কোটি টাকার প্রকল্পে প্রশ্নের মুখে সীতাকুণ্ড প্রজনন খামার

উপজেলা প্রতিনিধি, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)

কোটি টাকার প্রকল্পে প্রশ্নের মুখে সীতাকুণ্ড প্রজনন খামার

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ক্ষুদ্র খামারিদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা এবং উন্নত জাতের মুরগির বাচ্চা উৎপাদনের লক্ষে সরকার কোটি টাকার সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হিসেবে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামারের সংস্কার ও আধুনিকায়নের কাজ চলছে। তবে নির্মাণকাজের গুণগত মান, জনবল সংকট, প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং তদারকির দুর্বলতা নিয়ে ইতোমধ্যে নানা প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি বিভাগীয় পর্যায়ের সরেজমিন পরিদর্শনে সংস্কারকাজে একাধিক ত্রুটি ধরা পড়ায় সেই উদ্বেগ আরও জোরালো হয়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ৩টি পার্বত্য জেলায় সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প এর আওতায় রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার ক্ষুদ্র খামারিদের কাছে উন্নত জাতের একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চা সরবরাহের মাধ্যমে ডিম ও মাংস উৎপাদন বৃদ্ধি, অপুষ্টি হ্রাস এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করাই প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সীতাকুণ্ড সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামারের অবকাঠামো সংস্কার, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজনের কাজ হাতে নেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের শুরু থেকেই স্থানীয়দের মধ্যে কাজের মান নিয়ে অসন্তোষ দেখা দেয়। অভিযোগ রয়েছে, সংস্কারকাজে কয়েকটি ভবনে পুরনো টিনসহ নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনার পর রোববার (২৯ জুন) সকালে চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ আতিয়ার রহমান এবং প্রকল্প পরিচালক ডা. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম খামারটি সরেজমিন পরিদর্শন করেন। তারা সংস্কারকাজের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখে একাধিক ত্রুটি শনাক্ত করেন এবং তা দ্রুত সংশোধনের নির্দেশ দেন।

পরিদর্শন শেষে প্রকল্প পরিচালক ডা. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, সংস্কারকাজে কিছু নিম্নমানের কাজ আমাদের নজরে এসেছে। কোনো অবস্থাতেই পুরনো টিন ব্যবহার করা যাবে না। যেখানে পুরনো টিন ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো খুলে নতুন টিন দিয়ে পুনরায় কাজ করতে হবে।"

তিনি জানান, কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে খামারের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিচালক ডা. মোস্তফা কামালকে প্রধান করে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির সন্তোষজনক প্রত্যয়ন ছাড়া কোনো ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করা হবে না।

খাদ্য সরবরাহের কার্যাদেশ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে প্রকল্প পরিচালক বলেন, খাদ্য সরবরাহের ওয়ার্ক অর্ডার একজন আওয়ামী লীগ নেতার মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠান পেয়েছে। তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করেননি।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ আতিয়ার রহমান আমার দেশ-কে বলেন, সরকারি অর্থে বাস্তবায়নাধীন প্রতিটি কাজ নির্ধারিত নকশা ও কারিগরি মানদণ্ড অনুসরণ করেই সম্পন্ন করতে হবে। পরিদর্শনে যেসব ত্রুটি পাওয়া গেছে, সেগুলো দ্রুত সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গুণগত মান নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।

তবে শুধু নির্মাণকাজ নয়, দীর্ঘদিনের জনবল সংকটও খামারটির কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। প্রায় সাড়ে সাত একর আয়তনের এই সরকারি প্রজনন খামারে বর্তমানে মাত্র চারজন জনবল দিয়ে সব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ফলে উৎপাদন, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন—সব ক্ষেত্রেই স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে।

বিভাগীয় পরিচালক জানান, জনবল সংকটের বিষয়টি একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবও সম্প্রতি খামারটি পরিদর্শন করে বিষয়টি দেখেছেন। প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের জন্য বারবার চিঠি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বর্তমানে বাইরের মাত্র দুইজন শ্রমিকের সহায়তায় খামারের কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

খামারের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক ডা. মোস্তফা কামাল আমার দেশ-কে বলেন, "আমি ছাড়াও বর্তমানে মাত্র একজন কর্মকর্তা ও দুইজন কর্মচারী কর্মরত আছেন। দীর্ঘদিন ধরে জনবল না থাকায় উৎপাদন বৃদ্ধি, রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।"

তিনি আরও বলেন, গত মে মাসে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব খামারটি পরিদর্শনকালে জনবল সংকটের বিষয়টি সরাসরি অবহিত করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হলে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বৃদ্ধি এবং সরকারের এই বৃহৎ বিনিয়োগ থেকে কাঙ্ক্ষিত সুফল নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

স্থানীয়দের মতে, কোটি টাকার এই প্রকল্পে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং গুণগত মান নিশ্চিত করা না গেলে সরকারের উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চলের হাজারো ক্ষুদ্র খামারিও প্রত্যাশিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। তাই প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে কার্যকর তদারকি, অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...