বন্দরনগরী চট্টগ্রামকে স্যাটেলাইট সিটি হিসেবে গড়ে তুলতে মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। একটি টেকসই, পরিবেশবান্ধব, দুর্যোগ সহনশীল, সমন্বিত ও ভবিষ্যৎমুখী বাণিজ্যিক রাজধানীতে রূপান্তরের লক্ষ্যে আগামী ২৫ বছরের জন্য নতুন মাস্টারপ্ল্যান হাতে নেওয়া হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরে এটি প্রকাশ করা হবে। ইতোমধ্যে খসড়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করে গণশুনানির গেজেট প্রকাশের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এরপর ৬০ দিনব্যাপী গণশুনানি চালাবে সংস্থাটি।
সিডিএ সূত্রে জানা যায়, এই মহাপরিকল্পনার আওতায় চীনের সাংহাই শহরের মতো চট্টগ্রামকেও ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ বা স্যাটেলাইট সিটিতে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। যেখানে মূল শহর ১৫৫ বর্গকিলোমিটারের সঙ্গে কর্ণফুলী নদীর ওপারে আনোয়ারা কর্ণফুলী এলাকা নিয়ে আরো ৮০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে যুক্ত করা হবে মূল শহরের সঙ্গে। এতে শহরের ওপর যেমন চাপ কমবে তেমনি বদলে যাবে চট্টগ্রামের চিত্র।
সিডিএ সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৫ সালে প্রণীত মাস্টারপ্ল্যান ২০১৫ সাল পর্যন্ত কার্যকর ছিল। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে নতুন মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ শুরু হয়, যা মাস্টারপ্ল্যান ২০২৫-৫০ হিসেবে পরিচিত। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। চলতি জুনে প্রকল্পটির মাস্টারপ্ল্যান তৈরির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও গণশুনানি বাকি থাকায় সময় বাড়িয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে ৮৭ শতাংশ ভৌত কাজ ও ৫৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে। ইতোমধ্যে ১ হাজার ১৩৫টি মৌজা ম্যাপ স্ক্যান ও ডিজিটালাইজড করা হয়েছে। যেখানে খাল, নালা, পাহাড়, জলাশয়ের তথ্য রয়েছে। এছাড়া ইঞ্জিনিয়ারিং, পরিবহন, পরিবেশ ও ভৌত অবকাঠামো আর্থসামাজিক জরিপ শেষ হয়েছে। ডিসেম্বরে শেষ হলে আগামী বছর থেকে নতুন মাস্টারপ্ল্যানে আগাবে সিডিএ।
নতুন মাস্টারপ্ল্যানে জেলার হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, বোয়ালখালী, পটিয়া পৌরসভা ও আনোয়ারা, কর্ণফুলী উপজেলা সম্পূর্ণ এবং বোয়ালখালী, পটিয়া, রাঙ্গুনিয়া, রাউজান, হাটহাজারী, সীতাকুণ্ড উপজেলার আংশিক এলাকাকে শহরের আওতায় আনা হবে। যেখানে ৮-১০ লাখ মানুষের উন্নত আবাসনের লক্ষ্যমাত্রা প্রস্তাব করা হয়েছে। শহরে থাকা মানুষ নগরে কাজ করে পুনরায় দূরবর্তী আবাসিকে ফিরে যাবে নির্বিঘ্নে। জোনভিত্তিক এলাকাগুলোতে নাগরিক সুবিধাও বাড়ানো হবে। তবে মাস্টারপ্ল্যানে পরিবেশকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে শব্দ, বায়ুদূষণ, ভূমিধস ঝুঁকি, পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তনের মতো একাধিক প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে।
সিডিএর উপপ্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আবু ঈসা আনসারী জানান, শহরসংলগ্ন এলাকা হলেও মাঝখান দিয়ে কর্ণফুলী নদী প্রবাহিত হওয়ায় নদীর ওপারের আনোয়ারা ও কর্ণফুলীর বিশাল এলাকা আধুনিকায়নের বাইরে রয়েছে। তাই নতুন মাস্টারপ্ল্যানে ওই দুই উপজেলার একটি অংশ শহরের সঙ্গে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে চীনের সাংহাই শহরের মতো ওয়ান সিটি টু টাউন বা স্যাটেলাইট শহর তৈরি হবে। শাহ আমানত সেতুর পাশাপাশি কর্ণফুলী টানেলের কারণে এই প্রকল্প আরো বাস্তবসম্মত।
তিনি আরো জানান, মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় ১৯টি খাতে ২৭৬টি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। যেখানে নগরকে টেকসই, আধুনিক বাসযোগ্য স্যাটেলাইট শহর হিসেবে গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি ১৯৮ দশমিক চার বর্গকিলোমিটার পাহাড়ি এলাকায় কোনো স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মাস্টারপ্ল্যানে স্টর্ম ওয়াটার ড্রেনেজ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ৩০ দশমিক চার কিমি খান পুনঃখনন, ৭৯টি সিল্ট ট্যাপ, ৩৪টি মেকানিক্যাল বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থা ও ৩৫টি সুইস গেট নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর বাইরে ৪৪ হাজার পুকুর সংরক্ষণের উদ্যোগ আছে মাস্টারপ্ল্যানে।
এদিকে, নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। তারা বলছেন, মাস্টারপ্ল্যানের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো এর বাজেট অনেক কম। ১৯৯৫ সালের মাস্টারপ্ল্যান ওই সময়ের নিরিখে ভালো মানের হলেও বাস্তবায়ন হয়নি। কারণ সেটাকে কেউ নিজের মনে করেনি। কেউ বলেছিল এটা হয়নি, কেউ বলেছিল এটার সঙ্গে আমার কাজ নেই। অথবা এটার বোঝার ক্ষমতাও অনেকের ছিল না। সমন্বয় না হলে প্রস্তাবিত মাস্টারপ্ল্যানও বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। সবকটি সংস্থার সমন্বয় ও আইনের সংস্কার না হলে নতুন প্ল্যানও বাস্তবায়ন অসম্ভব।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)-টিআইবি চট্টগ্রামের সভাপতি নগরবিদ ইঞ্জিনিয়ার দেলোয়ার মজুমদার বলেন, বর্তমান মাস্টারপ্ল্যান প্রযুক্তিগত দিক থেকে বেশ নিখুঁত হচ্ছে। বর্তমানের চাহিদাকে ঠিক রেখে অপ্রয়োজনীয় বিষয় বাদ দিয়ে ভবিষ্যৎকে নিরাপদ রাখাই মাস্টারপ্ল্যানের কাজ। সিডিএ সেটি করেছে। কিন্তু সিডিএ মাস্টারপ্ল্যান করলেও সরকারি নীতিমালার পরিবর্তন না হলে অন্যান্য সংস্থা ও বিভাগ তাদের কথামতো চলবে না। সংসদে আইন প্রণয়ন না হলে এটা সার্থক হবে না। নীতিমালা ও নতুন আইন না হলে এই মাস্টারপ্ল্যান বাক্সবন্দি থাকবে।
তিনি বলেন, মাস্টারপ্ল্যানে টানেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে না থাকার পরও সেগুলো হয়েছে। কতগুলো র্যাম্প সড়কের ওপরে নির্মাণ করে শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা হয়েছে। কারণ রোড দুইতলা করে নিচের তলাও নষ্ট করা হয়েছে। অথচ সংস্থাটির কাজই হলো প্ল্যান নিয়ন্ত্রণ করা। অনেক চেয়ারম্যান চসিক মেয়র হওয়ার খায়েশ, উচ্চাভিলাষের কারণে এগুলো হয়েছে। এই অর্গানাইজেশনাল রিফর্ম না হওয়াতে আগের মাস্টারপ্ল্যানও কাগুজে থেকে গেছে। তবে নতুন মাস্টারপ্ল্যানে অনেক নতুনত্ব রয়েছে। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নাম হওয়া দরকার ছিল চট্টগ্রাম প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি।
এ বিষয়ে সিডিএ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন বলেন, মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় শহরকে ঢেলে সাজাতে আমরা কাজ শুরু করব। এমন একটা নান্দনিক শহর গড়তে চাই যেখানে মানুষ স্বস্তিতে বসবাস করবে। তার আগে আমরা সবকটি সংস্থার সমন্বয়ের কাজগুলো শুরু করেছি। ডিসেম্বর থেকে নতুন মাস্টারপ্ল্যানে সিডিএ পরিচালনা করা হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


পরিত্যক্ত ফেলে রাখায় লাভ হতে পারে ভারতের