খুলনা মহানগরীতে পানি সরবরাহ প্রকল্প-২-এর পরিচালক (পিডি) কে হচ্ছেন, তা নিয়ে খুলনা ওয়াসার বিভিন্ন পর্যায়ে জোর গুঞ্জন চলছে। তালিকায় নাম না থাকা সত্ত্বেও গত বুধবার মৌখিক ডাকে মন্ত্রণালয়ে গিয়ে সাক্ষাৎকারে অংশ নেন এক প্রকৌশলী। অতীতে বিভিন্ন সময়ে নানা অনিয়মে জড়িয়ে বিতর্কিত হয়ে পড়া এই কর্মকর্তা কীভাবে ডাক পেলেন, তা নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে।
অনেকে আশঙ্কা করছেন, ‘বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ’-এর নেতা হিসেবে প্রবল দাপুটে এই প্রকৌশলী পিডির দায়িত্ব পেলে প্রকল্পে অনিয়ম হয়ে নগরবাসীর দুর্ভোগ চরমে পৌঁছাবে।
অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২৫৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্প-২-এর পিডি নিয়োগের জন্য গত বুধবার দুপুরে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব শহীদুল হাসানের সভাপতিত্বে মন্ত্রণালয়ে সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ জন্য অফিশিয়ালি চিঠি পেয়েছিলেন খুলনা ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খান সেলিম আহমেদ, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কামাল হোসেন এবং নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরমান সিদ্দিকী। তবে বিনা চিঠিতে সভায় হাজির হন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলাম। তার এই হঠাৎ হাজিরা বিভিন্ন প্রশ্নের জন্ম দেয়।
ওয়াসা সূত্র জানায়, প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর প্রথমবার এ প্রকল্পের পিডির রুটির দায়িত্ব পান। বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার শেষ কর্মদিবসে মন্ত্রণালয় থেকে তার এ নিয়োগের চিঠি ইস্যু করা হয়েছিল। এ নিয়ে সে সময় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হয়। অভিযোগ ওঠে মোটা অঙ্কের টাকা লেনেদেনের।
খুলনা ওয়াসায় কর্মরত একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, সেদিন আকস্মিকভাবে ওয়াসা পরিচালনা পরিষদের ছাত্র প্রতিনিধি ইব্রাহিম খলিলের সঙ্গে এনসিপির কেন্দ্রীয় এক নেত্রী কয়েকজন সহযোগীসহ ওয়াসা ভবনে আসেন। তারা রেজাউল ইসলামকে পিডি পদে নিয়োগ দিতে মব সৃষ্টি করেন। এরপর তাকে পিডির রুটিন দায়িত্ব দিয়ে মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি ইস্যু করা হয়।
তবে তিনি বেশি দিন এ দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। বিভিন্ন মহলের নিন্দা, সমালোচনা ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ছাত্র সমন্বয়কদের লিখিত অভিযোগ ও প্রতিবাদের মুখে চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক আশরাফুল আফসার স্বাক্ষরিত পত্রে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
এদিকে, সম্প্রতি সাউথ ইস্ট ব্যাংক খুলনা শাখার রেজাউল ইসলাম নামে এক অ্যাকাউন্টধারীর চারটি চেকের ফটোকপি ফাঁস হলে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। চার চেকে প্রায় ১০০ কোটি টাকা লেনদেনের উল্লেখ আছে, যার মধ্যে দুটি চেকে ২৪ কোটি করে এবং বাকি দুই চেকে ২৩ কোটি টাকা করে উল্লেখ আছে।
অ্যাকাউন্টহোল্ডারের হাতে লেখা টাকার অঙ্ক এবং স্বাক্ষর থাকলেও কাকে প্রদান করা হচ্ছে, তা উল্লেখ নেই। নেই কোনো তারিখও। ওয়াসার বিভিন্ন অফিসিয়াল চিঠি ও গাড়ির লগবুকের স্বাক্ষর থেকে হাতের লেখা মিলিয়ে চেকগুলো প্রকৌশলী রেজাউল ইসলামের বলে জোরালো দাবি করেছে ওয়াসার একাধিক সূত্র।
জানা গেছে, আওয়ামী ঘরনার এই নির্বাহী প্রকৌশলী বিগত দিনে খুলনার শেখ বাড়ির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখেন। তিনি ওই সময় খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (আওয়ামী সরকারের নিয়োগকৃত) আলোচিত ভিসি প্রফেসর ড. মোহাম্মাদ আলমগীরের স্নেহধন্য ছিলেন। এছাড়া আইইবি নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ থেকে লোকাল কাউন্সিল মেম্বার পদে একাধিকবার নির্বাচন করেন তিনি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তার অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্ত দাবি করে ছাত্র সমন্বয় ও নাগরিক সংগঠনের পক্ষ থেকে একাধিকবার লিখিত আবেদন করা হয়। তবে সব সময় তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন।
যোগাযোগ করা হলে ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম বুধবার মন্ত্রণালয়ে পিডি হিসেবে সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়ার কথা জানান। রহস্যময় অ্যাকাউন্টের চারটি চেক ও বিস্ময়কর টাকার অঙ্ক প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি এসব জানি না। আমি কিছু বলতে পারব না। আপনি তদন্ত করেন।
এছাড়া সংশ্লিষ্ট মহলে আরো আলোচনা রয়েছে, প্রকল্প পরিচালক পদটি চতুর্থ গ্রেডের হলেও বর্তমানে আলোচিত একাধিক প্রার্থী ষষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়া ও যোগ্যতা নির্ধারণ নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ।
তবে সব অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যের মধ্যেও প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো ঘোষণা হয়নি। স্থানীয় সরকার বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত চিত্র স্পষ্ট হবে বলে জানা গেছে।
এদিকে, পুরো বিষয়টি ঘিরে খুলনা ওয়াসার অভ্যন্তরে ও নগরীর প্রকৌশলী মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে নজরদারি ও ব্যাখ্যা দাবি করা হচ্ছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


চীনে কয়লাখনিতে বিস্ফোরণে নিহত ৯০