চট্টগ্রামে একের পর এক খুন, জেলাজুড়ে আতঙ্ক

এম কে মনির, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামে একের পর এক খুন, জেলাজুড়ে আতঙ্ক

চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক খুনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। প্রকাশ্য দিবালোকে ভারী অস্ত্র নিয়ে সন্ত্রাসীদের চলাফেরা, গুলি করে প্রতিপক্ষ ও পথচারীদের হত্যা, ঘরে ঢুকে মা-মেয়ে ও শিশুসন্তানকে কুপিয়ে হত্যা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর ওপর হামলা, এমনকি পুলিশের ক্যাম্প পর্যন্ত বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনাও ঘটছে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও মহানগরে। বালি, মাটি, মাদকসহ বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বই মূলত এসব সন্ত্রাসী ঘটনার কারণ। পরপর ঘটে যাওয়া এসব খুনের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মাঝে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

একই দিন রাউজান ও আনোয়ারায় তিনটি হত্যাকাণ্ডের পর চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে। সবশেষ গত শনিবার দুপুরে জেলার রাউজানে আবারও দিনদুপুরে গুলি করে এক যুবদল নেতাকে হত্যা করে পালিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। একই দিন রাতে আনোয়ারা উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নে ঘরে ঢুকে মা-মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

বিজ্ঞাপন

এ ঘটনায় ওই নারীর এক শিশুসন্তানকেও কুপিয়ে আহত করে তারা। রক্তাক্ত অবস্থায় ওই শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করেছেন স্থানীয়রা। এসব খুনের ঘটনার অধিকাংশেরই সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক মাধ্যমে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়েছে। হত্যাকারীদের পরিচয়ও প্রকাশ পেয়েছে। এর পরও তাদের গ্রেপ্তার করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এতে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠছে, তেমনি জেলাজুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। পুলিশ বলছে, শনিবার রাউজান ও আনোয়ারার ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়াও জেলার সবকটি ঘটনা আমলে নিয়ে শিগগির পুলিশ বড় ধরনের অভিযান শুরু করবে।

সূত্র জানায়, শনিবার দুপুর ১টার দিকে রাউজানের পাহাড়তলী চৌমুহনী চত্বরে মাকসুদুল হক চৌধুরী নামে এক যুবদল নেতাকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, পাহাড়তলী বাজারে প্রকাশ্যে ভারী অস্ত্র নিয়ে হাঁটছে পাঁচজনের একটি সন্ত্রাসী দল। একটি অটোরিকশায় এসে বাজারে নামে তারা। এ সময় যুবদল নেতাকে টার্গেট করে গুলি করা হয়। পরে বাজারে ফাঁকা গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে পালিয়ে যায় তারা। সন্ত্রাসীদের তিনজনের হাতে ছিল পিস্তল, আর দুজনের হাতে ছিল শটগান। পাঁচজন মিলে দফায় দফায় গুলি করে হত্যা করে মাসুদকে।

এদিকে একইদিন রাত ১২টায় জেলার আনোয়ারা উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নে চেনামতি বড়ুয়াপাড়ায় ঘরে ঢুকে মা-মেয়েকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ সময় এক শিশু আহত হয়। স্থানীয়রা জানান, রাত ১২টায় বড়ুয়াপাড়ার সুজন বড়ুয়ার ঘরে হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। ঘরের ভেতরেই তার স্ত্রী এ্যানি বড়ুয়া, মেয়ে পিয়ন্তী বড়ুয়া ও ছেলে পিয়াস বড়ুয়াকে কুপিয়ে আহত করে চলে যায় সন্ত্রাসীরা। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে এ্যানি বড়ুয়া ও পিয়ন্তী বড়ুয়ার মৃত্যু হয়। ১২ বছরের শিশু পিয়াস বড়ুয়া এখনো গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন।

এর আগে গত ৮ মে চট্টগ্রামের বায়োজিদের রউফাবাদে প্রকাশ্যে একদল সন্ত্রাসী রাজু নামে এক যুবককে গুলি করে হত্যা করে। এ সময় দোকানে পান আনতে গিয়ে চোখে গুলিবিদ্ধ হয় রেশমি আক্তার নামে ১২ বছরের এক কন্যাশিশু। ১২ দিন হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে থাকার পর রেশমির মৃত্যু হয়। এ হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাতও জেলার রাউজান উপজেলায়। নিহত রাজু ঘটনার কদিন আগে রাউজানের কদলপুর থেকে নগরীর রউফাবাদে বোনের বাড়িতে বেড়াতে এসে হত্যার শিকার হন। রাউজানে অবশ্য এমন ঘটনা নতুন নয়। দেড় মাস আগেও এক যুবদল কর্মীকে একই কায়দায় গুলি করে হত্যা করা হয়।

এর আগে গত বছরের ৫ নভেম্বর নগরের বায়োজিদের চালিতাতলী এলাকায় বিএনপির গণসংযোগে গুলি চালিয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী সরোয়ার বাবলাকে হত্যা করা হয়। একই ঘটনায় মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ গুলিবিদ্ধ হন। একই বছরের ২৯ মার্চ রাতে বাকলিয়ায় একটি প্রাইভেটকারে সরোয়ার বাবলাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে তার প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসীরা। এতে বখতিয়ার হোসেন মানিক ও আব্দুল্লাহ নামে তার দুই সহযোগীর মৃত্যু হয়। এরপর ২৩ মে নগরের পতেঙ্গায় আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবরকে গুলি করা হয়; পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী সূত্রে জানা যায়, গত দেড় বছরে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলা মিলিয়ে অর্ধশতাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে শুধু রাউজানেই খুন হয়েছেন ২৫ জন, যার ২০টিই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। এলাকায় আধিপত্যের পাশাপাশি নদীর বালি, পাহাড়ের মাটি, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বই মূল কারণ বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ সময় গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে একাধিক। এসব ঘটনায় সাড়ে ৩০০ মানুষ আহত হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম জানান, রাউজানে যুবদল নেতা হত্যা ও আনোয়ারায় মা-মেয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে রাউজানের সন্ত্রাসীরা দুর্গম পাহাড়ে পালিয়ে যাওয়ায় আমরা গ্রেপ্তার করতে পারিনি। তারা দুর্গমতার সুযোগ নিয়ে বারবার এমন ঘটনা ঘটাচ্ছে। তবে সন্ত্রাসীরা কোন এলাকায় আছে, সেটা চিহ্নিত করা হয়েছে। অতিদুর্গম এলাকা হওয়ায় সেখানে অভিযান চালানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে তাদের কর্ডন (ঘেরাও) করে ফেলা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকেও পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে । যেকোনো সময় বড় ধরনের অভিযান চালিয়ে তাদের দমন করা হবে। তিনি আরো জানান, অধিকাংশ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণ অভিন্ন এবং হাতেগোনা কয়েকটি গ্রুপ পুরো জেলাকে অস্থির করে তুলছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সবকিছুই পর্যালোচনা করছে। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...