চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে পুলিশের বয়স জালিয়াতির নির্মম ঘানি টানতে হচ্ছে তিনটি অসহায় পরিবারকে। সম্প্রতি আদালত থেকে জামিন পেয়ে তিন শিশু ঘরে ফিরলেও তাদের ঘাড় থেকে নামেনি মিথ্যা মামলার আইনি বোঝা। অভাবের সংসারে একদিকে আইনজীবীর ফি জোগানোর তাগিদ, অন্যদিকে শিশুদের কারাগার থেকে মুক্ত করতে গিয়ে চড়া সুদে নেওয়া ঋণের বোঝা—সব মিলিয়ে আইনের রক্ষকদের অনৈতিক জিঘাংসার চড়া মাশুল দিতে হচ্ছে দিন এনে দিন খাওয়া পরিবারগুলোকে। কারাগার থেকে শিশুরা ঘরে ফিরলেও পুলিশি জালিয়াতির কারণে তৈরি হওয়া ঋণের বোঝা, আইনি লড়াইয়ের খরচ আর সামাজিক অপমানের তীব্র ঘানি টানতে হচ্ছে নিঃস্ব পরিবারগুলোকে।
অপ্রাপ্তবয়স্কদের প্রাপ্তবয়স্ক সাজিয়ে কারাগারে পাঠানোর গুরুতর এ আইনি লঙ্ঘনের বিষয়ে সন্দ্বীপ উপজেলা সমাজসেবা ও প্রবেশন কর্মকর্তা মোহসীন আলম বলেন, সামাজিক অনুসন্ধান প্রতিবেদন ও দালিলিক প্রমাণ যাচাই করে গত ২১ মে আদালত এই শিশুদের জামিন দেয়। তবে আইন অনুযায়ী ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন থাকার পরও তাদের প্রাপ্তবয়স্ক দেখানো আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন ছিল। কোনো শিশুকে সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে রাখা আইনত দণ্ডনীয়।
গত ২৫ এপ্রিল সন্দ্বীপের সারিকাইত ইউনিয়নে মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় (মামলা নং-০৬, তারিখ ২৫.০৪.২০২৬) মিনহাজ, ইমরান ও শাওন নামে তিন শিশুকে প্রাপ্তবয়স্ক সাজানোর ভয়াবহ জালিয়াতির চিত্র উঠে আসে। অভিযোগ করা হয়, মামলার এজাহারে জেনেশুনে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের বয়স বাড়িয়ে সাধারণ কয়েদি হিসেবে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। এজাহারে ৭ নম্বর আসামি মিনহাজের বয়স ১৯ বছর উল্লেখ করা হলেও জন্মনিবন্ধন অনুযায়ী তার বর্তমান বয়স মাত্র ১৫ বছর। একই ভাবে ৪ নম্বর আসামি ইমরান হোসেন নিলয়কে ২০ বছর দেখানো হলেও তার প্রকৃত বয়স ১৭ বছর। এছাড়া ৮ নম্বর আসামি শাওনের বয়স মাত্র ১৪ বছর বলে নিশ্চিত করেছেন তার স্বজনরা।
সবচেয়ে মানবিক সংকটে পড়েছে ১৫ বছর বয়সি কিশোর মিনহাজের পরিবার। মিনহাজ তার আট সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। তার বাবা মোশাররফ হোসেন একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, চোখে ভালো দেখতে পান না। ঘরে রয়েছে তার আরো তিনটি ছোট অবুঝ ভাইবোন। মা সুফিয়া বেগম অন্যের ঘরে ঝিয়ের কাজ করেন। উপার্জনক্ষম ছেলেকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাওয়ার পর পরিবারটি যেমন অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটিয়েছে, তেমনি তাকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে গিয়ে চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়েছে।
মিনহাজের মা সুফিয়া বেগম বলেন, ‘হুতেরে (সন্তানকে) জেলেত্তে বাইর করতে হাজার হাজার টাকা ধার-কর্জ করতে হইছে। এই ঋণের টাকা শোধ করুম কেমনে, আর মামলার খরচই বা কোত্থেকে দিমু?’
এ ঘটনায় সন্দ্বীপ থানার দুই পুলিশ সদস্যকে অভিযুক্ত করে পুলিশ সদর দপ্তরে অভিযোগ দায়ের করেছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। বাংলাদেশের শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন থাকার পরও জেনেশুনে বয়স বাড়িয়ে অপ্রাপ্তবয়স্কদের প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণ কারাগারে পাঠানো একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন।
এ বিষয়ে সন্দ্বীপ থানার ওসি সুজন হালদার বলেন, কিশোরদের বয়সসংক্রান্ত বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এজাহারে অসংগতির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে যদি মাঠপর্যায়ের কোনো কর্মকর্তার দায়িত্বে অবহেলা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আচরণের প্রমাণ মেলে, তবে আইন অনুযায়ী কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আদালতের আদেশে শিশুরা কারাগার থেকে মুক্ত হলেও পুলিশের এমন জালিয়াতি ও দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ডের কারণে তিনটি অসহায় পরিবারকে যে দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগ আর ঋণের ঘানি টানতে হচ্ছে, তার বিচার কে করবে—সে প্রশ্নই এখন সন্দ্বীপের সর্বস্তরের মানুষের মুখে মুখে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ১৮ কিলোমিটার যানজট