বদলে যাচ্ছে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের লেখাপড়া। বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী পাঠ্যবই পরিমার্জন এবং একটি যুগোপযোগী নতুন শিক্ষাক্রম চালুর পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে পাঠ্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে নতুন বেশ কয়েকটি বিষয়। এছাড়া ৬০১টি পাঠ্যবই এবং শিক্ষাক্রম যুগোপযোগী করতে পরিমার্জনের কাজ চলছে বলে জানিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।
গত মঙ্গলবার এনসিটিবি চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক পাটওয়ারী আমার দেশকে বলেন, মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জনের অংশ হিসেবে সম্প্রতি চারদিনব্যাপী নিবিড় কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক পর্যায়ের ৯৭টি এবং প্রাথমিক পর্যায়ের ৩৬টি বই পরিমার্জনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক, অভিজ্ঞ স্কুলশিক্ষকসহ দেশের ৩২০ জন বিশেষজ্ঞ কাজ করছেন।
মাধ্যমিকের বই পরিমার্জনের কাজ শেষ করে এখন প্রাথমিকের বইয়ের কাজ চলছে। আগামী জুনের মধ্যে সব কাজ শেষ করে জুলাইয়ের মধ্যেই মুদ্রণের কাজ শুরুর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এতে আগামী বছরের প্রথম দিনেই শিক্ষার্থীরা শতভাগ নতুন পাঠ্যবই হাতে পাবে বলে জানান তিনি।
এনসিটিবির একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে চতুর্থ, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে তিনটি নতুন বিষয় যুক্ত হচ্ছে। এর মধ্যে চতুর্থ শ্রেণিতে রয়েছে ‘ক্রীড়া ও সংস্কৃতি’, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ এবং সপ্তম শ্রেণিতে ‘জীবন ও কর্মমুখী শিক্ষা’। একই সঙ্গে ইতিহাস, তথ্যপ্রযুক্তি, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও মানসিক স্বাস্থ্যশিক্ষায় নতুন অধ্যায় সংযোজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাধ্যমিক স্তরের বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা বইয়ে কয়েকটি নতুন বিষয় সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ ও পড়াশোনাকে আনন্দদায়ক করতে নতুন বৈচিত্র্যময় এসব বিষয় পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করা হচ্ছে। শিশুদের শারীরিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করা এবং ডিজিটাল আসক্তি কমাতে সাতটি গেমসের ভিত্তিতে বইগুলো সাজানো হয়েছে। এমন সব বই প্রণয়ন করা হচ্ছে, যাতে তারা আনন্দের সঙ্গে শিখতে পারে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল শিক্ষা (টিভিই) বিষয়ে একটি উদ্দীপনামূলক বইও আগামী বছর যুক্ত করা হচ্ছে।
পরিমার্জনে প্রাধান্য পাচ্ছে মহান মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সেক্টর ও ফোর্সের বিস্তারিত বর্ণনা, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা এবং নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ভূমিকা। এছাড়া জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধকালীন ও রাজনৈতিক ভূমিকা সম্পর্কেও নতুন অধ্যায়ে বিস্তারিত তথ্য যুক্ত হতে পারে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ইতিহাসের উপস্থাপনাকে আরো তথ্যনির্ভর ও ভারসাম্যপূর্ণ করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বইয়েও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে। পুরোনো বিষয়বস্তু বাদ দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবটিকস, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। শিক্ষাবিদদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তুলতেই এ পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
নতুন পাঠ্যক্রমে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। চতুর্থ শ্রেণিতে ‘ক্রীড়া ও সংস্কৃতি’ নামে আলাদা বিষয় চালুর পাশাপাশি মাধ্যমিক স্তরেও খেলাধুলা ও সংস্কৃতিকে পাঠ্যক্রমের অংশ করা হবে।
এতে ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার, অ্যাথলেটিকস, দাবা ও দেশীয় সংস্কৃতিভিত্তিক বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হবে সরাসরি অংশগ্রহণ ও ব্যবহারিক কার্যক্রমের ভিত্তিতে।
এনসিটিবি জানিয়েছে, শুধু বিষয়বস্তু নয়; পাঠ্যবইয়ের ভাষা, শব্দচয়ন ও বানানেও সংশোধন আনা হচ্ছে। পাশাপাশি বইয়ের প্রচ্ছদ, ছবি, মানচিত্র ও অলংকরণেও নান্দনিক পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের বয়স ও মানসিক বিকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ছবি, বাণী, প্রবাদ ও ক্যাপশন ব্যবহারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এদিকে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি আগামী জুন মাস থেকে নতুন শিক্ষাক্রম পরিমার্জনের কাজও শুরু হচ্ছে, যা ২০২৮ সাল থেকে ধাপে ধাপে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন করা হতে পারে বলে জানা গেছে।
পাঠ্যবইয়ের পরিমার্জন সম্পর্কে এনসিটিবি চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক পাটওয়ারী আমার দেশকে বলেন, দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বিচ্যুতি ও একপেশে ইতিহাস সংশোধন করে প্রকৃত সত্য তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছে এনসিটিবি। একই সঙ্গে পাঠ্যবইয়ে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস যুক্ত করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। নতুন সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী পাঠ্যবই পরিমার্জন এবং একটি যুগোপযোগী নতুন শিক্ষাক্রম চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, অতীতে পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাসের যে বিচ্যুতি ঘটেছিল, এবার তা বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে সংশোধন করা হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বীর নায়কদের কার কী অবদান, তা সঠিকভাবে পাঠ্যবইয়ে স্থান পাবে। ইতিহাসের একপেশে স্বীকৃতি সংশোধন করে প্রকৃত সত্য তুলে ধরা হবে। এছাড়া নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের সঠিক ও বিস্তারিত ইতিহাস পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এনসিটিবি চেয়ারম্যান বলেন, প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ইংরেজি ভার্সনসহ সব স্তরের মোট ৬০১টি পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জন করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা যাতে ২০২৭ সালের শুরুতেই পরিমার্জিত ও নির্ভুল বই হাতে পায়, সে লক্ষ্যে দ্রুত কাজ এগিয়ে চলছে।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ ও পড়াশোনাকে আনন্দদায়ক করতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে তিনটি নতুন বৈচিত্র্যময় বই যুক্ত করা হচ্ছে।
আইসিটি বইয়ের আমূল পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান বইগুলো অনেকটা পুরোনো হয়ে গেছে। আমরা ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বইগুলো প্রায় নতুনভাবে সাজাচ্ছি। সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো হয়েছে।
শিক্ষাক্রমে পরিবর্তন সম্পর্কে মাহবুবুল হক পাটওয়ারী বলেন, বর্তমান সরকার নির্বাচনি অঙ্গীকার অনুযায়ী শিক্ষার্থীবান্ধব নতুন কারিকুলাম নিয়ে কাজ করছে। এর মূল দর্শন হবে ‘অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা’। এতে বইয়ের সংখ্যা কমবে এবং ব্যবহারিক শিক্ষার পরিধি বাড়বে।
তিনি আরো বলেন, ২০২৭ সালের জন্য আমরা পাঠ্যবই পরিমার্জনের কাজ করছি। তবে ২০২৮ শিক্ষাবর্ষে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একটি পূর্ণাঙ্গ নতুন কারিকুলামও হতে পারে।
এদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেছেন, বর্তমান বিশ্বের চাহিদা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ কর্মবাজারের বাস্তবতায় ৫০ বছর আগের কারিকুলাম দিয়ে আর নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তাই সরকার যুগোপযোগী, দক্ষতাভিত্তিক ও বাস্তবমুখী নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়নে কাজ করছে, যা ২০২৮ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে চালু করা হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

