মৃত্যুফাঁদে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক

সীতাকুণ্ডে ট্রমা সেন্টারের অভাবে ঝরছে প্রাণ

জহিরুল ইসলাম, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)

সীতাকুণ্ডে ট্রমা সেন্টারের অভাবে ঝরছে প্রাণ
ছবি: আমার দেশ

ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই অংশ এখন যেন এক নীরব মৃত্যুফাঁদ। দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই অর্থনৈতিক করিডরে প্রতিদিনই ঘটছে ছোট-বড় সড়ক দুর্ঘটনা। কোনো দিন বাসের সঙ্গে ট্রাকের সংঘর্ষ, কোনো দিন কনটেইনারবাহী কাভার্ডভ্যানের ধাক্কা, আবার কোনো দিন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ঝরে যাচ্ছে তাজা প্রাণ।

দুর্ঘটনায় আহতদের অনেকেই সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্ঘটনাপ্রবণ এই মহাসড়কের পাশে আজও গড়ে ওঠেনি একটি আধুনিক ট্রমা সেন্টার। ফলে প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পরই অসহায়ভাবে দেখতে হয় প্রাণহানির মর্মান্তিক দৃশ্য।

বিজ্ঞাপন

দেশের বাণিজ্য, শিল্প ও আমদানি-রপ্তানির প্রধান প্রবেশপথ হিসেবে পরিচিত ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের এই অংশ দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করে। যাত্রীবাহী বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, কনটেইনারবাহী যান, মোটরসাইকেল ও ভারী শিল্পকারখানার পরিবহন একসঙ্গে চলাচল করায় সড়কটি দিন দিন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বেপরোয়া গতি, অসচেতন চালনা, ওভারটেকিং এবং যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রায়ই ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।

বিশেষজ্ঞ ডাক্তার জোবায়দুল হুদা জুয়েল আমার দেশকে বলেন, দুর্ঘটনার পর প্রথম এক ঘণ্টাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় গোল্ডেন আওয়ার বলা হয়। এই সময়ের মধ্যে আহত ব্যক্তিকে বিশেষায়িত চিকিৎসা দেওয়া গেলে মৃত্যুহার অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।

কিন্তু সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই এলাকায় আধুনিক ট্রমা সেন্টার না থাকায় গুরুতর আহতদের দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা নগরীর অন্যান্য হাসপাতালে পাঠাতে হয়। দীর্ঘ পথ, যানজট ও সময়ক্ষেপণের কারণে অনেক রোগী চিকিৎসার আগেই মারা যান।

সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য ও প. প. কর্মকর্তা ডা. আলতাফ হোসেন জানান, গত বছরের মে মাস থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র এক বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ১ হাজার ১৭৩ জন রোগী সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর বাইরে আরও বহু গুরুতর রোগী সরাসরি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

তিনি বলেন, ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রায় প্রতিদিনই দুর্ঘটনা ঘটছে। শুধু সড়ক দুর্ঘটনাই নয়, শিল্পাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ড, বিস্ফোরণ ও কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় আহত রোগীর সংখ্যাও অনেক। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় আমাদের সক্ষমতা সীমিত।

স্বাস্থ্যসেবার এই সীমাবদ্ধতা আরও প্রকট হয়েছে জনবল সংকটের কারণে। হাসপাতালটিতে মোট ৩৩ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করছেন ৬ জন চিকিৎসক। দীর্ঘদিন ধরে ৩টি পদ শূন্য রয়েছে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ১১টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন ৮ জন। দুজন চিকিৎসক প্রেষণে রয়েছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সার্জারি কনসালট্যান্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য আছে।

সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. সোনিয়া আখতার আমার দেশকে বলেন, হাসপাতালে জেনারেটর না থাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে অনেক সময় অপারেশন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। জরুরি চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে এটি বড় ধরনের সমস্যা।

জনবল সংকটের পাশাপাশি অবকাঠামোগত দুর্বলতাও হাসপাতালটির অন্যতম বড় সমস্যা। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মূল ভবনটি নির্মিত হয়েছিল ১৯৬২ সালে। দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্যবহৃত ভবনটির বিভিন্ন অংশে অবকাঠামোগত দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেই চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। বিষয়টি ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।

বর্তমানে হাসপাতাল ৫০ শয্যার হলেও বাস্তবে রোগীর চাপ কয়েকগুণ বেশি। প্রতিদিন জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ ও ভর্তি রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। অতীতে হাসপাতালটিকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণা দেওয়া হলেও তা এখনো বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।

অন্যদিকে, সীতাকুণ্ড দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল। এখানে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, স্টিল মিল, রি-রোলিং কারখানা, অক্সিজেন প্ল্যান্ট, বিদ্যুৎকেন্দ্র, কেমিক্যাল কারখানাসহ অসংখ্য ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। প্রতিদিন হাজার হাজার শ্রমিক এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। শিল্প দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড কিংবা বিস্ফোরণের ঘটনায় আহতদের চিকিৎসার প্রধান ভরসাও এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিএম কনটেইনার ডিপোর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, বিভিন্ন শিল্পকারখানায় বিস্ফোরণ এবং মহাসড়কে ধারাবাহিক দুর্ঘটনা প্রমাণ করেছে যে, এই অঞ্চলে একটি পূর্ণাঙ্গ জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা কতটা জরুরি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দুর্ঘটনা বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়েনি চিকিৎসা অবকাঠামো।

স্থানীয় সচেতন মহল, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের কর্মী, ব্যবসায়ী, সমাজকর্মী ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা বলছেন, সীতাকুণ্ডের ভৌগোলিক অবস্থান, বিশাল শিল্পাঞ্চল এবং ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুর্ঘটনাপ্রবণতা বিবেচনায় নিয়ে এখানে জরুরি ভিত্তিতে একটি আধুনিক ট্রমা সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

পাশাপাশি হাসপাতালকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা, আধুনিক আইসিইউ ও বার্ন ইউনিট স্থাপন, নতুন হাসপাতাল ভবন নির্মাণ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং শূন্য পদে চিকিৎসক নিয়োগের দাবিও জানিয়েছেন তারা।

তাদের মতে, একটি পূর্ণাঙ্গ ট্রমা সেন্টার চালু করা গেলে সড়ক দুর্ঘটনা ও শিল্প দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এতে কমবে প্রাণহানি, হ্রাস পাবে স্থায়ী পঙ্গুত্বের ঝুঁকি এবং রক্ষা পাবে অসংখ্য মূল্যবান জীবন।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলোর একটিতে প্রতিদিন দুর্ঘটনায় মানুষ মারা গেলেও কেন এখনো গড়ে ওঠেনি একটি আধুনিক ট্রমা সেন্টার? আর কত প্রাণ ঝরলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে?

সীতাকুণ্ড ও মিরসরাইবাসীর প্রত্যাশা, প্রতিদিনের দুর্ঘটনা, শিল্পাঞ্চলের ঝুঁকি এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার এই কঠিন বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। কারণ একটি আধুনিক ট্রমা সেন্টার কেবল একটি হাসপাতাল নয়; এটি হতে পারে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে দুর্ঘটনাকবলিত হাজারো মানুষের জীবন বাঁচানোর শেষ আশ্রয়।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...