মেতে উঠছেন নারী ভোটাররা। ভোটের উচ্ছ্বাসের সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে মুহূর্তগুলোকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রিয়জনকে ট্যাগ দিয়ে লিখছেন মনের নানা অনুভূতি।

নগরের লালখান আয়শা (রা.) মহিলা মাদরাসা কেন্দ্রে জীবনের প্রথম ভোটটি দেন চট্টগ্রাম-১০ আসনের ভোটার মোছাম্মৎ আয়শা আক্তার। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ভোটার হয়েছি বহু আগে। কিন্তু বিগত তিনটি নির্বাচনে ভোট দিতে পারিনি । এজন্য মনের মধ্যে আক্ষেপ ছিল। আজ যখন ভোট দিতে আসলাম একটু নার্ভাস ছিলাম। জুলাই বিপ্লব ভোটের সুযোগ করে দিয়েছে। তাই আজ জুলাই যোদ্ধাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি।

এ সময় নিজে থেকেই অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে এগিয়ে আসলেন সাজেদা আক্তার নামে এক নারী ভোটার। তিনি জানান, দীর্ঘ সময় লাইনে ছিলাম। অনেকে ভোট নিয়ে শঙ্কায় ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা ভোট দিতে পেরে আনন্দিত। নগরের মুন্সিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোটার রিমি আক্তার জানান, আমাদের অনেক কষ্ট হয়েছে ভোট দিতে। দুটি ব্যালট থাকায় ভোটগ্রহণ ধীরগতিতে হচ্ছে। এরপরও শেষ পর্যন্ত ভোট দিতে পেরেছি।

কেন্দ্রে ভোট, বাইরে আড্ডা-সেলফি

ভোট দিয়ে কেন্দ্রের ভেতরে এবং বাইরে তরুণ ভোটারদের সেলফি তুলতে দেখা যায় রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের ভোটকেন্দ্রগুলোতে। অনেককে দলবদ্ধ হয়ে সেলফি তুলতে দেখা যায়। সেই সঙ্গে কেন্দ্রের পাশে তরুণসহ বিভিন্ন বয়সের ভোটারদের জমিয়ে আড্ডাও দিতে দেখা গেছে। এমনকি বিভিন্ন কেন্দ্রে নারী ভোটারদেরও সেলফি তুলতে, আড্ডা দিতে দেখা গেছে। তারা বলেন, বহুদিন পর ভোট দিলাম। ভোটের আনন্দকে স্মরণীয় করে রাখতে সেলফিবাজি হচ্ছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন