নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিরাপত্তা জোরদারে আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্বাচন ভবনের সুরক্ষায় বসানো শতাধিক আধুনিক সিসি ক্যামেরা মূলত কোনো কাজেই আসছে না। সিটি করপোরেশনের লাগানো গাছের কারণে ঢাকা পড়েছে ক্যামেরাগুলোর ‘রেঞ্জ’।
ফলে গাছের আড়াল থেকে ককটেল বা বোমা ছুড়ে কোনো অপরাধী পালিয়ে গেলেও তাকে শনাক্ত করার কোনো উপায় নেই। ইসির এই বিপুল অর্থের খরচকে এখন খোদ কর্মকর্তারাই দেখছেন ‘উচ্চাভিলাষী অপচয়’ হিসেবে।
এখন সিটি করপোরেশনের লাগানো গাছ কাটার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়ার চিন্তা করছে ইসি। তবে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা সাংবিধানিক সংস্থা ইসির অদক্ষতা। অর্থ লুটপাটের জন্য এ প্রকল্প নিয়েছে। এখন যিনি বা যারা গাছ অপসারণের জন্য চিঠি পাঠাবেন, তাকে পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকর্তা হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। ইসির নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ আমার দেশকে বলেন, নির্বাচন ভবনের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। যদি ক্যামেরা মুভমেন্টে কোনো প্রতিবন্ধতা থাকে, তা নিজেদের উদ্যোগে অপসারণের চেষ্টা করা হবে। যদি সেটা সম্ভব না হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে বিষয়টির সুরাহা করার অনুরোধ জানানো হবে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয় ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর। ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোটগ্রহণ পর্যন্ত নির্বাচন ভবন এবং এর সামনের এলাকায় মিছিল, স্লোগান, অনশন, বিক্ষোভ, হামলা এবং ককটেল বিস্ফোরণের একাধিক ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় নির্বাচন আয়োজনকারী সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তা সক্ষমতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই সময় সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনা, হামলা ও ককটেল বিস্ফোরণের স্থিরচিত্র ও ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করছে বর্তমান কমিশন। এসব তথ্যউপাত্তের ভিত্তিতে নির্বাচন ভবনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশের পরিকল্পনাও রয়েছে।
ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন শতাধিক গোপন ক্যামেরার কার্যকারিতা শুরুতেই হোঁচট খেয়েছে। নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (ইটিআই) ও নির্বাচন ভবনের বাইরের সড়কের ডিভাইডারে সিটি করপোরেশনের লাগানো বড় বড় গাছ ক্যামেরার দৃষ্টিসীমা আড়ালে পড়ায় এ জটিলতায় পড়েছে ইসি। শঙ্কা দেখা দিয়েছে, এ স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ কিংবা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঘটলে জড়িতদের শনাক্ত করা যাবে না। তাই ঢাকঢোল পিটিয়ে নিরাপত্তা জোরদারের নামে নির্বাচন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষায় নেওয়া এ উদ্যোগই উল্টো প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এ অবস্থায় গাছ অপসারণের জন্য নির্বাচন কমিশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) শাখা। কমিশন সম্মতি দিলে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের আগারগাঁও এলাকায় নির্বাচন ভবনের আশপাশের গাছ কর্তন বা অপসারণে সিটি করপোরেশনকে চিঠি দেওয়া হতে পারে।
আইসিটি শাখার একাধিক কর্মকর্তা জানান, ইসির আইডিয়া প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক নির্বাচন ভবন ও নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ভবনের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলতে দুই ধাপে মোট পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছিলেন। এর মধ্যে প্রথম ধাপে আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে ১২০টি নতুন সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। হিক নামের একটি প্রতিষ্ঠান তিন বছরের ওয়ারেন্টি-গ্যারান্টিসহ এসব ক্যামেরা স্থাপনের কাজ করে। এই ভবনের তৃতীয় তলায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও সচিবের কার্যালয় এবং চতুর্থ তলায় চার নির্বাচন কমিশনারের দপ্তরকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় আনা হয়েছে। শুধু এই দুই তলায়ই ১৮-২০টি করে ক্যামেরা বসানো হয়েছে। নির্বাচন ভবনের চার কোনায় চারটি, নির্বাচন ভবন ও ইটিআই ভবনের মাঝামাঝি এলাকায় দুটি, লেকের পাড়ে একটি এবং ইটিআই ভবনের সামনে একটি পোল স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া সিঁড়ি ও লিফট এলাকা বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত অন্ধকার বা ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিটি ফ্লোরে গড়ে আটটি করে ক্যামেরা বসানো হয়েছে। পুরো এলাকাকে নজরদারির আওতায় আনতে উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিম দিকে আটটি ওয়াচ টাওয়ারও স্থাপন করা হয়েছে।
তবে ভবনের ভেতরে আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলেও বাইরের পরিস্থিতি ঠিক উল্টো। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ভেতরে নিরাপত্তাব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত করা হলেও বাইরের ক্যামেরাগুলোর সামনে গাছের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অংশ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে, নির্বাচন কমিশনের বিদ্যমান নিরাপত্তাব্যবস্থার চিত্রও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। নির্বাচন ভবন ও ইটিআই ভবনে আগে থেকেই ১৫২টি সিসি ক্যামেরা আছে। এর মধ্যে সচল আছে ১১২টি এবং অচল বা অকেজো অবস্থায় রয়েছে ৪০টি। এগুলো তদারকি বা সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হওয়ার পথে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকি না হলে নতুন স্থাপিত ক্যামেরাগুলোর অবস্থাও পুরোনোগুলোর মতো হতে পারে। সেক্ষেত্রে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত নিরাপত্তা অবকাঠামো শুধু আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি বজায় রাখবে, অপরাধী শনাক্তে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না।
ইসির সিস্টেম ম্যানেজার প্রকৌশলী রফিকুল হক নতুন সিসি ক্যামেরা স্থাপনের বিষয়টি নিশ্চিত করে আমার দেশকে বলেন, এটি আইডিয়া প্রকল্পের একটি প্রস্তাব ছিল। ওই প্রস্তাবের আলোকে আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে শতাধিক সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়।
পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ এবং ওয়াটারকিপার অ্যালায়েন্সের নির্বাহী পরিষদের সদস্য শরীফ জামিল আমার দেশকে বলেন, সিটি করপোরেশনের গাছের কারণে ইসির বসানো ক্যামেরায় বাইরে দৃশ্য ধারণে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে বলে যে আওয়াজ তোলা হচ্ছে, তা সংরক্ষিত গাছ কেটে বিক্রির ধান্ধা। দুর্নীতির নতুন ফন্দি।
ইসির উদ্দেশে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, প্রকল্প রিভাইজ না করে ইসির যিনি বা যে কর্মকর্তা গাছ কেটে নেওয়ার জন্য সিটি করপোরেশনকে চিঠি দেবেন, ওই কর্মকর্তাকে পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকর্তা হিসেবে চিহ্নিত করা হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


বিএনপি নেতার কাছে যুবদল নেতার চাঁদা দাবি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অভিযোগ