ক্রসফায়ার-গুমের আড়ালে খুনিরা কি বেঁচে যাচ্ছে

আবু সুফিয়ান ও সাইদুর রহমান রুমী

ক্রসফায়ার-গুমের আড়ালে খুনিরা কি বেঁচে যাচ্ছে

দেশের আলোচিত ব্লগার হত্যাকাণ্ডগুলোর তদন্ত এবং বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে জনমনে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত প্রশ্ন রয়েছে। তদন্ত সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে হত্যাকাণ্ডের কথিত ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে চিহ্নিত মুকুল রানা এবং আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আরাফাত রহমানের মামলার নথিপত্র ও পারিপার্শ্বিক ঘটনাপ্রবাহে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হয়েছে।

তৎকালীন পুলিশের ভাষ্য, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) নামে কথিত সংগঠনের মাস্টারমাইন্ড শরিফুল ওরফে মুকুল রানা ২০১৬ সালের ১৯ জুন ঢাকার মেরাদিয়ায় পুলিশের সঙ্গে ক্রসফায়ারে নিহত হন। তবে এই মৃত্যুর পর বেরিয়ে আসা তথ্য ও ঘটনার কালক্রম রহস্যের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, মুকুল রানা কি সত্যিই খুনিদের প্রধান ছিলেন, নাকি তাকে সাজানো গল্পে ‘বলির পাঁঠা’ বানানো হয়েছিল?

বিজ্ঞাপন

একইভাবে, আরাফাতের সাজা প্রাপ্তির ভিত্তি এবং হেফাজতে থাকাকালীন জবানবন্দি আদায়ের প্রক্রিয়া নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত জাতীয় গুম সংক্রান্ত কমিশনসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা তথ্য-প্রমাণসহ প্রশ্ন তুলেছে। মুকুল রানা ও আরাফাতের মামলা এবং তদন্তের খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করলে তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা এবং বিচারিক স্বচ্ছতার জটিল চিত্র ফুটে ওঠে।

মুকুল রানার ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়; সে সময় তার স্ত্রীর বড়ভাই বি এম মুজিবুর রহমানসহ কয়েকজনকে গুম করার পর পুরস্কার ঘোষণাও করা হয়েছিল।

পুলিশের দাবি অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ১৯ জুন রাত পৌনে তিনটায় খিলগাঁওয়ের মেরাদিয়া এলাকায় তল্লাশির সময় মোটরসাইকেলে থাকা তিনজন পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। পাল্টা গুলিতে একজন নিহত হয়, যাকে পরে মুকুল রানা হিসেবে শনাক্ত করা হয়। কিন্তু ঘটনার নাটকীয় মোড় আসে তখন, যখন মুকুলের পরিবার দাবি করে তাকে চার মাস আগেই আটক করা হয়েছিল।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি মুকুল রানা তার স্ত্রীকে নিয়ে যশোর হয়ে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার পথে বসুন্দিয়া বাজার থেকে সাদা পোশাকের একদল লোক তাকে হাতকড়া পরিয়ে তুলে নেয়। স্থানীয় ভ্যানচালক শেখ জাহিদুল ইসলাম এবং মুকুলের স্ত্রী পিয়ারী খাতুন এই অপহরণের প্রত্যক্ষদর্শী।

মুকুলকে তুলে নেওয়ার দুদিন পর ২৫ ফেব্রুয়ারি তার শ্যালক আমির হোসেন যশোর কোতোয়ালী থানায় এ বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং- ১৩৪৪) করেন। অর্থাৎ, যে ব্যক্তিকে ১৯ জুন ‘পলাতক জঙ্গি’ হিসেবে ক্রসফায়ারে নিহত দেখানো হলো, সেই ব্যক্তি চার মাস আগে থেকেই নিখোঁজ ছিলেন এবং তার পরিবার আইনিভাবে তাকে খুঁজছিল।

হেফাজতে থাকাকালীন যেভাবে হত্যা

মুকুল রানার মৃত্যুর ঘটনাটি আরো জটিল হয়ে ওঠে যখন ডিবির তৎকালীন কর্মকর্তা (বর্তমানে পলাতক) মনিরুল ইসলামসহ শীর্ষ ব্যক্তিরা তাকে (মুকুল) ব্লগার নাজিমউদ্দিন সামাদ ও জুলহাজ মান্নান হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত করেন। পরিবার ও থানার জিডি অনুযায়ী, মুকুল রানা ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে গুম ছিলেন।

মুকুল রানার স্ত্রীর ভাই বিএম মুজিবুর রহমান গত ১৪ মে আমার দেশকে বলেন, ‘একজন ব্যক্তি যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে থাকেন, তবে তিনি কীভাবে এপ্রিল মাসে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের মাঠপর্যায়ে নেতৃত্ব দিলেন?’

তৎকালীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান এই ঘটনা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিচার না করে ‘সরিয়ে দেওয়া’র ফলে প্রকৃত মাস্টারমাইন্ডদের তথ্য পাওয়ার সুযোগ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। কথিত বন্দুকযুদ্ধের বর্ণনায় পুলিশ জানায়, মোটরসাইকেলের তিন আরোহীর মধ্যে শুধু মুকুলই ১০টি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান, অথচ বাকি দুজন অক্ষত অবস্থায় পালিয়ে গেলেন।

মুকুলের বাবা আবুল কালাম আজাদ ছিলেন সাতক্ষীরার ধুলিহর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য। সেই সময় তিনি আক্ষেপ করে গণমাধ্যমে বলেছিলেন, ‘আমার ছেলে অপরাধী হলে আদালতে বিচার হতো। কিন্তু চার মাস আটকে রেখে কেন মেরে ফেলা হলো?’

মুকুলের স্ত্রীর বড়ভাই বিএম মুজিবুর রহমানও একই অভিযোগ করেছিলেন। এমনকি অভিজিৎ রায়ের বাবা অধ্যাপক অজয় রায় ও স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাও এই ‘ক্রসফায়ারে’ অসন্তোষ প্রকাশ করে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।

মুকুলের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ‘তাৎক্ষণিক বিচার’ বা ক্রসফায়ারের পথ বেছে নিলেও, আরেক অভিযুক্ত তরুণ আরাফাতকে গুম ও নির্যাতনের পর জবরদস্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করার অভিযোগ উঠেছে। মুকুলের মৃত্যু যেখানে অনেক রহস্যের ইতি টেনে দিয়েছিল, আরাফাতের মৃত্যুদণ্ডাদেশ সেখানে জন্ম দিয়েছে বিচারিক স্বচ্ছতা নিয়ে।

গুমের পর ‘জঙ্গি নাটকে’ ফাঁসির দণ্ড

জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন ও সাজানো জবানবন্দির ভিত্তিতে ব্লগার হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তরুণ আরাফাতের জীবনে নেমে আসা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের চিত্র উঠে এসেছে জাতীয় গুম সংক্রান্ত কমিশনের প্রতিবেদনে (৭ আগস্ট, ২০২৫)। নথি অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ৬ অক্টোবর আরাফাত গুম হন। এরপর ১০ অক্টোবর পরিবার জিডি করলেও পুলিশ তা আমলে নেয়নি।

কমিশনের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ওই বছরের ৭ অক্টোবর থেকে ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত তিনি অবৈধ হেফাজতে গুম ছিলেন। এই সময়ের মধ্যেই তাকে সাজানো মামলায় অভিযুক্ত করা হয়।

এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া আরাফাত জীবিকার প্রয়োজনে আউটসোর্সিং করতেন এবং তাবলিগ জামাতে সময় দিতেন। ২০১৭ সালের ৬ অক্টোবর আমিনবাজার থেকে সিটিটিসি লেখা জ্যাকেট পরা একদল ব্যক্তি তাকে তুলে নিয়ে যায়।

গুম সংক্রান্ত কমিশনের সদস্যরা আরাফাতের বক্তব্য নিয়েছিলেন। কমিশনকে আরাফাত বলেন, গ্রেপ্তারের পর আমাকে বলা হয়েছিল, ‘আজ তোকে এমন মার দেব যে, একেবারে বিছানায় পড়ে যাবি। আমরা যা বলব, ঠিক সেভাবেই কাজ করবি’। এরপর তারা আমাকে এমন একজন বিচারকের কাছে নিয়ে গেল, যিনি পুলিশের কথা মতোই কাজ করছিলেন। যখন আমি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি দিতে রাজি হচ্ছিলাম না, তখন পুলিশ ও সংশ্লিষ্টরা বলাবলি করছিল— ‘আসামি তো সুস্থ আছে, তবে কেন জবানবন্দি দিচ্ছে না?’ তাদের কথাবার্তায় ইঙ্গিত ছিল যে, জবানবন্দি আদায়ের জন্য বিচারকের পেছনে কিছু ‘উপরি’ খরচ বা অনৈতিক লেনদেন করতে হবে।

ম্যাজিস্ট্রেটও পুলিশের সুরে সুর মিলিয়ে বলছিলেন, ‘আপনাদের আসামি তো ঠিকঠাক স্বীকারোক্তি দিচ্ছে না।’ অথচ আমি অনেক সাহস করে ম্যাজিস্ট্রেটকে বলেছিলাম, ‘স্যার, আমি গত কয়েকদিন ধরে গুম ছিলাম। আমি এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত নই’।

আমার এই আর্তনাদ শুনে সাহায্য করার বদলে ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশকে ডেকে বললেন, ‘দেখুন, আসামি কী বলছে!’ এরপর আমাকে আদালতের বারান্দার একটি নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে প্রচণ্ড মারধর করা হয়। গ্রিলের সঙ্গে আমার মাথা ঠুকে দেওয়া হয়েছিল। হাতকড়া পরা অবস্থায় আমি মাথা বাঁচানোর চেষ্টা করলে হাতে আঘাত পাই। আমার চিৎকার শুনে ম্যাজিস্ট্রেট শুধু বিরক্তি প্রকাশ করে জানতে চেয়েছিলেন ‘বাইরে এত শব্দ হচ্ছে কেন?’ পুরো বিচারিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাটিই যেন এভাবে সাজানো ছিল।

আরাফাতের বাবা মমিনুল হক আমার দেশকে বলেন, ‘আমার ছেলেকে অন্ধকার কক্ষে উল্টো ঝুলিয়ে পেটানো, ইলেকট্রিক শক এবং ওয়াটারবোর্ডিংয়ের মাধ্যমে নির্যাতন করা হয়। শেষে ক্রসফায়ারের হুমকি দিয়ে কর্মকর্তাদের শেখানো মিথ্যা জবানবন্দি দিতে তাকে বাধ্য করা হয়।’

তদন্তে চরম গাফিলতি

আদালতের নথি বিশ্লেষণে জানা গেছে, রাজধানীর উচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় লেখক অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যা করা হলেও রহস্যজনকভাবে ঘটনাস্থলের কোনো সিসিটিভি ফুটেজ জনসমক্ষে বা আদালতে প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা রক্তমাখা চাপাতির ফিঙ্গারপ্রিন্ট, ডিএনএ বা ফরেনসিক টেস্টের মাধ্যমে প্রকৃত আসামিদের শনাক্ত করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি তৎকালীন প্রশাসন।

প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে দীপনের নিজ অফিসে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মার্কেটের সিসিটিভি ফুটেজ জব্দ করা হলেও তা কখনো প্রকাশ করা হয়নি। মার্কেটের সিকিউরিটি গার্ডরা প্রত্যক্ষদর্শী হওয়া সত্ত্বেও তাদের কাউকে সাক্ষী করা বা ন্যূনতম জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন বোধ করেনি তদন্ত সংস্থা। উদ্ধার করা আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা না করেই নিরীহ ব্যক্তিদের এই মামলায় অভিযুক্ত করা হয়।

অ্যাক্টিভিস্ট জুলহাজ মান্নান হত্যাকাণ্ডের পর হামলাকারীরা পালিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের সঙ্গে ধ্বস্তাধস্তি হয়। সিসিটিভি ফুটেজে তাদের দৃশ্য ধরা পড়লেও রহস্যজনক কারণে কাউকে ধরা হয়নি। ঘটনাস্থলের পাশ থেকে চাপাতি ও পিস্তল উদ্ধার করা হলেও সেগুলোর ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে অপরাধী শনাক্তের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শত শত প্রত্যক্ষদর্শী থাকা সত্ত্বেও তাদের বর্ণনা অনুযায়ী স্কেচ তৈরির কোনো উদ্যোগও দেখা যায়নি।

তৎকালীন আলোচিত বিচারক মুজিবুর রহমান (যাকে সম্প্রতি বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে) আসামিপক্ষের অকাট্য প্রমাণ ও লোকেশন চেক করার আবেদন অগ্রাহ্য করে এই রায় দেন।

অভিযোগ রয়েছে যে, তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে হাসিনা সরকার আন্তর্জাতিক মহলে দেশকে জঙ্গি রাষ্ট্র হিসেবে চিত্রিত করে ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার ভয়ঙ্কর খেলায় মেতেছিল। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও ইসলামপন্থিদের দমনে তদন্তকে ‘জগাখিচুড়ি’ পাকিয়ে ফেলা হয়। প্রশ্ন উঠছে—প্রকৃত খুনিরা কি তাহলে আজও ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাবে?

এ বিষয়ে তৎকালীন তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কাউকে পাওয়া যায়নি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...