স্বামীর সঙ্গে মনোমালিন্যের পর তিন সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন উম্মে হাবিবা (২৭)। কিন্তু সেই আশ্রয়ই হয়ে ওঠে মৃত্যুফাঁদ। টানা ভারী বর্ষণে পাহাড়ধসে ঘুমন্ত অবস্থায় প্রাণ হারান তিনি ও তার দুই শিশু সন্তান। অলৌকিকভাবে বেঁচে যায় আরেক সন্তান। তবে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় ছিল, উদ্ধারকাজ শেষে আইন প্রক্রিয়া শেষে মা ও দুই সন্তানের মরদেহ গ্রহণ করার মতো ঘটনাস্থলে উপযুক্ত অভিভাবকই ছিলেন না। এমনকি তখনও তাদের মৃত্যুর খবর জানতেন না উম্মে হাবিবার স্বামী।
সোমবার দিবাগত রাতে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন উম্মে হাবিবা (২৭), তার ছেলে মো. রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩)। একই ঘটনায় নিহত হন উম্মে হাবিবার ছোট বোন তানজিনা আক্তার (১৩)।
জানা গেছে, গভীর রাতে টানা ভারী বর্ষণের মধ্যে পাহাড়ের একটি অংশ ধসে তাদের বসতঘরের ওপর পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই চারজনের মৃত্যু হয়। আহত হন আরও দুইজন। তাদের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝি জয়নাল জানান, কিছুদিন আগে স্বামীর সঙ্গে মনোমালিন্যের পর উম্মে হাবিবা তিন সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে এসে বসবাস করছিলেন। পাহাড়ের পাদদেশে থাকা ঘরটিতে সোমবার দিবাগত রাতে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এতে উম্মে হাবিবা, তার দুই শিশু সন্তান ও ছোট বোন ঘটনাস্থলেই নিহত হন। তবে তার আরেক সন্তান অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যায়। পুলিশ তাদের লাশ এলাকাবাসী ও মাঝির মাধ্যমে হস্তান্তর করেছে৷ পরে বিকালে দাফন করা হয়েছে৷ তার স্বামীও লাশ গ্রহণ করতে আসেনি৷
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা জানান, মধ্যরাতে পাহাড়ধসের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও ৮ এপিবিএন পুলিশের সদস্যরা যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেন। ঘটনাস্থল থেকে চারজনের লাশ এবং আহত অবস্থায় দুজনকে উদ্ধার করা হয়। অন্যদিকে আরও ৪ জনসহ মোট ৮ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়৷
তিনি আরও জানান, ১১ নম্বর ক্যাম্পের নিহত উম্মে হাবিবার লাশ গ্রহণের জন্য ঘটনাস্থলে তার স্বামী বা অন্য কোনো নিকটাত্মীয় উপস্থিত ছিলেন না। এমনকি তার স্বামী তখনো স্ত্রী ও দুই সন্তানের মৃত্যুর খবর জানতেন না। পরে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া সন্তান, ক্যাম্পের মাঝি, পুলিশ সদস্য, আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয়দের উপস্থিতিতে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
৮ এপিবিএনের অধিনায়ক (ভারপ্রাপ্ত) রিয়াজ উদ্দিন আহমদ বলেন, টানা বর্ষণে সৃষ্ট পাহাড়ধসের ঘটনায় পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য বারবার মাইকিং ও সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। প্রাণহানি এড়াতে সবাইকে প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানান তিনি।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার বলেন, পাহাড়ধসের ঘটনার পর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করা হয়েছে। দুর্গত পরিবারের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি যারা এখনো ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়সংলগ্ন এলাকায় বসবাস করছেন, তাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, সোমবার দিবাগত রাতে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে টানা ভারী বর্ষণের কারণে পৃথক তিনটি পাহাড়ধসের ঘটনায় নারী ও শিশুসহ মোট আটজনের মৃত্যু হয়েছে।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

